শুক্রবার, ২০ নভেম্বর ২০১৫
সিটিজিবার্তা ২৪ ডটকম
বিশেষ সংবাদ : মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বাকি আছে। তারা প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি-না জানতে চাইবে কারাগার কর্তৃপক্ষ। কারাগার সূত্রে জানা গেছে, দণ্ডপ্রাপ্ত দু’জনের ফাঁসি কার্যকরে জল্লাদ ও ফাঁসির মঞ্চও প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের ডাক্তারি পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে। এখন বাকি আছে কেবল প্রাণভিক্ষা চাওয়ার বিষয়টি।
তবে প্রত্যেকটি বিষয় আইন অনুযায়ী করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘প্রতিটা স্টেপ আমরা আইন অনুযায়ী নিয়েছি, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে আমরা কিছুই করছি না। কাজেই তাঁকে রায় শোনানো এবং পরবর্তী বিষয়গুলো, যা বিচারক রায় দিয়েছেন এবং যে প্রক্রিয়া চলছে, সেভাবেই হবে।’ বৃহস্পতিবার রাতে দু’জন কারা চিকিৎসক তাদের মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। এর আগে মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদনের রায় তাদের শোনানো হয়েছে।
তাদের রায় কার্যকরের ব্যাপারটি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সাকা- মুজাহিদের ফাঁসির সাজা পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপিতে বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতিসহ রায় প্রদানকারী চার বিচারপতি আলাদাভাবে সই করেছেন। দুই রায়েই বলা হয়, আপিল শুনানির পর দেওয়া রায়ে কোনো ত্রুটি অথবা আইনের বত্যয় বিচারকদের নজরে আসেনি। সুতরাং দণ্ড পুনর্বিবেচনার কোনো কারণও তারা খুঁজে পাননি। কিন্তু অপরাধীর পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করা হয়।
এমনকি সাকা চৌধুরী সার্টিফিকেট পর্যন্ত জালিয়াতি করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা চালান। কিন্তু এ যাত্রাও রেহাই পাননি তিনি। বিচারপতিদের সই করা সেই কপি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। এরপর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছালে সাকা ও মুজাহিদকে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়। এখন শুধু সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে আর কতদিন তারা পৃথিবীর আলো দেখতে পাবেন। এদিকে, মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া মুজাহিদের সাথে শুক্রবার সাক্ষাৎ করার সময় চেয়ে আবেদন করেছেন তার আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কারা কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে এই আবেদন করেন তারা।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা-নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিনি আপিল করলে চলতি বছরের ১৬ জুন চূড়ান্ত রায়েও ওই সাজা বহাল থাকে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাকা চৌধুরীর রায় এসেছিল ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায় এ বছর ২৯ জুলাই আপিলের রায়েও বহাল থাকে। তাদের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় একইদিন, ৩০ সেপ্টেম্বর। এরপর নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল দু’জনের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে এবং কারা কর্তৃপক্ষ ১ অক্টোবর তা দুই ফাঁসির আসামিকে পড়ে শোনায়। এরপর দুই যুদ্ধাপরাধী ওই রায় পুনর্বিবেচনার জন আপিল বিভাগে আবেদন করেন। শুনানি শেষে গত বুধবার আদালত তা খারিজ করে দেন।
দণ্ড কার্যকরের আগে দুই যুদ্ধাপরাধীর শেষ আইনি সুযোগ ছিল রিভিউ আবেদন। তা খারিজের মধ্য দিয়ে আইনি লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি হয়। এখন সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে শেষ সুযোগে দণ্ডাদেশ পাওয়া আসামিরা অপরাধ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন। আসামি তা না চাইলে বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা না পেলে সরকার দিনক্ষণ ঠিক করে কারা কর্তৃপক্ষকে ফাঁসি কার্যকরের নির্দেশ দেবে। রিভিউ খারিজ হয়ে যাওয়ার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রথমে সাকা চৌধুরী ও পরে মুজাহিদের পরিবারের সদস্যরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে দেখা করেন। অবশ্য এর আগে দণ্ড কার্যকর হওয়া দুই যুদ্ধাপরাধীর ক্ষেত্রে প্রাণভিক্ষার বিষয়টি ফয়সালা হওয়ার পর তাদের ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে আরও একবার পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাত করতে দেওয়া হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সাক্ষাৎ শেষে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর সাকা চৌধুরীর ভাই জামালউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছে সাংবাদিকরা প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষয়ে জানতে চান। জবাবে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘কী, মার্সি পিটিশন?’ একই প্রশ্নে মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর বলেন, ‘তিনি (বাবা) বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি আমাদের রাষ্ট্রের ও জনগণের অভিভাবক। তিনি একজন আইনজীবীও।’ সুতরাং তার কাছে আবেদন করব কি-না আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেব।’ এদিক সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার একদিন বাদে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিএনপি বলেছে, তাদের নেতা ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার’ শিকার। আর মুজাহিদের ফাঁসির রায় পুর্ণবহাল থাকার পরের দিন জামায়াত সারাদেশে হরতাল ঘোষণা করে। সংবাদ মাধ্যমের তথ্য মতে, যদিও হরতালে জনজীবনে কোনো প্রভাব পড়েনি। এর আগে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লা ও মো. কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন এক দিনের মধ্যে শুনানি শেষে খারিজ হয়ে গিয়েছিল।
তারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা চাননি বলে সরকারের পক্ষ থেকে সে সময় জানানো হয়েছিল। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝোলানো হয় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে। আর চলতি বছর ১১ এপ্রিল জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ। কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের আগে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছিলেন, প্রাণভিক্ষা চাওয়ার জন্য আসামি ‘যৌক্তিক সময়’ পাবেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেছিলেন, একটি দরখাস্ত লিখতে যে সময় লাগে-‘যৌক্তিক সময়’ তার চেয়ে বেশি হওয়া উচিৎ নয়।




