সাত বছর পর আজ ২৩৪ পৌরসভার নির্বাচনে ফের মুখোমুখি আওয়ামী লীগ-বিএনপি
বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৫
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম ||
নিউজ ডেস্ক : ক্রিকেটে এই কথাটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়- রোমাঞ্চকর লড়াই। আজ ৩০শে ডিসেম্বর বুধবার যে ভোটের লড়াই হচ্ছে তাকেও নির্দ্বিধায় রোমাঞ্চকর বলাই যায়। তবে ক্রিকেট মাঠের সঙ্গে এ লড়াইয়ের ব্যবধান বিস্তর। দুই যুগ ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি প্রতীকের নাম- নৌকা এবং ধানের শীষ।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে সর্বশেষ লড়াই হয়েছিল এই দুই প্রতীকের। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় সে লড়াই আর হয়নি। পাক্কা সাত বছর পর আজ ২৩৪ পৌরসভার নির্বাচনে ফের মুখোমুখি আওয়ামী লীগ-বিএনপি। যদিও এ নির্বাচনের চরিত্র আলাদা। স্থানীয় কোনো নির্বাচন এবারই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে হচ্ছে। সেখানেও আবার বিভক্তি। মেয়র পদ দলীয়। আর কাউন্সিলর পদে অদলীয়।
গণতন্ত্রে জনগণকে সকল ক্ষমতার মালিক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। একই কথা বলা আছে, আমাদের সংবিধানে। কিন্তু এটি যে কেবল কথার কথা তা কি আর বলতে হয়। পুরনো কথাটি আবার নতুন করে বলা যায়- বাংলাদেশে ভোট প্রধানত দুই ধরনের। ১. ভোট উৎসব ২. গায়েবি ভোট। ভোট উৎসবে অন্তত একদিনের জন্য হলেও সংবিধানে বলা কথাটি সত্য হিসেবে প্রতীয়মান। আমজনতা এবং ভিভিআইপির ব্যবধান মুছে যায় সেদিন। প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিটি মানুষেরই সমান ভোটাধিকার। প্রত্যেকেই একটি করে ভোট দিতে পারেন। অন্তত একদিনের জন্য হলেও গণতন্ত্র সমতার জয়গান গায়।
আমরা আমাদের আগের অনেক লেখায় এই ভোটারদের বলেছি, একদিনের বাদশাহ। কিন্তু আজকের দিনে জনগণ একদিনের জন্যও বাদশাহ থাকতে পারছেন না। এই স্বাধীনতার এতদিন পরেও জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে নানা সংশয়। অনেকেরই আর ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। তার আগেই কোনো না কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী তাদের ভোট দিয়ে দিচ্ছেন।
ঢাকায় পশ্চিমা কূটনীতিকদের কারও কারও ধারণা ছিল, স্মার্টফোনের এই যুগে ভোটে জালিয়াতি সম্ভব নয়। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে খোদ এই রাজধানীর বুকেই ভোটজালিয়াতরা যেভাবে প্রকাশ্যে সিল মেরেছেন- তা দেখে অনেকেই তাজ্জব বনে গেছেন। সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সামনে রেখেই আজ পৌরসভা নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি রাখবেন পর্যবেক্ষকরা। যদিও এরই মধ্যে কী ধরনের ভোট হতে পারে তার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সকাল ৯টার মধ্যেই ভোট শেষ হয়ে যেতে পারে। যদিও তার স্ত্রী রওশন তার সঙ্গে একমত নন। তবে গত রাতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের রিপোর্টাররা যেসব খবর দিচ্ছিলেন তাতে এরশাদের আশঙ্কা সত্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত সাত বছর ধরে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বিরাজ করছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। এই দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য আওয়ামী লীগ যে সংগ্রাম করেছে পৃথিবীর খুব বেশি রাজনৈতিক দলের তেমন ইতিহাস নেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রেক্ষাপটে ৩০শে ডিসেম্বরের পৌরসভার নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সবগুলোতে জিতে গেলেও সরকারের কিছু আসবে যাবে না। আবার একটাতে না জিতলেও সরকার পরিবর্তন হয়ে যাবে না। সরকার পরিবর্তন হবে আগামী সাধারণ নির্বাচনে। তিনি আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগের নিজস্ব জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র-কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা জয়ী হবেন। এখন নির্বাচনের দিন বোঝা যাবে, জরিপ সঠিক কি না। আওয়ামী লীগের অন্য একাধিক নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগ দুশ’র বেশি পৌরসভায় জয়ী হবে। এটি সত্য, এ নির্বাচনে পরাজয়ে ক্ষমতার মসনদে কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে জনমতের কোনো পরীক্ষা হয়নি। কারণ যাই হোক না কেন, সে নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। ওই নির্বাচনের পরে একাধিক জরিপে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ার খবর এসেছে। এখন সত্যিকারের জরিপে আওয়ামী লীগকে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। জনগণের পরীক্ষাই তো রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল ছিল সে বিতর্ক আলাদা। রাজনীতিতে কোন সিদ্ধান্ত সঠিক আর কোনটি বেঠিক তা সমকালে সবসময় জানাও যায় না। যদিও ওই নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি যে খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারেনি তাতো বলাই যায়। দীর্ঘদিন পর আজ বুধবার আরেকটি বড় নির্বাচনী পরীক্ষার মুখোমুখি বিএনপি। যদিও নির্বাচনের লড়াইয়ে বিএনপির অতীত রেকর্ড উজ্জ্বল। তবে গত নয় বছরে দলটির প্রতিটি দিনই কেটেছে সংকটে। মোকাবিলা করতে হয়েছে আঘাতের পর আঘাত। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্য ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক সময় ছিল অত্যন্ত কঠিন। দল হিসেবেও বিএনপি এখন ছন্নছাড়া। বিএনপির নানা সমালোচনাও হয়। অনেকেই দলটির কৌশলের সমালোচনা করেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি বারবার ব্যর্থ হয়েছে- এ ব্যাপারে বোধকরি বিএনপি নেতারাও একমত। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের ভুল-শুদ্ধের বিচারের আসল মালিক জনগণ। সে বিষয়টি হয়তো অনেক সময়ই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা খেয়াল করেন না। সর্বশেষ সাত বছর আগে ধানের শীর্ষ প্রতীক হিসেবে জনগণের সামনে গিয়েছিল। সে পরীক্ষায় বিএনপি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। কিন্তু সে সময়কার পর্দার আড়ালের অনেক ঘটনাই এখনও আলোর মুখ দেখেনি। ইতিহাস হয়তো একদিন তার পর্দা সরিয়ে নিতে পারে। এরপর সবকটি স্থানীয় নির্বাচনেই বিএনপি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফলতার পরিচয় দিয়েছে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষায়, বিএনপি বিপুল জনসমর্থিত ব্যর্থ নেতাদের একটি রাজনৈতিক সংগঠন। যে দল সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, অহেতুক বিতর্ক তৈরি করে এবং কর্মী-সমর্থকদের নিজেদের কর্মসূচিতে জড়ো করতে ব্যর্থ হয়। তবে ভোটের রাজনীতিতে বরাবরই সফল বিএনপি ২৩৪টি পৌরসভার নির্বাচনে কেমন ফল করে সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। কারণ এ নির্বাচনকে অনেকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের রিহার্সালও মনে করছেন। ক্ষমতাসীনদের অধীনে বৈরী পরিবেশে নির্বাচনে বিএনপি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে পারে কি-না সেটিও হবে দেখার বিষয়। এ নির্বাচনে জয়ে বিএনপির দুঃসময় হয়তো কাটাবে না। তবে তা তাদের আগামী রাজনীতির বারুদ সরবরাহ করতে পারে।
এই নির্বাচন জাতীয় পার্টির জন্য ভালো-মন্দ কোনো খবরই নেই। একসময় তৃণমূলে বিপুল জনপ্রিয় এ দলটি এখন বিলীন হওয়ার পথে। আক্রমণের পর আক্রমণে ‘আইসিউতে’ থাকা জামায়াত এ নির্বাচনকে দেখছে নতুন শুরু হিসেবে। নিবন্ধন না থাকায় জামায়াত দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবে স্বতন্ত্র হিসেবে দলটির তরুণ প্রজন্মের অনেক নেতা নির্বাচনে লড়ছেন।
পরিসংখ্যানে আরও একবার চোখ বুলিয়ে নেয়া যায়। এ নির্বাচনে ২০টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। ২৩৪ পৌরসভায় মোট ভোটার রয়েছেন ৭০ লাখ ৯৯ হাজার ১৪৪। মেয়র পদে ৯৪৪, সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২ হাজার ৪৮০ ও কাউন্সিলর পদে ৮ হাজার ৭৪৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৩৪ ও বিএনপির ২২৩ জন মেয়র প্রার্থী রয়েছে। আর নারী মেয়র প্রার্থী ২০ জন ভোটে রয়েছেন। অবশ্য ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র পদে ৭ ও কাউন্সিলর পদে ৯৪ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৪০ জন নির্বাচিত হয়েছেন।
শেষ কথা: ফের আমজনতার দরবারে নৌকা ও ধানের শীষ। কিন্তু আমজনতা কি তাদের রায় দিতে পারবেন? দিনের শেষে জানা যাবে সে প্রশ্নের উত্তর। ভোটের উৎসবে যে প্রতীকই জিতুক না কেন, চূড়ান্ত জয় হবে গণতন্ত্রের।
নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যান: সিইসি
