মাহাবুবুল করিম, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
মঙ্গলবার, ৩ মে ২০১৬
‘মাদক’ ‘এখন বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সমস্যাগুলোর অন্যতম একটি সমস্যা। মাদকাসক্ত সমাজ জাতির পঙ্গুত্ব বরণের অন্যতম কারণ। আসুন মাদক সম্পর্কে জানি এবং এ নিয়ে সিটিজিবার্তা২৪ডটকম পাঠকদের সাথে আজ মুক্ত আলোচনা করি।’
মাদক কি?
মাদক দ্রব্য হলো একটি ভেষজ দ্রব্য যা ব্যবহারে বা প্রয়োগে মানবদেহে মস্তিস্কজাত সংজ্ঞাবহ সংবেদন হ্রাসপায় এবং বেদনাবোধ কমায় বা বন্ধ করে।
মাদক দ্রব্যে বেদনানাশক ক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকে তন্দ্রাচ্ছন্নতা, আনন্দোচ্ছাস, মেজাজ পরিবর্তন, মানসিক আচ্ছন্নতা, শ্বাস প্রশ্বাস অবনমন, রক্তচাপ হ্রাস, বমনেচ্ছা ও বমি, কোষ্টবদ্ধতা ও মূত্ররাস দেখা দেয়।
মাদক দ্রব্যকে সহজভাবে বলা যায় যা গ্রহণে মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব পড়ে এবং যে দ্রব্য আসক্তি সৃষ্টি করে, তাই মাদকদ্রব্য।
মাদকাসক্তি কি?
মাদকাসক্তি হলো মানুষের এমন একটি অবস্থা যা ব্যবহারে মানুষ অভ্যস্থ হয়ে পড়ে এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর মাদক গ্রহণের অভ্যাস্থ হওয়াই মাদকাসক্ত। মাদকাসক্ত আক্রান্ত যে কেউ হঠাৎ মাদক গ্রহণ করতে না দিলে নানান ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়।
মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছরের বয়সের মানুষ যার হার ৭০ ভাগ। অন্যদিকে মাদক গ্রহণের গড় বয়স ২২ বছর।
মাদকাসক্তির লক্ষণসমূহঃ
নিম্নে বর্ণিত কারণসমূহ মাদকাসক্ত ব্যক্তির আচরণ, অভ্যাস এবং জীবন চলাচলনে দেখা যায়।
* হঠাৎ নতুন বন্ধুদের সাথে চলাফেরা শুরু করা।
* বিভিন্ন অজুহতে ঘনঘন টাকা চাওয়া।
* আগের তুলনায় দেরিতে বাড়ি ফেরা।
* রাতে জেগে থাকা এবং দিনে ঘুমের প্রবণতা বৃদ্ধি করা।
* ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর অস্বাভাবিক আচরণ করা।
* খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেয়া এবং ওজন কমে যাওয়া।
* অতিরিক্ত মাত্রায় মিষ্টি খেতে আরম্ভ করা এবং ঘনঘন চা, সিগেরট পান করা।
* অযথা টয়লেটে দীর্ঘ সময় ব্যয় করা।
* ঘনঘন পাতলা পায়খানা হওয়া।
* প্রচুর ঘুমহওয়া অস্থিরতা এবং অস্বস্তি বোধ করা।
* যৌন ক্রিয়ায় অনীহা এবং যৌন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া।
* মিথ্যে কথা বলার প্রবণতা।
* পরিবারের সদস্যদের সাথে মনোমালিন্য।
* অকারণে বিরক্ত বোধ করা। হঠাৎ মনমানসিকতা বিরিবর্তন দেখা দেয়া।
* ঘরে তামাকের বা সিগারেটের টুকরো পড়ে থাকা। প্লাস্টিকের বা কাঁচের বোতল, কাগজের পুরিয়া, ইনজেকশন, খালি শিশি, পোড়ানো দিয়াশালাই এর কাঠি সহ নানাবিধ অস্বাভাবিক জিনিস বৃদ্ধি পাওয়া।
* লেখাপড়া, খোলাধুলো, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অনীহা।
* কাপড় চোপড়ে দুর্গন্ধ বৃদ্ধি পাওয়া ও পোড়া দাগ থাকা।
ইত্যাদি একাধিক বিষয় পরিলক্ষিত ব্যক্তি মাদকাসক্ত তা নিশ্চিত ভাবেই সন্দেহ করা যায়।
মাদকাসক্তির কারণঃ
মাদকাসক্তি একটি সমাজিক ব্যাধি তাই কি কারণে এর প্রভাব ব্যাক্তি জীবনে প্রতিয়মান হয় তা বলা খুবই কঠিন।
সাধারণ তিনটি কারণে মাদক গ্রহণের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিতঃ
ক) হতাশাঃ হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের মাঝেই মাদক গ্রহনের প্রবণতা লক্ষ করা যায় বেশী। কোন করণে মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গ হলে মানুষ হতাশা গ্রস্থ হয় আর তখনই মাদক গ্রহণে উৎসাহী হয়ে উঠে।
খ) কৌতূহল নিবারণ ও প্রবল আগ্রহেঃ মানুষ সৃষ্টিশীল তাই তাদের মনের ভেতরে কৌতুহল থাকে সবসময়। নতুনকে জানার ইচ্ছে এবং আগ্রহতা থেকে মাদকের সাথে পরিচয় ঘটায় এবং এভাবেই মাদক গ্রহণে অভ্যস্থ করে তুলে।
গ) কুসংগঃ কুসংগ মানুষকে বিপদগামী করে তাই মাদক গ্রহনে কুসংগই একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
মাদকাসক্তি স্বাস্থ্যের উপর প্রভাবঃ
মানসিক অবস্থার অবনতি তথা মানসিক রোগ সৃষ্টি সহ একাধিক রোগ সৃষ্টির জন্য মাদক গ্রহণই দায়ি যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মাদক গ্রহণকারীরা একাধিক ব্যক্তি একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করে যার ফলে মরণ ব্যাধি এইডস হওয়ার আশঙ্কায় থাকে। এছাড়া হেপাটাইটিস, ফুসফুসে ক্যান্সার, ক্যান্সার, স্ট্রোক, হৃদরোগ সহ যকৃত, মস্তিস্ক ও মেরুদন্ডে রোগ হতে পারে।
মাদকাসক্তি সমাজ ও পরিবারের জন্য হুমকিঃ
যে কোন পরিবার এবং সমাজের জন্য মাদকসক্ত ব্যক্তি হুমকি স্বরুপ। পরিবাবারের সদস্যদের সাথে কথায় কথায় মনোমালিন্য ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন উপায় বের করে আসক্তি যে কেউ। টাকা না পেলে ছিনতাই, ধর্ষন, খুন সহ নানাবিধি অপরাধ সংগঠিত করে মাদকাসক্ত ব্যক্তি। যা সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি সহ শৃঙ্খলা নষ্ট করতে যথেষ্ট ভুমিকা রাখে। তাই কোন পরিবার তথা সমাজ তথা জাতির জন্যই মাদকাসক্ত অভিশাপ।
মাদক চোরাচালান এবং মাদক ব্যবসাঃ
মাদক গ্রহীতার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই মাদকের চাহিদাও বাড়ছে তাই মাদক দ্রব্যেরে উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকাসক্ত বৃদ্ধি যা আমাদের জন্য বেশ উদ্বেগজনক সংবাদ। বৃদ্ধি পাচ্ছে এর চোরাচালান। বাংলাদেশের চারিদিকে সীমান্ত হওয়ায় খুব সহজেই মাদক পার্শ্ববর্তী প্রতিটি দেশথেকে আমাদের দেশে প্রবেশ করে বিভিন্ন মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ভারত থেকে ফেন্সিডিল এবং মায়ানমার থেকে ইয়াবা সবচেয়ে বেশী পরিমাণ চোরাচালান হয়। এছাড়াও বেশ কিছু মাদক দ্রব্য আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়তই পাওয়া যায়।
এগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ
মাদক দ্রব্যের নাম + বর্তমান বাজার দরঃ
ফেন্সিডিল (২২০-২৫০টাকা)
গাজা( ১০ টাকা পুরিয়া)
হিরোইন (একচিমটি ২০০টাকা)
গিট্টু( একচিমটি ৮০ টাকা)
চুযানি (প্রতিগ্লাস ২৫ টাকা)
বাংলামদ(প্রতিগ্লাস ৯গ টাকা)
ইয়াবা (ট্যাবলেট ৩০০ টাকা)
টি.টি০( ৩৫ টাকা)
হর্স(১৩০০ টাকা)
মদ (সাধারণত ৫৫০ থেকে শুরু)
ডেন্ডি( ১০টাকা)
মাদক দ্রব্য উৎপাদন এবং পরিবহনে আন্তর্জাতিক রুটঃ
