শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৫
মাহাবুবুল করিম
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম : আজ ১২ রবিউল আউয়াল (চন্দ্রমাস) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) বছর ঘুরে আবারো ফিরে এসেছে শ্রেষ্ঠ এ মহান দিনটি। শুকরিয়া মহিমাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে যিনি আমাদেরকে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। আর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত রূপে উনার পেয়ারা হাবীব রাসুল (সা.) কে এদিনে দুনিয়ায় প্রেরণ করে ধন্য করেছেন সমগ্র সৃষ্টিকে। তাই অসংখ্য দরূদ ও সালাম পেয়ারা নবী (সা.) এর শানে।
স্বাগতম মাহে রবিউল আউয়াল। ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সরকারি বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।
মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রীসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। মহান রাব্বুল আলামীন সমগ্র বিশ্বকে বিশেষ করে মুসলিম মিল্লাতকে আল্লাহপাকের নেয়ামতের শোকর আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে প্রিয় হাবীব (সা.)! বলে দিন, এসব কিছু আল্লাহর ফজল এবং তার রহমতের পরিচায়ক। (যা হযরত মোহাম্মদ (সা.) কে প্রেরণের মাধ্যমে তোমাদের উপর করা হয়েছে) সুতরাং মানুষের বিশেষ করে ঈমানদারদের উচিত রাসুল (সা.)-এর আগমনে আনন্দ প্রকাশ করা। ইহা সে সকল হতে কত উত্তম, যা তারা সঞ্চয় করে বলেছে।’ (সূরা ইউনূস: আয়াত ৫৮) এই আয়াতে কারিমার আলোকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, আল্লাহ তা’য়ালার ফজল এবং তার রহমতসমুহের শোকর আদায় করার একটি মকবুল তরিকা হচ্ছে খুশি ও আনন্দকে খোলাখুলি প্রকাশ করা। মিলাদে মোস্তফা (সা.) হতে বড় নেয়ামত, ফজল ও রহমত আর কী হতে পারে? এটা সেই বড় নেয়ামত যার জন্য আনন্দ প্রকাশ করার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত প্রদান করেছেন।
এই আয়াতে কারিমার মধ্যে আল্লাহ পাকের সম্বোধনের লক্ষ্য হলো, নূরনবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা আহমাদ মুজতাবা (সা.)। তিনি যেন স্বীয় সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের সাহায্যে সকল উম্মতকে বলে দেন যে, তাদের উপর আল্লাহ পাকের যে রহমত বেলাদতে মোস্তফা (সা.) এর মাধ্যমে নাজিল হয়েছে। তার শোকর গুজারীস্বরূপ তারা যেন যতখানি সম্ভব খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করে এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে যেন তার স্মরণকে উচ্চকিত করে।
তবে একথা সবারই জানা আছে যে, নেয়ামতের শোকর গুজারী দু’ভাবে হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে। যে যেভাবেই খুশি প্রকাশ করুক না কেন, তা অবশ্যই আল্লাহ পাকের কাছে মকবুল ও মঞ্জুরি লাভ করবে এতে কোনোই সন্দেহ নেই। উপরোক্ত আয়াতে কারিমায় ‘বলে দিন’ শব্দটি হচ্ছে নির্দেশ সূচক। এই নির্দেশের আমূল বা নীতি হচ্ছে এই যে, পবিত্র কুরআনুল কারিমের সেখানেই ‘ক্বুল’ অর্থাৎ বলে দিন শব্দ দ্বারা কোনা বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, এটা দ্বীনের বা ধর্মের বুনিয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ হাকীকতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
যেমন আল্লাহ পাক যখন স্বীয় প্রভুত্ব এবং একত্বের ঘোষণা এবং তাওহীদের সঠিক নির্দেশনা প্রকাশ করতে ইচ্ছা করলেন, তখন ইরশাদ করলেন. হে প্রিয় হাবীব (সা.) আপনি বলে দিন তিনই আল্লাহ যিনি একক ও অদ্বিতীয়।’ (সূরা ইখলাস: আয়াত-১) উক্ত আয়াতে কারিমার দ্বারা এই হাকিকতও প্রকাশ পেয়েছে যে, নেয়ামত প্রদানকারী হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত। যিনি তার পেয়ারা হাবীব (সা.)-এর এই ধুলার ধরণীতে আগমন করাকে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কারণ, তিনি হচ্ছেন এই বিশ্বের সকল নেয়ামতের মূল। এই নেয়ামতকে স্বয়ং আল্লাহপাকই উচ্চকিত করেছেন। তাই কুল মাখলুকাতের বিশেষ করে উম্মতে মোহাম্মাদিয়ার উচিত ১২ রবিউল আউয়ালে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করা। অধিক হারে দরূদ ও সালাম পেশ করা এবং দান-খয়রাতের মাধ্যমে এই দিনটির মর্যাদাকে সামর্থ্য অনুসারে বর্ধিত করা। এতে করেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং মুমিনদের জোশ ও অনুরাগ বহুগুণে সম্প্রসারিত হয়।
