সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৫
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম ।।
আকমল হোসেন ঃ বুদ্ধিজীবীরা জাতির বিবেক, যারা দেশ ও জাতির পক্ষে দাঁড়ান। ১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে পাকিস্তানি শাসক ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস সদস্যরা নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে ১৪ ডিসেম্বর এ জাতির সেরা সন্তান শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও সাংবাদিকদের হত্যা করেছে। জাতির এই সন্তানদের স্মরণে প্রতিবছর পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের এই লেখা।
একই মায়ের উদর থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়া সকল শিশুই সহোদর। পারস্পরিক সম্পর্ক রক্তের। একের স্বার্থই অন্যের স্বার্থ। সেটাকে ভিত্তি করেই হয়তো কবি বাক্যের গাঁথুনিতে সাজিয়েছেন, ‘সকলের তরে সকলে আমরা/প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’ প্রাণিকূলেও তার অনেক নজির পাওয়া যায়। এক হনুমানের মৃত্যুর বিচার চাইতে অনেক হনুমানের থানা ঘেরাওয়ের ঘটনা তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এ গেল একই প্রজাতির প্রাণির মধ্যে পরস্পর সমব্যথী হওয়ার কথা।
সুন্দরবনে বাঘের থাবা থেকে হরিণকে রক্ষা করতে বানরের সতর্কবাণী যেন আরো এক কবির কবিতায় স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন/সেই জন সেবীছে ঈশ্বর।’ তবে ক্ষেত্র বিশেষে কিছু ব্যতিক্রমও দেখা যায় প্রাণিকূলে। সাপ-বেজি ও কুকুর-বিড়ালের মধ্যে সব সময়ই পরস্পরকে আক্রমনের চেষ্টা দেখা যায়, যেন এরা প্রতিশোধ পরায়ণতা নিয়েই ভূমিষ্ঠ হয়েছে। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যা দেখেছে তাই শিখেছে। মানুষের মত জ্ঞান চর্চার পরিবেশ পায়নি, সেই কারণেই হয়তো এমনটা হয়েছে। কারণ, পরিবেশের বাইরে কেউ থাকতে পারে না। প্রাণিকূলের পরিবেশে ইতিবাচক কিছু শেখার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ওয়াজ নসিহতের কোন সুযোগ নেই, সে কারণেই হয়তো তারা পরহিত ব্রতে নিজেদেরকে সম্পৃৃক্ত করতে পারেনি। কিন্তু প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষই কি সেটা করতে পেরেছে ?
পেরেছে, তবে সবাই পারেনি। এই না পারার দলের সদস্য সংখ্যা হয়তো কম, তবে তাদের ঘৃণিত কাজ কিন্তু কম নয়। পৃথিবী এবং সভ্যতা বিকশিত হয় দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। সকল দর্শন এবং ভাল কাজের সূত্রপাতও নাকি ভুল থেকেই। বাংলা প্রবাদেও তার স্বীকৃতি মিলেছে ‘কোথায় শিখি, যেথায় ঠেকি।’
পৃথিবী ও সভ্যতার বিকাশের নিয়ম যদি এটাই হয় তবে সেখানে স্বাধীন চিন্তার, স্বাধীন মত প্রকাশের চর্চা ও অধিকার থাকা শুধু জরুরিই নয়, অতি জরুরি। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান এবং উন্নত সভ্যতার দিকে তাকালে সেটাই প্রমাণ দেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর প্রধান অন্তরায় ধর্ম ভিত্তিক মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ এবং বিভিন্ন সময়ের শাসক ও শোষকমহল। কেউ ধর্মের নাম ভাঙিয়ে, কেউ আইনের দোহাই দিয়ে এর শিকড় পুঁতে রেখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনার ভেতর দিয়ে সেই বিষয়টিই পরিষ্কার হয়েছে।
নিজের ভালো পাগলেও বোঝে, অন্যের ভালো নিয়ে কে চিন্তা করে ? এই চিন্তা করার মানুষরাই বুদ্ধিজীবী। যারা নিজের ভাল-মন্দের সঙ্গে সঙ্গে অন্যের ভাল-মন্দও চিন্তা করেন এবং প্রয়োগের জন্য ভূমিকা রাখেন। আর এ ধরণের কাজের কারণে তারা শত্রুতে পরিণত হন সেই সব লোকদের যারা মানুষের স্বার্থ ও অধিকারকে হরণ করে নিজে সুবিধা ভোগ করে।
সেই সব লোকরা বিত্ত-সম্পদে অনেক এগিয়ে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে তারা গায়ে এঁটেছে মৌলবাদী তকমা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা এবং সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেওয়ার সংষ্কৃতি তারা ধারণ করছে। এই কাজগুলো করার জন্য তারা ব্যবহার করছে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে এবং রাজনীতিকে করে তুলেছে সন্ত্রাসী, মাস্তান ও কালোটাকা নির্ভর। সর্বশেষ এখানে তারা টেনে এনেছে মিডিয়াকে। সেই সব লোকদের নেটওয়ার্ক বুদ্ধিজীবী বিরুদ্ধ। তারা সাধারণ জনতাকেও জিম্মি করে ফেলেছে।
দেশ-জাতির অভিন্ন স্বার্থে রাজনীতিকদের সহ অবস্থান এবং ঐক্যমত যেমন জরুরি, তেমনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও জরুরি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর অনুপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। রাজনীতিতে সেবার যে মনোভাব তা আজ ব্যক্তি ও দলের বৈষয়িক লাভ-লোকসানের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই স্রোতধারার কারণে আজ সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক মানুষ ছিটকে পরেছে। বলতে গেলে রাজনীতি আজ রাজনীতিকদের হাতছাড়া। রাজনীতি এখন ব্যবসায়ী ও আমলাদের কব্জায়। নীতি-আদর্শ সেখানে দর্শন নয়, অর্থ আর সম্পদ অর্জনই দর্শন। তাই একই ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে শামিল হন। রাজনীতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও সংস্কৃতির প্রয়োজন। সে দিক থেকে রাজনীতিকদের রাজনীতির চর্চাও সুবিধাজনক নয়।
