“একটি অশনি সংকেত ও দুইটি ইতিহাস”

Monday 27 February 2017

Ctgbarta24.com

মাশরুর হোসাইন: ব্যস্ততার কারনেই লেখালেখি থেকে ইদানিং কিছুটা বিরত আছি। তবে আজকের একটি ঘটনা চোখে পড়ার পর আর না লিখে পারলাম না। ফেসবুকে দেখলাম কোন এক নাড়ী নেত্রীকে জড়িয়ে ধরলেন। মমতাময়ী নেতৃও সরল মনে তাকে বুকে নিলেন। কিন্তু এতো প্রটোকল, এতো সিকিউরিটি তারপরো কিভাবে এইটা হল? এই ব্যপারে কোন মন্তব্য করার আগে আমি দুইটা ঘটনা শেয়ার করতে চাই। একজন রাজীব গান্ধী অপরজন ইন্দিরা গান্ধী। একটু সময় নিয়ে মন দিয়ে পড়ুন।

ঘটনা ১: ১৯৯১ সালের এপ্রিল এর ২১ তারিখ ও মে এর ১২ তারিখ মরুগান, হারিবাবু (একজন ফটোগ্রাফার) ধানু এবং সুভা কে নিয়ে দুইটি জনসভায় যায়। দুইজনকে নির্দেশ দেয়া হয় মঞ্চের কাছে যেতে এবং যদি পারা যায় নেতাদের প্রণাম করতে। ধানু দুই যায়গাতেই প্রণাম করতে সফল হয়। মরুগানের নির্দেশে প্রণাম করার ছবি তুলে হারিবাবু। (বর্তমানে যা সেল্ফি নামে পরিচিত)

এবার শিভারাসন আর মরুগান অপেক্ষা করতে থাকে সঠিক সুযোগের। মে মাসের ১৯ তারিখ পত্রিকায় খবর আসে রাজীব গান্ধী শ্রীপেরামবুদুর আসবেন ২১ তারিখে জনসভায় যোগদান করতে। শিভারাসন পত্রিকার একটা কপি নিয়ে আসে নালিনীর বাসায়। ধানু এবং সুভা কে বুঝিয়ে বলে ২১ তারিখে কি করতে হবে। ২০ তারিখে কয়েকবার রিহার্সেল দেয়া হয়।

২১ তারিখ বিকালে শিভারাসন, ধানু, সুভা ও নালিনীকে নিয়ে রওনা হয়। বাস স্ট্যান্ডে এসে মিলিত হয় হারিবাবুর সাথে। হারিবাবুকে এর আগেই বলা ছিল ফুলের মালা নিয়ে আসার জন্য। একসাথে মিলিত হয়ে পাচজন বাসে চড়ে যায় শ্রীপেরামবুদুর। রাত ৮টায় দলটি পৌছে শ্রীপেরামবুদুর সভাস্থলে। ধানুর শরীরে তখন বাধা আরিভুর তৈরী বিস্ফোরক। তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়গা করে নেয় ভি এই পি পরিবেষ্টনির কাছে। অপেক্ষা করতে থাকে রাজীব গান্ধীর আসার। সাড়ে আটটার সময় আনুসয়া কুমারী নামের একজন মহিলা সাব-ইন্সপেক্টার এসে তাদের নাম ও পরিচয় জানতে চায়। হারিবাবু আনুসয়া কুমারীকে জানায় যে সে একজন প্রেস ক্যামেরাম্যান এবং আজ তার ডিউটি হলো এই মহিলা (ধানু) যখন রাজীব গান্ধীকে মালা পরিয়ে দেবে সেটার ছবি তোলা। আনুসয়া কুমারী তাদের এখান থেকে সরে দাড়াতে বলে কারন রাজীব গান্ধীর আসতে আরও দেরী আছে।