পৌর নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এমন আশা প্রকাশ করে ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আশা করি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হবে। আপনারা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যান। আমরা পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করেছি। মঙ্গলবার রাতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সিইসি বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়েছে। আশা করি আরও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ হবে। সকলের অংশ গ্রহণে এ পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্ন হবে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার জানামতে আমরা কোনো অন্যায় কাজ করিনি। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, প্রচুর পর্যবেক্ষককে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা অনুমতি দিয়েছি। সবই আমাদের দেশি পর্যবেক্ষক। একটি বিদেশি পর্যবেক্ষক সংস্থা শেষ সময়ে আবেদন করেছিল। আমরা স্বরাষ্ট্্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। সরকার যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে তবে তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। সিইসি জানান, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯১ জনকে ১০ লাখ ২৬ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
পর্যবেক্ষণে ৩৬ সংস্থা:
নির্বাচনে ৭টি পর্যবেক্ষণ সংস্থা অনুমতি পেয়েছে। এসব সংস্থার ১১৮ সদস্যকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য পরিচয়পত্র সরবরাহ করেছে ইসি। এর মধ্যে মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থার ৮ পর্যবেক্ষক, ব্রতীর ১৮, ফেমার ১৫, জানিপপের ১৪, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ২৩, ডেমোক্র্যাসি ওয়াচের ২৫ ও বাংলাদেশ মানবাধিকার সমন্বয় পরিষদের ১৫ জন। এ ছাড়া সারা দেশে ২৯টি সংস্থার ৪০৮৯ সদস্য মাঠপর্যায় থেকে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে। কয়েকটি পর্যবেক্ষণ সংস্থার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। দল দুটি আলাদাভাবে ১০টি করে পর্যবেক্ষণ সংস্থার ব্যাপারে আপত্তি তোলে। তবে এবার কোনো বিদেশি পর্যবেক্ষণ সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদন করেনি বলে জানিয়েছেন ইসির জনসংযোগ শাখার উপপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান। সংবাদকর্মীদের মধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে দুই হাজার এবং সারা দেশ থেকে প্রায় ৮ হাজার সাংবাদিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছেন।
ভোটের আগের রাতে বিশেষ অভিযান:
ভোট গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা আগে বিশেষ অভিযান চালাতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে সন্ত্রাসীদের তালিকা পাঠাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ই-মেইলযোগে ও ইসির ইন্টারনাল সার্ভারে এসব তালিকা গতকাল পাঠানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। নির্বাচনের মাঠের দুই হাজার ২৯ সন্ত্রাসী ও ক্যাডার সক্রিয় রয়েছে বলে গত বৃহস্পতিবার একটি গোয়েন্দা সংস্থা ইসিতে তালিকা পাঠায়। তালিকাটির অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়। সন্ত্রাসীরা নির্বাচনী এলাকায় বোমাবাজি, ভয়ভীতি দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার পাশাপাশি কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোটকেন্দ্রে বাধা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া সন্ত্রাসীরা সক্রিয় থাকলে নির্বাচনে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা বৃদ্ধি হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। দুই হাজার ২৯ সন্ত্রাসীর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৫৬১ বিএনপির এক হাজার ১২১, জাতীয় পার্টির ৪, জামায়াত-শিবিরের ২১১, জেএসএসের ১০, পিসিপি ১ এবং অন্যান্য ১২১। প্রতিবেদনে বলা হয়, সক্রিয় এসব সন্ত্রাসীর আশ্রয়দাতা বা গডফাদার রয়েছে ৬৩৭ জন। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২১১, বিএনপির ৩১২, জামায়াত-শিবিরের ৭৭, পিসিপির ১ ও জেএসএসের এক এবং অন্যান্য ৩৫ জন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব সাসমুল আলম, কমিশনের পক্ষ থেকে এ ধরনের নির্দেশনা থাকলে অবশ্যই তালিকা ডিসি-এসপিদের কাছে পাঠানো হবে।
