এই মাত্র:

বাবা-ছেলে এবং মালিক-শ্রমিক

মঙ্গলবার,২০ ডিসেম্বর ২০১৬

দাদা-বাবা আর ছেলে। তিনজনের সুন্দর পরিবার। আর এই পরিবারের চালিকাশক্তি কয়েকটি গাভী। গাভীগুলোর দুধ বিক্রি করেই চলত তিনজনের সংসার। গাভীগুলো কিনেছিল বাবা কিন্তু সেগুলোর দেখভাল করে ছেলে। তিনজনের এই সুখ সহ্য করতে পারত না প্রতিবেশীরা। তারা বারবার চেষ্টা করত বাবা ছেলের মধ্যে ঝগড়া লাগাতে। কিন্তু দাদার বুদ্ধিমত্তায় তারা কোনক্রমেই সফল হচ্ছিল না। একবার দাদা একটা কাজে গ্রামের বাইরে গেলেন। প্রতিবেশীরা ভাবল, এটাইতো সুযোগ। তারা একটা বুদ্ধি করল। তারা ছেলের মাথায় ঢুকিয়ে দিল, তুমি তো অনেক টাকা আয় কর,তোমার একটা মোবাইল থাকা উচিত। এটা তোমার অধিকার। ছেলেটি তার বাবার কাছে গিয়ে এই দাবি তুলল। বাবা ছেলেকে না বুঝিয়ে গালাগাল করল। এমনকি কয়েকটা চড় থাপ্পড়ও মারল। এতে সে মন খারাপ করে চলে যায়। এদিকে ছেলের মন খারাপ দেখে প্রতিবেশীরা আরও সুযোগ পেল। এবার তারা বলল-গাভী তো তুমি লালন পালন কর, দুধও তুমি বিক্রি কর। সুতরাং তুমি গাভীকে খাওয়ানো বন্ধ করে দাও। এতে গাভী দুধ দেবে না। বিক্রিও হবে না। ফলে তোমার বাবা তোমার দাবি মেনে নেবে। প্রতিবেশীদের কথামতো ছেলে গাভীর খাবার বন্ধ করে দিল। বাবাও মানে না। ছেলেও বুঝে না। এভাবেই চলল কয়েক সপ্তাহ । এরপর একে একে মরতে থাকল গাভীগুলো। এক পর্যায়ে সব গাভীই মারা গেল। ইতোমধ্যে সংসারে এতদিনের জমা করা টাকাও শেষ হতে লাগল। আর্থিক টান পড়তে থাকল বাপ-বেটার সংসারে। তারা খবর দিল দাদাকে। দাদা আসল। বাপ-বেটা ঘটনা খুলে বলল। দাদা বললেন,তোমাদের গুয়োর্তুমি ও অজ্ঞতার কারণেই তোমরা তোমাদের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বনকে হারিয়েছ। তুমি যদি গুয়োর্তুমি না করে তোমার ছেলেকে বুঝিয়ে বলতে অথবা তোমার ছেলে যদি বাইরের কথায় প্ররোচিত না হয়ে একটু সচেতন হত তাহলে তোমরা তোমাদের গাভীগুলোকে এভাবে মেরে ফেলতে না। আর সব যখন শেষ তখন আমাকে ডেকেও কোন লাভ নেই। সমস্যার শুরুর দিকে যদি আমাকে জানাতে তাহলে হয়তো আমিও কিছু করতে পারতাম।

একটু ভাবুন তো। গল্পের বাবা হলেন পোশাকশিল্প মালিক আর সন্তান হলেন শ্রমিকরা। আর কারখানা হল সেই গাভী। অন্যের কথায় প্ররোচিত হয়ে কিংবা স্বপ্রণোদিত হয়ে শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবি তুলে। মালিকরাও কোন ধরনের বিবেচনা ছাড়াই প্রত্যাখান করেন সব দাবি। এরপর শ্রমিকরাও আরো একধাপ বোকামি করে কারখানার সমস্যার নিয়ে আসেন রাজপথে। শুরু হয় সংঘাত। বন্ধ হয়ে যায় কারখানা। এরপরই ডাকা হয় দাদাকে অর্থাৎ পুলিশকে। কিন্তু সবকিছু শেষ হওয়ার পর পুলিশকে কেন? পুলিশ হয়তো ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটার নিশ্চয়তা দিতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে তো আর সবকিছুই করে দেওয়া যায় না। সমস্যার শুরুতেই পুলিশের সহযোগিতা নিলে সমাধান হয়ে যায় অনেক কিছু। আরেকটা কথা, আন্দোলনে গেলে লাভ কার, আমার অভিজ্ঞতায় যা বলে মালিকপক্ষ দাবি আদায়ের আশ্বাস দিলেও বিদ্রোহের সাথে জড়িতদের ছাটাই করা হয় সময়মত। আপনি যদি ছাটাই হবেন তাহলে আন্দোলন করলেন কার স্বার্থে। বেতন বাড়াল কার জন্য? আবার বাকি শ্রমিকরাও থাকেন ছাটাই আতঙ্কে। ফলে আগের সেই উৎপাদন আর থাকে না। এভাবে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটি। চট্টগ্রামে বন্ধ হওয়া পোশাক কারখানাগুলোর ইতিহাস যাচাই করলে আমার কথার সত্যতা পাওয়া যাবে।
প্লিজ, একটিবার ভাবুন। কারখানা আছে তাই আপনি মালিক, কারখানা আছে তাই আপনি শ্রমিক, কারখানা আছে আপনার সন্তান স্কুলে যায়, কারখানা আছে আপনি এবং আপনার পরিবার আছেন। এই কারখানা না থাকলে কিন্তু কিছুই নেই। আপনার কিংবা আপনাদের একটি ভুল ধ্বংস করে দিতে পারে আপনাকে , অন্য একজনকে কিংবা একটি পরিবারকে।
আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এই পোশাকশিল্প। বাইরের শকুনেরা এটা ধ্বংস করতে তৎপরতা চালাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। আপনাদের এই দূরত্ব তাদের সাহস যোগাবে। তাই আসুন নিজের স্বার্থে, ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থে সর্বোপরি দেশের স্বার্থে এইসব আত্মঘাতি কর্মকা- থেকে বিরত থাকি। বিরত রাখি অন্যকেও।

লেখক : মো: মহসিন পিপিএম

ওসি বায়োজিদ ।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image