
ডেসপারেটলি সিকিং আনসেনসর্ড (ডিএসইউ) Desperately Seeking Uncensored (DSU) গ্রুপের গ্রেফতারকৃত ৩ অ্যাডমিন আসিফ রানা, জুবায়ের আহমেদ ও তৌহিদুল ইসলাম অর্ণব।
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, বিশেষ প্রতিবেদন : ‘পর্ণাসক্তি’- ‘সমাজের একটি ভয়াবহ ক্যান্সার হিসেবে পরিচিত যা কিনা মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে নিয়ে যায় একেবারে নিম্নস্তরে। একজন মানুষের চিন্তাভাবনাকে পুরোটাই যৌনতায় ঘিরে ফিলে তাকে করে তোলে নৈতিক মূল্যবোধহীন একটি সৃষ্টিতে।’
কিন্তু অতি সাম্প্রতিককালে মানুষকে বিকৃত রুচিতে পরিণত করতে জন্ম নিয়েছে একেবারেই নতুন একটি গোষ্ঠী- ‘ফেসবুকের আনসেন্সরড গ্রুপগুলো’। এসবে অবাধে চলে যৌনতার বিকৃত বহিঃপ্রকাশ, ব্যক্তিগত আক্রমণ, লাইভ পর্ণসহ আরো নানান নোংরামির ব্যাপার-স্যাপার।
বাংলাদেশের অনলাইন কমিউনিটিতে এ মুহুর্তে যে কয়টি ফেসবুকগ্রুপ এ ধরনের যুব-সমাজ ধবংসকারী কার্যকালাপে মদদ দিয়ে যাচ্ছে এর ভেতর উল্লেখযোগ্য হল Desperately Seeking Uncensored (DSU), UncensoredBD, Mairala সহ আর বেশ কিছু গ্রুপ। তবে এদের ভেতরে সবচেয়ে বেপরোয়া কার্যক্রম ডেসপারেটলি সিকিং আনসেনসর্ড (ডিএসইউ) Desperately Seeking Uncensored (DSU) গ্রুপটি।
সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে ডেসপারেটলি সিকিং আনসেনসর্ড (ডিএসইউ) Desperately Seeking Uncensored (DSU) নামের গ্রুপটিতে মোট ১৮ জন অ্যাডমিন ও একজন ক্রিয়েটর রয়েছে। তাদের মধ্যে আবার ৮জন তরুণী। মালয়েশিয়ায় বসে প্রবাসী বাংলাদেশি মো. রাহুল চৌধুলী এই গ্রুপটির ক্রিয়েটর তদারকি করছে।
এ গ্রুপের অ্যাডমিনদের চ্যাটের নানা রকমের নোংরামির কার্যকলাপ দেখে অবাক হয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গ্রুপটির তিনজনকে গ্রেফতারের পর এই গ্রুপ সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। বাকিদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। তবে তারা গা ঢাকা দিয়েছে।
গত বুধবার বিকালে রাজধানীর কলাবাগান থানার পান্থপথ এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সহকারী কমিশনার (এসি) জাহাঙ্গীর হাসানের নেতৃত্বে একটি টিম গ্রুপটির তিন অ্যাডমিনকে গ্রেফতার করে।
তারা হলেন, ময়মনসিংহের আসিফ রানা, কুমিল্লার জুবায়ের আহমেদ ও শেরপুরের তৌহিদুল ইসলাম অর্ণব। তাদের সবার বয়স ২০ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। তারা কেউ স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকে না। তবে মাঝেমাঝে তারা ঢাকায় আসে। গ্রুপের অ্যাডমিনরা মিলে কোনও রেস্টুরেন্ট বা হোটেলে আড্ডা দেয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, গ্রুপটির ১৮ জন অ্যাডমিন রয়েছে। একজন ক্রিয়েটর, সে মালয়শিয়ায় থাকে। অ্যাডমিনদের মধ্যে আটজন তরুণীও রয়েছে। তারা হলো, আনিকা তাসনিম, তৌহিদা রিমি, নূমানা আফরোজ অর্পি, আফরিন মুন, মেহেজাবীন মেহেনাজ, শানজানা তরি, তাহসিফা মিথি ও সৈয়দা নুসরাত শাহরিয়ার। তাদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। তবে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও পায়নি পুলিশ।
এ গ্রুপটির বিরুদ্ধে প্রথম থেকে গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকা নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক উক্ত পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতারকৃত আসিফ রানা, জুবায়ের আহমেদ ও তৌহিদুল ইসলাম ছাড়াও আরও সাত তরুণ অ্যাডমিন রয়েছে।
তারা হলো, মো. মারুফ হোসেন, কাজী হৃদয়, দেওয়ান সাজ্জাদ হোসেন মুন্না, আরাফাত হুসাইন, আশরাফ হিমেল, নাহিল শাহরিয়ার ও ফাহিম শাহরিয়ার। গ্রুপটিতে যারা মূলত অ্যাক্টিভ থাকে, তাদের অ্যাডমিন করা হতো। আবার ইনক্টিভদের অ্যাডমিন থেকে সরিয়ে দিতো রাউল চৌধুরী।
এই ক্লোজ গ্রুপটিতে মূলত অশ্লীল ভিডিও, স্থীর চিত্র ও উত্তেজক কতাবার্তা প্রকাশ করা হতো। আইটি জ্ঞানসম্পন্ন তরুণ-তরুণীরা জেনেশুনেই এই গ্রুপটিতে এসব অশ্লীলতা প্রচার করতো বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান।
গ্রুপটির ক্রিয়েটর রাউল চৌধুরীর নামে মামলা রয়েছে বলে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। সে গ্রেফতার এড়াতে মালয়শিয়া পালিয়ে যায়। সেখানে বসেই সে এই গ্রুপটি তদারকি করে।
তিনি আরো জানিয়েছে, ‘গ্রেফতারকৃত তিন তরুণের কাছ থেকে যেসব ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তারা এসব ডিভাইস থেকে কী ধরনের কন্টেন্ট প্রকাশ করছে, তা মূলত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এসব নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা দায়ের করা হবে। আটকের পর তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।’