গত ১৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা বৈঠকেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ক্যাডারদের ধরতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী বা ক্যাডারদের আটক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া নির্বাচনের দিন সরকারবিরোধী সন্ত্রাসীরা বা ক্যাডার ও নেতাকর্মীরা যাতে কোনো কেন্দ্র দখল না করতে পারে তার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। এ ছাড়া ক্যাডার মদতদাতা গডফাদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতেও বলেছে গোয়েন্দা সংস্থাটি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যেন হামলার শিকার না হন তার জন্য তাদের বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়েছে।
৩৪০৩ কেন্দ্রের ১১৮৪টি ঝুঁকিপূর্ণ:
এসব পৌরসভায় তিন হাজার ৪০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে এক হাজার ১৮৪টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইসি। শতকরা হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ৩৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। ওই তালিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে খুলনা বিভাগ। খুলনা বিভাগের ৪৭১টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৯৫টিই ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকি বিবেচনায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রংপুর বিভাগ। এ বিভাগের ৩০৪ কেন্দ্রের মধ্যে ১১৮টি ঝুঁকিপূর্ণ। তৃতীয় অবস্থানে বরিশাল বিভাগের ১৬৭ কেন্দ্রের মধ্যে ৬৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগের ৪৮০ কেন্দ্রের মধ্যে ১৬৯টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ঢাকা বিভাগের ৯৯১ কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৩৪৮টি। ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা রাজশাহী বিভাগের ৮০১ কেন্দ্রের মধ্যে ২৪৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে থাকা সিলেট বিভাগের ১৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। ইসি কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৯ জন, ঝুঁঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ৮ জন সশস্ত্র পুলিশসহ মোট ২০ জন সদস্য মোতায়েন থাকছে।
নিরাপত্তার চাদরে পৌর এলাকা:
গত ২৪শে নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করে ইসি। ১৪ই ডিসেম্বর প্রতীক পেয়ে টানা ১৫ দিন প্রচারে ছিলেন প্রার্থীরা। ২৮শে ডিসেম্বর মধ্যরাতে শেষ করতে হয়েছে প্রার্থীদের সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা। এখন শুধু প্রার্থীদের ভোটের হিসাব-নিকাশ মেলানোর পালা। প্রার্থীদের ভোটের হিসাব-নিকাশের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটের লক্ষ্যে লক্ষাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাঠে রেখেছে। ইসির উপসচিব সামসুল আলম জানান, পুলিশের প্রায় ৪৫ হাজার সদস্য, বিজিবির ৯ হাজার ৪১৫ সদস্য, র্যাবের ৮ হাজার ৪২৪ সদস্য, কোস্টগার্ডের ২২৫ সদস্য, আনসার-ভিডিপির ৪৯ হাজার ৭২৮ সদস্য এবং ব্যাটালিয়ন-আনসারের ৪ হাজার ৫১২ সদস্য চার দিনের জন্য মাঠে রয়েছে। সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১ লাখ ১৭ হাজার ৩০৪ সদস্য মাঠে থাকছেন বলে জানান তিনি। এ ছাড়া সোমবার থেকে মাঠে রয়েছেন ১ হাজার ২০৪ নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। ভোটের দিন ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২০ জন ও সাধারণ কেন্দ্রে ১৯ জন নিরাপত্তা সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। এসব পৌরসভায় মোট ভোটকেন্দ্রের এক-তৃতীয়াংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। ২৮শে ডিসেম্বর সোমবার রাত ১২টার আগেই বহিরাগতরা (যারা ভোটার বা বাসিন্দা নন) নির্বাচনী এলাকায় নিষিদ্ধ রয়েছে। গত সোমবার থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত অস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের সব ধরনের অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসী-ক্যাডারদের গ্রেপ্তার ও ভোটের পরিবেশ নিশ্চিতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ও পুলিশকে বলা হয়েছে।
ফলাফল নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা:
