মিতু হত্যাকান্ডের ৭২ ঘণ্টা পরেও অন্ধকারে পুলিশ

ctgbarta24.com

সিটিজিবার্তা২৪.কম নিউজ ডেস্ক। ৮ জুন ২০১৬

এবার টার্গেট পাল্টাচ্ছে জঙ্গিরা

চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকান্ডের ৭২ ঘণ্টা পার হলেও পুলিশ এখনও রয়েছে অন্ধকারে। হত্যাকাণ্ডটি কোনো জঙ্গি সংগঠন বা জামায়াত-শিবির করেছে নাকি অন্য কোনো মাফিয়া পক্ষ পেশাদার খুনিদের ভাড়া করে ঘটিয়েছে তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না পুলিশ।

মিতু হত্যাকান্ডের : রহস্যের জট খুলতে প্রাথমিকভাবে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। এদিকে তদন্তকারীদের সন্দেহের তালিকায় জঙ্গি-শিবিরের পর এবার যোগ হয়েছে স্বর্ণ চোরাচালানি মাফিয়াচক্র। মামলার তদন্তে সিটিইউর একটি প্রতিনিধি দল সকালে নগরীতে এসে পৌঁছেন।

মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল বাহার বলেন, ‘মূল জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি, এটাই বাস্তবতা। দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও তথ্য ও বস্তুগত অগ্রগতি হয়েছে। আরও পর্যবেক্ষণ করে একটা জায়গায় পৌঁছাতে চাই।’

মামলার তদন্তকারী সংস্থা নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সূত্র জানায়, হত্যারহস্য উদঘাটনে তারা কয়েকটি প্রশ্নের জবাব খুঁজছে।

এগুলো হলো, ‘কেন পুলিশের একজন কর্মকর্তার স্ত্রীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, খুনিদের মোটরসাইকেলের পেছনে যাওয়া কালো মাইক্রোবাসটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, জঙ্গি-শিবিরের পর মাফিয়া স্বর্ণ চোরাচালানিদের প্রতি সন্দেহ,  হত্যায় অংশ নেয়া খুনিরা পেশাদার প্রশিক্ষিত টার্গেট কিলার এবং ঘটনাস্থলের কিছু দূরে থাকা দুটি সিসি ক্যামেরায় ভিডিওচিত্র ধারণ হয়নি কেন?’

মামলার মূল তদন্তের দায়িত্বে আছে ডিবি। তবে র্যা ব, সিআইডি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিআই) তদন্তে সহায়তা করছে।

গত রবিবার (৫ জুন) সকাল সাতটায় ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের জিইসি এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন মাহমুদা খানম। ঘটনার পর পুলিশ জানায়, জঙ্গি দমনে বাবুল আক্তারের সাহসী ভূমিকা ছিল। এ কারণে জঙ্গিরা তাঁর স্ত্রীকে খুন করে থাকতে পারে। এ ঘটনায় সোমবার বাবুল আক্তার হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, সংগ্রহ করা একটি সিসিক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, ৪০-৫০ সেকেন্ডের মধ্যে মিতুকে খুন করে মোটরসাইকেলের তিন আরোহী জিইসি মোড় থেকে গোলপাহাড়ের দিকে চলে যায়। ওই ভিডিওটিতে খুনিদের তিনজনের চেহারা স্পষ্ট নয়। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে ২০০ গজ দূরে গোলপাহাড় মহাশ্মশান কালীবাড়ির দুটি সিসি ক্যামেরায় সেদিন চিত্রধারণ হয়নি। ওই ক্যামেরায় চিত্রধারণ হলে খুনিদের চেহারা স্পষ্ট বোঝা যেত।

কালীবাড়ির সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হয়নি :

কালীবাড়ির ব্যবস্থাপক বিপু দাশ বলেন, ক্যামেরার কোনো ঝামেলার কারণে হয়তো রবিবার সকাল বেলার চিত্র ধারণ হয়নি। শনিবার রাত একটা পর্যন্ত সেখানে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানটি শেষের পর কালীবাড়ির সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সকালে কোনো দরজা খোলা হয়নি। আর এখানে অন্য কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। কেউ ভিডিওচিত্র মুছেও ফেলেনি।

‘কারিগরি ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে ভিডিওচিত্র ক্যামেরায় ধারণ হয়নি’, বিষয়টা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানান সিএমপি কমিশনার মো. ইকবাল বাহার।
মিতু’র খুনিরা ছিল প্রশিক্ষিত পেশাদার :

এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু’র খুনিরা এই ঘটনার আগেও এ রকম খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে ধারণা করছেন সিএমপি কমিশনার। সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া খুনিদের চলাফেরা, অঙ্গভঙ্গি, পালিয়ে যাওয়ার ধরন, হামলার প্রকৃতিসহ সামগ্রিক বিষয়েই খুনিরা খুবই দক্ষ বলে জানান ইকবাল বাহার।

তিনি বলেন, ‘পূর্বপরিকল্পনা করেই প্রযুক্তিগত সব নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো থেকে নিজেদের বাঁচিয়েই তারা এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে।’

এ ছাড়া খুনিরা এই কাজের জন্য আগে থেকেই প্রচুর হোমওয়ার্ক করেছে বলে উঠে এসেছে তদন্তে। খুনের সময় তারা এমন একটি স্পট বেছে নেয়, যেখানে চারদিক থেকে কোনো সিসি ক্যামেরাতেই স্পষ্ট ফুটেজ নেওয়া সম্ভব নয়। পালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা প্রধান সড়কের বদলে উপসড়কই বেছে নিয়েছে।

