বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০১৬
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
কোষ্ঠী বা জন্মপত্রিকায় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল অধরচন্দ্র। পিতার দেওয়া নাম ছিল প্রবোধকুমার আর ডাকনাম মানিক। কলেজ ক্যান্টিনে এক দিন আড্ডা দেওয়া অবস্থায় এক বন্ধুর সাথে বাজী ধরেন তাঁর লেখা গল্প বিচিত্রায় ছাপাবেন। সে সময় কলকাতায় বিচিত্রা পত্রিকা ছিল অত্যন্ত বিখ্যাত এবং কেবল নামকরা লেখকেরাই তাতে লিখতেন। লিখে ফেললেন প্রথম গল্প অতসী মামী এবং সেটি বিচিত্রার সম্পাদক বরাবর পাঠিয়ে দেন। পাঠানোর চার মাস পর বিচিত্রায় ছাপা হয় লেখা। গল্পের শেষে নাম সাক্ষর করেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশের সাথে সাথেই গল্পটি পাঠক প্রিয়তা অর্জন করে। সেই থেকে পরিচিত বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে।
পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের নিকট মালবদিয়া গ্রামে, মা নীরদা সুন্দরীর বাড়ি গাউদিয়া গ্রামে, যে গ্রামের পটভূমি নিয়েই তিনি রচনা করেন তার প্রসিদ্ধ উপন্যাস পুতুলনাচের ইতিকথা।
কত রকম চরিত্র চারপাশে, যেমন শশী, কুসুম, গোপাল আরো কত !
উপন্যাস সম্পর্কে লেখক ই বলেছেন, “জানিবার এত বিষয়, উপভোগ করিবার এত উপায়, বিজ্ঞান ও কাব্য মিশিয়া এমন জটিল, এমন রসালো মানুষের জীবন ?”
“নদীর মত নিজের খুশিতে গড়া পথে কি মানুষের জীবনের স্রোত বহিতে পারে? মানুষের হাতে কাটা খালে তার গতি, এক অজানা শক্তির অনিবার্য ইঙ্গিতে। মাধ্যাকর্ষণের মত যা চিরন্তন অপরিবর্তনীয়।”
যুক্তি দ্বারা দায়ীত্ব কর্তব্য সহ জীবন চালনারত যুবক শশী পরাজিত ই হয়ে গেছে বারংবার ই বলা চলে,পুতুলনাচের ইতিকথা’র কুসুম যখন শশীকে বলে তার কাছে দাঁড়ালে তার শরীর ‘এমন কেন করে’ তখন শশী যে বলে, ‘শরীর শরীর। তোমার মন নাই কুসুম?’
সাথে সাথে যেন মৃত্যু ঘটে কুসুমের হৃদয়ের, আর জন্ম নেয় আত্ম সচেতনা, মর্যাদাবোধ সম্পন্ন হয়ে উঠতে থাকে সে, একসনয় শশীকে উদ্দেশ্য করে বলে ”
“চিরদিন কি একরকম যায়??মানুষ কি লোহার গড়া যে সে চিরদিন একরকম থাকবে,বদলাবে না?বলতে বসেছি যখন তখন কড়া করেই বলি,আজ হাত ধরে টানলেও আমি যাবোনা।আপনি কি ভেবেছিলেন আপনার সুবিধামতো সময়ে আমাকে ডাকবেন আর আমি চলে আসবো”?