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন। এ-সংক্রান্ত একটি বিশেষ পরিপত্র জারি করে কমিশন বলেছে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি দুই ঘণ্টা পর পর ফলাফলের আপডেট দিতে হবে ইসিতে। এ ছাড়া পরিপূর্ণ ফলাফল কমিশনে পাঠানো পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের কার্যালয় ত্যাগ করতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কমিশন সূত্র জানায়, ফলাফল তদারকিতে ২৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে ৫ উপসচিব, ৫ সিনিয়র সহকারী সচিব ও ১৪ সহকারী সচিব রয়েছেন। তারা সার্বক্ষণিক ফলাফল সংগ্রহ করবেন। এর আগে গত সোমবার ভোট গ্রহণ ও গণনা শেষে দ্রুত ফলাফল পাঠাতে রিটার্নিং অফিসারদের বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ ছুটি: নির্বাচনের কারণে ২৩৪টি পৌরসভায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে নির্বাচনী এলাকায় সব অফিস বন্ধ থাকবে। উল্লেখ্য, গত ২৪শে নভেম্বর ২৩৪টি পৌরসভার নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়।
একনজরে পৌর নির্বাচন:
২৩৪ পৌরসভার ৩ হাজার ৫৫৫টি ভোটকেন্দ্রে ভোট হবে। এসব ভোটকেন্দ্রে ভোটকক্ষ থাকছে ২১ হাজার ৭১টি। রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা রয়েছেন প্রতি পৌরসভায়। ৬৬ হাজার ৭৬৮ জন রয়েছেন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা। প্রতি কেন্দ্রে ১ জন করে ৩ হাজার ৫৫৫ জন প্রিজাইডিং অফিসার, প্রতি বুথে ১ জন করে ২১ হাজার ৭১ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং প্রতি ভোটকক্ষে দুজন করে ৪২ হাজার ১৪২ জন পোলিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মোট ভোটার রয়েছেন ৭০ লাখ ৯৯ হাজার ১৪৪ জন।
এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ২৮৪ জন এবং নারী ভোটার ৩৫ লাখ ৮৬ হাজার ৮৬০ জন। মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত পদের ব্যালট পেপার, সিল, ফরম প্যাকেট ও অন্য নির্বাচনসামগ্রী নির্বাচনী এলাকায় পৌঁছেছে। মঙ্গলবার কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে এসব সামগ্রী। এ নির্বাচনের মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত পদের ২ কোটি ১৩ লাখের বেশি ব্যালট পেপার, ভোট দেয়ার সিলসহ নির্বাচনসামগ্রী পাঠিয়েছে ইসি।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৪১ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১২ হাজার:
এবার ২৩৪ পৌরসভায় একজন করে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ৭৩১টি ও সংরক্ষিত কাউন্সিলরের ২ হাজার ১৯৩টি পদ রয়েছেন। ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব সামসুল আলম জানান, ২৩৪ পৌরসভা নির্বাচনে ২০টি দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মেয়র পদে ৯৪৫ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের ৭ মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৮ হাজার ৭৪৬ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২ হাজার ৪৮০ জন। তবে এদের মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র পদে ৭ জন এবং কাউন্সিলর পদে ৯৪ জন ও নারী কাউন্সিলর পদে ৪০ জন নির্বাচিত হয়েছেন।
মেয়র পদে ২০ দল ও সাড়ে ৯০০ প্রতিদ্বন্দ্বী:
ইসির উপসচিব সামসুল আলম জানান, এবার মেয়র পদে আওয়ামী লীগের ২৩৪, বিএনপির ২২৩, জাতীয় পার্টির ৭৪ প্রার্থী রয়েছেন। দলীয় প্রার্থী ৬৬০ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে ২৮৫ জন। এতে অর্ধশতাধিক আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া এলডিপি ১, জেপি ৬, সিপিবি ৪, ন্যাপ ১, ওয়ার্কার্স পার্টি ৮, বিকল্পধারা ১, জাসদ ২১, বাসদ ১, তরিকত ফেডারেশন ১, এনপিপি ১৭, পিডিপি ১, ইসলামী ঐক্যজোট ১, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৫৭, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ১, খেলাফত মজলিসের ১ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন।
১০০ কোটি টাকার ভোট:
এবার পৌর নির্বাচন পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলায় নির্বাচন কমিশনের বাজেট রয়েছে ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালনা খাতে ৪৫ কোটি টাকা এবং আইনশৃঙ্খলা খাতে ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। ইতিমধ্যে এ বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থ ছাড়ও দিয়েছে। আমার দেশ