তারা সরে যায়। সুভা এবং নালিনী একটু দুরে যেয়ে বসে, হারিবাবু ও ধানু রেড কার্পেটের কাছে যেয়ে দাড়িয়ে থাকে আর শিভারাসন মঞ্চের কাছে যেয়ে দাড়ায়। ধানুর গতিবিধি এবং চাহুনি দেখে একটু সন্দেহ হওয়াতে আনুসয়া কুমারী তাদের প্রতি নজর রাখতে শুরু করে।

রাজীব গান্ধী ঠিক ১০টায় এসে পৌছান। সমর্থক পরিবেষ্টিত হয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। অনেক সমর্থক তাকে মালা পরিয়ে দিতে থাকে। একসময় ধানুও এগিয়ে যায়।আনুসয়া কুমারী কি মনে যেন ধানুকে বাধা দেন। (দেখুন কি চালু পুলিশ অফিসার)। রাজীব গান্ধীর নজর পরে সেই দিকে। তিনি আনুসয়া কুমারীকে ইশারা করেন ধানুকে আসতে দিতে। আনুসয়া কুমারী সরে দাড়ান, ধানু রাজীব গান্ধীর কাছে পৌছে তাকে মালা পরিয়ে দেয়। একটু দূর থেকে এর ছবি তুলে হারিবাবু। মালা পরিয়ে দিয়ে ধানু রাজীব গান্ধীকে প্রণাম করার জন্য নিচু হয় এবং পোষাকের নিচে বাধা ৭০০ গ্রাম ওজনের আরডিএক্স ভর্তি বেল্টটি ফাটিয়ে দেয়। বিস্ফোরণের আঘাতে রাজীব গান্ধীর দেহ দুই মিটার দূরে ছিটকে যায়, মৃত্যু হয় তাৎক্ষনিক। ধানুর শরীরও ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়।মাথা যেয়ে পরে ২৪ মিটার দূরে। আরও মারা যায় চোদ্দজন মানুষ যার মধ্যে হারিবাবু একজন । হারিবাবু হয়তো শুধু জানতো ধানু প্রনাম করে চলে আসবে। হারিবাবুর প্রাণ চলে যায় বিস্ফোরণের আঘাতে তা তিনি কল্পনাও করেন নি। কিন্তু তার ক্যামেরায় প্রাণ থেকে যায়। ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা পরে সেই ক্যামেরার ফিল্ম ডেভেলপ করে বিস্ফোরণের ঠিক আগ মুহূর্তের কয়েকটা ছবি পায়।

ঘটনা ২: শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর দুই শিখদেহরক্ষী সৎবন্ত সিংহ ও বিয়ন্ত সিংহ অপারেশন ব্লু স্টার চলাকালীন “স্বর্ণমন্দির” নামে পরিচিত শিখদের সর্বোচ্চ তীর্থ হরমন্দির সাহিবে সেনা অভিযানের প্রতিশোধকল্পে তাঁকে হত্যা করে। নতুন দিল্লির ১ নং সফদরজঙ্গ রোডস্থ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের উদ্যানপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি। সৎবন্ত ও বিয়ন্ত সিংহের দ্বারা রক্ষিত একটি ছোটো দরজার ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁরা সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করে। বিয়ন্ত সিংহ ধার থেকে তিন রাউন্ড এবং সৎবন্ত সিংহ নিজের স্টেনগান থেকে তাঁর প্রস্টেট লক্ষ্য করে ত্রিশ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। অন্যান্য দেহরক্ষীরা বিয়ন্তকে ঘটনাস্থলেই গুলি করে হত্যা করে এবং সৎবন্তকে গ্রেফতার করে।

মন্তব্য: মরুগান, শিভারসিন, সুভা, নালিনী, হরিবাবু, ধানু, অনুসুয়া, সৎবন্ত সিংহ, বিয়ন্ত সিংহ এরা সবাই এখনো আছে আমাদের মাঝে আমাদের ছায়া হয়ে। এদের চিহ্নিত করাটা জরুরী। নেত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা প্রয়োজন।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


CAPTCHA Image
Reload Image