বিশাল জনসংখ্যা অধ্যুষিত চীনকে জনগণের চীনে পরিণত করতে কমরেড মাও সে তুং- এর নেতৃত্বে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা ঘটেছিল, তার পেছনে প্রথম ও প্রাথমিক কাজ ছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লব। কৃষিপ্রধান একটি দেশকে ১৫০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার স্থান হিসেবে গড়ে তোলা এবং পৃথিবীর ৫ম শক্তির একটিতে পরিণত করার পেছনে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবকে মূলমন্ত্র হিসেবে ভেবেছে সে দেশের জনগণ। এ রকম একটি সমাজ দাঁড় করাতে স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার চর্চা জরুরি। কিন্তু এই ভূখণ্ডে অর্থাৎ বাংলায় সেটার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয় নি। সেটা ব্রিটিশ আমলেও না, পাকিস্তান আমলেও না এমনকি বর্তমানেও না।
ব্রিটিশ আমলে স্বাধীন চিন্তা করায় ও জনগণের পক্ষে কথা বলায় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে জেল খাটতে হয়েছে। কমিউনিস্টদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে ৭ জন কমিউনিস্ট কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামক দু’টি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় কিন্তু ভারতে স্বাধীন চিন্তার সুযোগ যতটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে সেটা ছিল না। ফলে অনেক স্বাধীন চিন্তার মানুষ এ অঞ্চল থেকে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। ধর্মের নামে রাজনীতি করার সংস্কৃতি মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে মেলে ধরার সুযোগ দেয়নি। এমন অনেক চিন্তাবিদ বা বুদ্ধিজীবীকে পাকিস্তানের কারাগারে থাকতে হয়েছিল।
বুদ্ধিজীবীরা যুগে যুগে দেশে দেশে স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার চর্চা করেছেন। এই মুক্তচিন্তা মানুষের চেতনা সৃষ্টি করেছে, ভাল-মন্দ যাচাই করতে শিখিয়েছে। সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে যেভাবে মৌলবাদীদের হাতে মুক্তচিন্তার লেখক প্রকাশক ও ব্লগাররা হত্যার শিকার হচ্ছে তা পূর্বের ঘটনা থেকে ভিন্ন কিছু নয়। প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর ১১ বছর অতিক্রম হলেও তার ওপর হামলার বিচার আজও হয়নি। কবি দাউদ হায়দার, লেখক ও চিকিৎসক তসলিমা নাসরিনকে নির্বাসিত হতে হয়েছে। আর মুক্তিসংগ্রামের বিরোধীতাকারী, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী জামায়াত-শিবির এদেশে রাজনীতি করে চলেছে। অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয় দাস, প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনসহ কয়েকজন হত্যার শিকার হয়েছে। এরা কেউই কিন্তু কারো মাথায় লাঠি মারেনি, এরা লেখার মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছে। দেশের প্রচলিত নিয়ম পালনে কোন বিঘ্ন এরা ঘটায়নি।
বাংলাদেশের সংবিধানে ৩৯ (১) ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, ৩৯(২) ধারায় প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। উপরোক্ত বিধানের আলোকে তাদের অপরাধ কি? সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় ব্লগারদের লেখালেখির বিষয়ে সতর্ক করা হয়। কিন্তু হত্যাকারীদের বিচার হয় না। এ আচরণের কারণ কী? ‘শত্রুর শত্রু আমার Ÿন্ধু’ অথবা ‘শত্রুর ঘাড়ে বন্দুক রেখে অপর শত্রুকে ঘায়েল করা’র পরিকল্পনা কিনা? যে সমাজে দেহের মৃত্যুর হিসাব রাখা হয় কিন্তু মনের মৃত্যুর হিসাব করা হয় না, সে সমাজে স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যার শিকার হওয়া ছাড়া পথ কোথায়?
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে দাঁড়িয়ে বাংলার সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অভাব অনুভব করাটা স্বাভাবিক নয় কি? ৭১-এ পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি জাতিকে মেধাশূণ্য করার যে ষড়যন্ত্র করেছিলো সেদিন বুদ্ধিজীবী হত্যা তারই অংশ।
আজ স্বাধীন দেশে স্বাধীন মত প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে চাপাতি, ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কলমের জবাব কলম দিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি অনুসরণ করা হবে- সেটাই প্রত্যাশা। তাহলে মানুষ এগুবে, জাতি এগুবে, দেশ এগিয়ে যাবে। মানুষ মেরে ধর্ম যেমন রক্ষা হবে না তেমনি দেশ রক্ষাও হবে না। যেখানে মানুষ নেই, সেখানে কোন সভ্যতা নেই, সেখানে কারো অস্তিত্বও নেই। আশা করি শাসক, শোষক, চাপাতি মার্কা মৌলবাদী ও আগুন সন্ত্রাসীরা বিষয়টি উপলদ্ধি করবেন।
লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ; সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) কেন্দ্রীয় কমিটি।