মাদক দ্রব্য পরিবহন এবং চোরাচালানের জন্য আন্তর্জাতিক স্বিকৃত তিনটি রুট রয়েছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল(লাওস, মায়ানমার), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান, আরান, পাকিস্তান), গোল্ডেন ওয়েজ, হিরোইন উৎপাদনের উৎস। কোকেন উৎপাদন করে মেক্সিকো, যুগোশ্লাভিয়া, হাঙ্গেরীতে। সাইপ্রাস, ইরান, আফগানিস্থান, পাকিস্তান, ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাউস এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণে তাসমেনিয়ায় আফিম এবং হিরোইন উৎপাদিত হয়। হাশিস উৎপাদনের জন্য জ্যামাইকা, মরক্কো, জর্দান, পাকিস্তান, আফগানিস্থান, ভারত ও নেপাল বেশ আলোচিত। এছাড়া বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশে গাজা উৎপাদিত হয়।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকাঃ
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সবচেয় বড় ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার। কেননা প্রতিটি পরিবারই মানুষের প্রথম পাঠাগার তাই প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ এতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বারবার সজাগ এবং সু-শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে এ বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে মাদকের ভয়ংকর ভূমিকা সম্পর্কে।
একটি সচেতন সমাজ রক্ষা করতে পারে মাদকমুক্ত রাখতে। সমাজের ব্যাক্তিবর্গরা সচেতন হলে সমাজের অন্যকোন ব্যক্তিই মাদক গ্রহণ করতে পারেনা।
ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি ভঙ্গি মাদক গ্রহণে সবসময় নিরুৎসাহিত করে তাই ধর্মীয় মূল্যবোধ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। গণমানুষের মাধ্যমে সচেতনা বৃদ্ধি করতে পত্রিকা, টেলিভিশন এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যম সমূহ ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনঃ
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে যুগপোযগী আইন প্রয়োগ এবং বাস্তবায়নে পারে সমাজকে মাদকাসক্তি মুক্ত রাখতে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন এবং বাস্তবায়নে আলাদা ট্রাইব্যুনাল, ভ্রাম্যমান আদালত সহ নানাবিধি কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে মাদক মুক্ত সমাজ গঠনে আইন ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকিৎসা এবং পূনর্বাসনঃ
মাদক দ্রব্যে আসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে নিয়ে আসা সম্ভব। এজন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তুলে চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া সুস্থ্য জীবনে ফিরে আসার পর যেন আবারও একই ভাবে আক্রান্ত না হয় এজন্য তাদের পূনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন স্বাভাবিক ব্যবসার মাধ্যমে পূনর্বাসন করতে হবে।
সামাজিক সচেতনাই এর একমাত্র হাতিয়ারঃ
সমাজের সর্বস্থরের মানুষ এই মরণ নেশা মাদকের প্রতি আক্রান্ত হচ্ছে কি কিশোর কি তরুণ কি পুরুষ কিংবা মহিলা সর্বস্থরের মানুষই এই মাদকে আক্রান্ত। তাই আমাদের সমাজকে রক্ষায় আমাদেরি নিজেদের থেকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা যে খানে থাকিনা কেন মাদককে না বলি সবসময়, মুক্ত ভাবে আলোচনাই পারে মাদক মুক্ত সমাজ গড়তে। তাই আসুন সবখানে সবঅবস্থায় মাদককে না বলি। মাদক মুক্ত সমাজ গড়তে সমাজিক সচেতনা বৃদ্ধি করি।