প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ধর্মীয় ও পার্থিব জীবনে মহানবীর শিক্ষা সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুসরণীয়। পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবি (সা.) উপলক্ষে গতকাল এক বাণীতে তিনি এ কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’-এ জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সর্বজনীন ঘোষণা রয়েছে। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ আমাদের সকলের জীবনকে আলোকিত করুক, মহান আল্লাহর কাছে এটাই প্রার্থনা।
পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবি (সা.) উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট দেশবাসীসহ বিশ্বের সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানান। তিনি বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবি (সা.) বিশ্ববাসীর জন্য অত্যন্ত পবিত্র, তাৎপর্যপূর্ণ এবং মহিমান্বিত দিন। মহান আল্লাহ তা’আলা সমগ্র বিশ্বজগতের রহমত হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এ জগতে প্রেরণ করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতা’আলা মহানবী (সা.)-কে ‘রাহমাতুল্লিল আ’লামিন’, ‘উসওয়াতুন হাসানা’, ‘সাইয়্যেদুল মুরসালিন’ ইত্যাদি উচ্চ মর্যাদায় অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, দুনিয়ার বুকে তাঁর আগমন ঘটেছিল ‘সিরাজাম মুনিরা’ রূপে। তৎকালীন আরব সমাজের অনাচার, অবিচার, অসত্য ও অন্ধকারের বিপরীতে তিনি সত্য, সাম্যসহ ন্যায়ভিত্তিক সুন্দর সমাজব্যবস্থা স্থাপন করেন । তিনি বলেন, আল্লাহরাব্বুল আলামিন সর্বশেষ মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআন তাঁর ওপর অবতীর্ণ করে জগতে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অর্পণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার দৃঢ়বিশ্বাস মহানবী (সা.)-এর সুমহান আদর্শ অনুসরণের মধ্যেই প্রতিটি জনগোষ্ঠীর জন্য নিহিত রয়েছে অফুরন্ত কল্যাণ ও সফলতা।
তিনি বলেন, আজকের অশান্ত ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতমুখর বিশ্বে প্রিয়নবী (সা.)-এর অনুপম শিক্ষাকে অনুসরণের মাধ্যমেই বিশ্বের শান্তি ও কল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবি (সা.) উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে একথা বলেন।
“বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ও ওফাতের পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে তিনি মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক সদস্য ও দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানান। বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহান আল্লাহ্ আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-কে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন ‘রাহমাতুল্লিল আ’লামিন’ তথা সারাজাহানের জন্য রহমত হিসেবে। পাপাচার, অত্যাচার, মিথ্যা, কুসংস্কার ও সংঘাতজর্জরিত পৃথিবীতে তিনি মানবতার মুক্তিদাতা ও ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, অন্ধকার যুগের সকল আঁধার দূর করে সত্যের আলো জ্বালিয়েছেন। তিনি বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজগঠন এবং মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে বিশ্বে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এই পবিত্রদিনে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহ্ তথা বিশ্ববাসীর শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন।
এদিনে আবরাহার হস্তি বাহিনীর ধ্বংস হয় ১৪৯০ চন্দ্র বছর আগে তথা হিজরতের ৫৩ বছর আগে ৫৭০ খ্রিস্টীয় সনের এ দিনে (১২ রবিউল আউয়াল) বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন বলে কোনো কোনো সূত্রে উল্লেখ করা হয়।
এ দিনে পবিত্র কাবা-ঘর আক্রমণ করতে আসা ইয়েমেনের আবিসিনিয় গর্ভণর আবরাহা তার হস্তি বাহিনীসহ ধ্বংস হয়। আল্লাহর ইচ্ছায় আবাবিল পাখির মুখে থাকা ক্ষুদ্র কঙ্কর আবরাহার হস্তি বাহিনীর ওপর বর্ষিত হলে তারা চর্বিত ঘাসের মত দলিত-মথিত হয়। (বলা হয়, আবরাহা চেয়েছিল ইয়েমেনে একটি বিকল্প কাবা-ঘর বা মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে যাতে এর মাধ্যমে ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার করা যায়। কিন্তু তার আহ্বানে কেউ সাড়া দেয়নি।)
ইতিহাসে এসেছে, আবরাহার সেনারা কুরাইশ গোত্রের প্রধান ও বিশ্বনবী (সা.)’র দাদা হযরত আবদুল মুত্তালিবের উটগুলো নিয়ে যাওয়ায় তিনি আবরাহার সঙ্গে দেখা করে তার উটগুলো ফেরত চান। আবরাহা ভেবেছিল আবদুল মুত্তালিব এসেছেন কাবা ঘরে হামলা না চালানোর জন্য তার কাছে কাকুতি-মিনতি করতে। তাই বিস্মিত আবরাহা বলে, কাবা ঘর রক্ষা নিয়ে তোমার চিন্তা নেই? আবদুলমুত্তালিব বলেন, এই ঘরের যিনি মালিক (আল্লাহ) তিনিই তার ঘর রক্ষা করবেন, উটের মালিক হিসেবে আমি কেবল আমার উটগুলো ফেরত চাই।