কারণ খুব সকালে এসব সড়কে ট্রাফিকও থাকে না। খুনিদের এ ধরনের কৌশল নগরীর চকবাজারে নার্সিং কলেজের শিক্ষক অঞ্জলী হত্যার কৌশলের সঙ্গে অনেকটাই মিল পাচ্ছেন গোয়েন্দারা।

চট্টগ্রামে সিটিইউ দল :

মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামে এসে সিএমপি কার্যালয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন কাউন্টারর টেররিজম ইউনিটের (সিটিইউ) তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল। প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম। অপর দুই সদস্য হলেন, অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল মান্নান ও একজন সহকারী কমিশনার।

ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, এ হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার আলামত পাওয়া গেছে। জঙ্গি সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য আমাদের কাছে আছে। প্রাপ্ত আলামতের সঙ্গে আমাদের তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখা হবে। তথ্যের আদান-প্রদান ও সমন্বয় করে কাজ করা হবে।

এখনো অন্ধকারে পুলিশ :

মিতু হত্যাকান্ডের ৭২ ঘণ্টা পার হলেও পুলিশ এখনও রয়েছে অন্ধকারে। হত্যাকাণ্ডটি কোনো জঙ্গি সংগঠন বা জামায়াত-শিবির করেছে নাকি অন্য কোনো মাফিয়া পক্ষ পেশাদার খুনিদের ভাড়া করে ঘটিয়েছে তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না পুলিশ।

কখনও মোবাইলের এসএমএস, কখনও কালো রঙের মাইক্রোবাস, কখনও বাবুল আক্তারের স্ত্রীর আগেভাগে বাসা থেকে বের হওয়া ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে মামলার তদন্ত সংস্থা সিএমপির গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুরুতে চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিলেও সম্পৃক্ততা না পেয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আমরা এখনও মূল জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি, এটাই বাস্তবতা।’

কালো রঙের মাইক্রোবাস :

সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘খুনিদের মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা কালো রঙের মাইক্রোবাসটির গতিবিধি দেখে আমরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি, এটা খুনিদের ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে কাজ করছিল। আমরা মাইক্রোবাসটি জব্দ করার চেষ্টা করছি।’

নগরীর আরো বিভিন্ন অংশ থেকে পুলিশ সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে জানিয়ে ইকবাল বাহার বলেন, ‘আশা করি, খুনিদের স্পষ্ট ছবিও পেয়ে যাব।’

স্বর্ণ চোরাচালানিরা সন্দেহের তালিকায় :

গত ২৫ জানুয়ারি রাতে নগরীর রেয়াজুদ্দিন বাজারের বাহার মার্কেটের ছয়তলার দুটি কক্ষ থেকে তিনটি লোহার সিন্দুক জব্দ করে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ। এর মধ্যে একটি সিন্দুকে আড়াইশ পিস স্বর্ণের বার এবং আরেকটিতে নগদ ৬০ লাখ টাকা পাওয়া যায়।

ওই স্বর্ণ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে একটি চোরাচালানি সিন্ডিকেটের তথ্য পান তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার বাবুল আক্তার। পদোন্নতি পেয়ে বদলির আগে তিনি ওই সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতারে কার্যক্রমও শুরু করেছিলেন।

গোয়েন্দারা জানান, মাহমুদা খানম মিতুর খুনের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী দায় স্বীকার করেনি। আবার সাধারণত জঙ্গিরা নিরীহ নারী-শিশুদের ওপর আঘাত করে না। চোরাচালানি মাফিয়াদের হাত অনেক লম্বা। তারা বাবুল আক্তারের ওপর সংক্ষুব্ধ ছিল। তাই ওই চক্রটি ভাড়াটিয়া খুনি দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা তাও তদন্ত করা হচ্ছে।

মামলার তদন্তে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও আশা ছাড়েননি নিহত মাহমুদার স্বজনেরা। যোগাযোগ করা হলে বাবুল আক্তার অসুস্থ জানিয়ে তাঁর ফুফাতো ভাই মো. ওয়াহিদ বলেন, ‘আমরা চাই দেরিতে হলেও প্রকৃত আসামিরা ধরা পড়ুক। তাদের বিচার হোক।’

সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ

সাভারে প্লাস্টিক কারখানায় আগুন সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, ঢাকা : সাভারের কর্ণপাড়ায় এবি প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (০৯ জুন) র‍াত ৩টা ৪০ মিনিটে আগুনের সূত...
পঞ্চম অংশীদারিত্ব সংলাপে প্রধান্য পাবে নিরাপত্তা ইস্যু... ঢাকা-ওয়াশিংটন পঞ্চম অংশীদারিত্ব সংলাপে প্রধান্য পাবে নিরাপত্তা ইস্যু বাংলাদেশ-যুক্তরাস্ট্র সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, নিউজ ডেস্ক :  সম্প্রতি দেশে জঙ্গি...
সাইবার অপরাধ দমনে ৭ বিভাগে গঠিত হচ্ছে ট্রাইব্যুনাল... নিউজডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম বাংলাদেশ বর্তমানে প্রযুক্তিগত কল্যানে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির আশ...
মিতু হত্যাকান্ডে সেই মাইক্রোবাস চালকসহ আটক... নিজস্ব প্রতিবেদক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম বৃহস্পতিবার, ৯ জুন ২০১৬ মিতু হত্যাকান্ডে ব্যাকআপ ফোর্সড হিসেবে সন্দেহে থাকা সেই মাইক্রোবাস চালকসহ আটক করেছ...
মন্ত্রী হচ্ছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী, দীপু মনি, আবদুর রাজ্জাক!... নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম বৃহস্পতিবার, ৯ জুন ২০১৬ ওয়াহিদুল আলম : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছরে এসে ত...



Leave a Reply