এদের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে কেউ এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে সাথে সাথে তার ফেসবুক আইডি গ্রুপে শেয়ার করে রিপোর্ট করে বন্ধ করে দেয়া হয় আর তাকে নানা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় ইনবক্সে।
সর্বশেষ ২৪ সেপ্টেম্বর ‘সিটিজিবার্তা২৪ডটকম’ এ তাঁদের বিরুদ্ধে
বিস্তারিত পড়ুন: ‘ভবিষ্যতের ধর্ষক তৈরির কারখানা ‘
শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর এ গ্রুপের সকল এডমিনরা একত্রিত হয়ে সম্পাদক, প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক সহ কয়েকজন সর্বপ্রথম “Ctgbarta24.com” এর ফেসবুক পেইজে নিউজটি শেয়ার করারর পর যখন পাঠকদের প্রকাশিত উক্ত সংবাদ নিয়ে মন্তব্য আসার পর থেকে এ ডিএসইউর সদস্যরা কুরুচিপূর্ণ ব্যাপক গালিগালাজ শুরু করে আর এক পর্যায়ে সবাই মিলে ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে থাকেন।
পরবর্তীতে ডিএসইউ যখনি দেখতে পেলো উক্ত সংবাদটি “ফেসবুকে” দুই দিনে ২ লক্ষ শেয়ারিং হয়েছে তা দেখার পর নিউজ ওয়েবসাইটে স্পাম, ডজ, ডটজ এসমস্ত স্পাম এটাক করে একদম ধীরগতি করার চেষ্টা করে চার ঘন্টা পর্যন্ত ডাউন করে রাখে।
এ সংবাদ প্রকাশের পর সিটিজি বার্তা২৪ ডটকম এর ওয়েবসাইট সাইবার হ্যাকিং হামলার শিকার হয়। এর পর আমাদের নিউজের ইমেইলে স্পাম এ্যাটাকের চেষ্টা চালিয়ে যায়। এতেও সফল হতে না পেরে তারা আমাদের পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলীদের নিয়ে আজেবাজে গালমন্দ করতে শুরু করে।
সবশেষে তারা এতো কিছুর পরে ব্যার্থ হয়ে আঈনশৃঙ্কলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে তিন অ্যাডমিন গ্রেফতার হয় বুধবার।
উক্ত গ্রুপের বিরুদ্ধে এর আগেও একটি গ্রুপ তাদেরকে নিয়ে আর্টিকেল প্রকাশ করেন। সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর ঐ লেখিকা মারজিয়া প্রভাও জানিয়েছেন তাকে কিভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে গ্রুপটির বিরুদ্ধে কথা বলায়।
মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘সাইবার অপরাধীরা কেউ ধরাছোঁয়ার বাইরে না। তারা সর্বোচ্ছ সীমা লঙ্ঘন করলে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। সামাজিক মাধ্যমসহ অন্যান্য যোগাযোগের সবকিছু আমাদের মনিটরিংয়ে আছে।’
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিএসইউ গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেলের সবাই কিন্তু সামনা-সামনি একে অপরকে চেনে না, জানেও না। তবে গ্রুপ চ্যাটিংয়ে তারা যৌনতা নিয়ে আলোচনা করে। একে অন্যকে পর্নোগ্রাফির ভিডিও, স্থিরচিত্র দিয়ে থাকে। গ্রুপটিতে সবাই উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণী হওয়ায় যৌনতা নিয়ে আগ্রহের সুযোগ নিচ্ছে রাউল। তার অসৎউদ্দেশ্যের শিকার হচ্ছে দেশের মেধাবী তরুণ-তরুণীরা।’
তিন গ্রুপ অ্যাডমিনদের গ্রেফতারে নেতৃত্ব দেওয়া ডিএমপি এসি জাহাঙ্গীর হাসান ‘সিটিজিবার্তা২৪ডটকম’ কে বলেন, ‘আমরা অবাক হয়েছি এসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের এমন হীন কাজে দেখে। তারা নিজেদের মেধা দেশ, পরিবার ও সমাজের কাছে না খাটিয়ে কারও প্ররোচনায় পড়ে যাচ্ছে। পরিবারের উচিত এই তরুণ-তরুণীর দিকে খেয়াল রাখা এবং পারিবারিক সচেতনতা ও মূল্যবোধ বৃদ্ধি করা।’
আরো বিস্তারিত পড়ুন: গ্রুপের নাম পাল্টিয়ে ‘অশ্লিল’ পোস্ট আপলোড চলছেই
এসি জাহাঙ্গীর আরো জানান, ‘তিনজন গ্রেফতার হওয়ার পর গ্রুপটির অন্য অ্যাডমিনরা সবাই গা-ঢাকা দিয়েছে। তবে তাদের বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তাদের গ্রেফতার সময়ের ব্যাপার। এই গ্রুপটির নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পুলিশ।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধের সহকারী কমিশনার (এসি) নাজমুল হক বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধী অনেক। প্রতিদিন অনেক ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন। আমরা সাধ্যমতো সবাইকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’
সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ টিমের এ কর্মকর্তা আরো জানান, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে যেন মানুষ হয়রানির শিকার না হয়, কেউ কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ না করে, সেদিকে পুলিশের মনিটরিং রয়েছে।’