প্রচুর লিখেছেন,আর যা লিখেছেন কিছুই ফেলা যায়নি, মানিক বন্দোপাধ্যায় এর ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র একটি চরিত্রকে আহমেদ ছফার বর্ণনায় সেটে দিচ্ছি, বড় প্রাসঙ্গিক বলেই এই সময়টাতে ওই হোসেন মিয়ারা –
”হোসেন মিয়ার পরিচয় এভাবে দিয়েছেন লেখক। বাড়ি ছিল নোয়াখালী অঞ্চলে। বেশ কয়েক বছর আগে পদ্মার তীরবর্তী কেতুপুর গ্রামে সে আসে এবং সে সময়ে জহুর মাঝির বাড়িতে আশ্রিত হিসেবেই ছিল, অন্যান্য মাঝিদের সঙ্গে মাঝিগিরি করেই জীবিকা নির্বাহ করত।
এ কয় বছরে সে বেজায় ধনী হয়ে উঠেছে। এখন দাড়িতে মেহেদীর রং লাগায়, ফিন ফিনে আদ্দির পঞ্জাবী শরীরে চড়ায়, মাত্র অল্প কিছুদিন আগেই দু’নম্বরের স্ত্রীকে বিয়ে করে এনেছে।
বহিরঙ্গের দিক দিয়ে দেখলে হোসেন নোয়াখালী জেলার মুন্সী-মোল্লা জাতীয় মুসলমান। সে মুন্সী-মোল্লার মতো কথা বলে, পোশাক পরে, দাড়ি রাখে, আবার দাড়িতে নুরে মেহেদীর রংও লাগায়।
এ হলো বাইরের ব্যাপার। ভেতরের মানুষটি ঠিক একেবারে অন্যরকম। হোসেনের মধ্যে ধর্মীয় কোনো সংস্কারের সামান্য আঁচড়ও নেই। এ নিয়ে সে কোনো কথাই বলে না। সে শুধু বোঝে তার জন্য কোনটা সুবিধার, কোনটা অসুবিধার। জগৎ এবং জীবনকে সে যে দৃষ্টিতে দেখে তার সঙ্গে অন্য দশজন প্রাচ্য দেশীয় মানুষের দেখার কোনো মিল নেই।
আজিজ সাহেব প্রস্তাব দিয়েছিলেন যদি ময়নাদ্বীপে মসজিদ স্থাপন করে এবং হিন্দুদের জমি দেয়া বন্ধ করে তাহলে বসবাসকারী সংগ্রহের কিছুই অসুবিধা হবে না। হোসেন সে প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
গ্রহণ না করার পেছনে কারণ হলো, মুসলমানদের জন্য যদি মসজিদ বানিয়ে দেয়, তাহলে হিন্দুদের জন্যও মন্দির বানিয়ে দিতে হবে। আর হিন্দুদের যদি সে না নিয়ে যায়, তাহলে এগারো মাইল দীর্ঘ এই দ্বীপ সে কিভাবে মানুষ দিয়ে পূরণ করবে।
তাই হোসেনের যুক্তি হলো, মন্দির-মসজিদ ওসব ফ্যাসাদে গিয়ে কাজ নেই। ওসব ছাড়াই চলবে ময়নাদ্বীপ। ময়নাদ্বীপে সে যে নতুন মানব সমাজ সৃষ্টি করতে চায় তারা সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হবে,হবে নতুন বিশ্বাসে বলীয়ান; নতুন মূল্যচেতনায় সমৃদ্ধ হবে তাদের অন্তর্লোক। অতিকষ্টে যেসব ভাঙাচোরা মানুষকে হোসেন সংগ্রহ করে,পাত্রী ঠিক করে তাদের বিয়ে দেয়, তাদের প্রতিও হোসেনের কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু এই নর-নারীর মিলনে যে নতুন মানুষ-মানুষী আসবে এবং ময়নাদ্বীপে বসবাস করবে, তাদের প্রতি রয়েছে তার প্রকৃত আগ্রহ।
স্বয়ং বিধাতা-পুরুষও নাকি একজন কবি। এই বিশ্বব্রহ্মান্ড তাঁর কবিতা। মানিকবাবুর হোসেন মিয়াও একজন ক্ষুদে বিধাতা-পুরুষ”।
১৯ মে শুভ জন্মদিনে
কৃতজ্ঞতা : নেট, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের একটি চরিত্র – আহমদ ছফা, মানিক বন্দোপাধ্যায় : আমাদের কালো মানিক,অনিরুদ্ধ আলম

