ভারতীয় চ্যানেলের আসক্তি ইয়াবার চেয়েও ক্ষতিকর

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০১৫

সিটিজিবার্তা ২৪ ডটকম

IMG_3136ভারতীয় টিভি চ্যানেল দেখার সময় সংঘবদ্ধ দর্শক পুলিশের হাতে আটক। এরকম খবর গনমাধ্যমে দেখা যাবে? অপেক্ষায় আছি এধরনের খবর প্রচারের । যেভাবে ফেন্সিডিল এবং ইয়াবা বিক্রেতাকে আটক করা হয়, কিংবা এই দুই মাদকে আক্রান্তদের যেভাবে নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়, ঠিক সেই আচরণ কবে ভারতীয় চ্যানেলে আসক্ত দর্শকদের সঙ্গে শুরু হবে, অপেক্ষায় আছি সেই দিনটির।আমরা ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা ফেন্সিডিলের কথা জানি। নব্বইর দশকের গোড়া থেকে সারাদেশ ফেন্সিডিল আসতে শুরু করে। তরুণ তরুণীরা ফেন্সিডিলে দলে দলে আসক্ত হতে থাকে। অফুরান চাহিদা সামাল দিতে বাংলাদেশের সীমান্তের নিকতবর্তী ভারতের এলাকাগুলোতে ফেন্সিডিলের চালু হবার খবর আছে।

ফেন্সিডিল বিক্রি এবং চোরাইপথে ফেন্সিডিল নিয়ে আসতে যতো উদ্যোগই নেয়া হোক কেন, এর বিপণনকারীরা নতুন নতুন ফন্দি বের করেছে ফেন্সিডিল সরবরাহে। কাঁঠালের ভেতর,মাছের ভেতর এবং চালের বস্তায় নানা ফন্দি ফিকিরে ফেন্সিডিল বিপণন চলছেই। এর সঙ্গে বেড়েছে নানান বাহারি ইয়াবা সরবরাহ। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইয়াবা সেবনের মাত্রা বেড়েছে। ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিনোদন জগতের মানুষ এবং সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে পড়ুয়ারা। মাল্টিলেভেল ব্যবসার অনুকরণের চলছে ইয়াবা ব্যাবসা। আসক্তের সংখ্যায় বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।

তবে গণিত জ্যামিতির সকল হিসাব ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের দর্শকদের ভারতীয় চ্যানেলের আসক্তি। ভারতীয় চ্যানেলের যতো বাংলাদেশী দর্শক আসক্ত, এতোটা আসক্তি মাদকের প্রতি ও নেই।সমস্যা হলো এই নেশাই বুঁদ হয়ে আড়াই বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পর্যন্ত।জরিপ বলে- ভারতীয় চ্যানেলে মেয়েরাই বেশি নেশাতুর হয়ে আছে। ছেলেরা পিছিয়ে আছে তা বলা যাবে না স্টার প্লাস, সনি, কালারস, স্টার গোল্ড, লাইফ ওকে, এম টিউন, বি ফর ইউ, জি মিউজিক,  স্টার জলসা, জলসা মুভিস, সনি আট, জিবাংলা মুবিজ, তারা মিউজিক  প্রোগ্রামের হজম করছে পরিবারের সবাই।

মাদকের নেশায় যেমন সামজিক ও শারীরিক ক্ষতি হয়, তেমনি ভারতীয় চ্যানেলের নেশাতেও সামাজিক ও শারীরিক পার্শ্বপতিক্রিয়া রয়েছে।পরিবারের কোন সদস্যের মাদকের আসক্তি একটি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে তাঁর উদাহরণ এখন আশপাশে তাকালেই পাওয়া যায়। কারো পরিবার, কারো শিক্ষা জীবন এবং অনেক প্রতিভাই অংকুরে পচে গেছে মাদকের নীল ছোবলে। একইভাবে ভারতীয় চ্যানেলের প্রভাবে দেখা দেয় সামাজিক ক্ষতগুলো এখন রুপ দিয়েছে কর্কট রোগে। প্রথমত, শিশু থেকে কিশোর বয়সীরা ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষাকে অনুসরণ করতে শুরু করেছে। চলন-বলনে এবং পোষাকে তারা ভারতীয় চ্যানেলের পাত্র-পাত্রী অনুসরণ করে। তাদের মা-বাবা এবং অভিভাবকরা আরেক ধাপ এগিয়ে পোশাক-অলংকার এবং সামাজিকতায় ভারতীয় আদল নিয়ে এসেছে। এরসঙ্গে যোগ হচ্ছে দূরশিক্ষনের মাধ্যমে কূটচাল, পরকীয়া, সহিংসতা’র মতো বিষয়গুলো শিক্ষা নেয়া। এই শিক্ষণগুলো  চর্চা এখন পুরোদমে চলছে পরিবার এবং সমাজে। কিন্তু যে নেশা একবার পান করা হয়ে গেছে তা ছাড়া কি সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই পার্শ্বপতিক্রিয়ার উদাহরণগুলো দেখার পরও নেশার ভোজ দিন দিন বাড়ছে, কমছে না একমিনিটও।

 

ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর নিত্যনতুন উপকরণের যোগানের সঙ্গে পেরে উঠতে পারছেনা আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। পারছেনা এর একটি সঙ্গত কারণ হলো বহুভাষা। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সেই পরিমাণ কলাকুশলী যোগান দেয়ার সাধ্য নেই। সেই সঙ্গে ভারতের জনসংখ্যার অনুপাতে পণ্য ও বিজ্ঞাপনের বাজারের কাছে বাংলাদেশের দুটি বাজারি খড়তুল্য। ফলে ভারতের চ্যানেলের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার কোন দিক থেকে সামর্থ বাংলাদেশের নেই।তবে স্মরণ করা যেতে পারে, ভারতে টেলিভিশন চ্যানেলের বিস্ফোরণ ঘটার আগে, বাংলাদেশের বিটিভির অনুষ্ঠান কিন্তু ভারতের পশিমবঙ্গে জনপ্রিয় ছিল।বিটিভিঁতে অনেক অনুষঠান   শুরু হয়েছিল, যা এখন ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে জমকালো করে উপস্থাপিত হয়।বলা যেতে পারে রিয়ালিটি শোর কথাই।বিটিভিই নতুন কুঁড়ি শুরু করেছিল।এখন আমরা ইন্ডিয়ান আইডলে মাত হচ্ছি।বাংলাদেশে এখন শত শত নাটক তৈরি হচ্ছে।তৈরি হচ্ছে টেলিফিল্ম। কিন্তু এই আয়োজনগুলো দেখছে কে?লঞ্চঘাট থেকে প্রাসাদ্যেম ফ্ল্যাট সর্বত্রই সকাল থেকে রাত রিমোর্ট খুঁজে ফিরে ভারতীয় টিভি চ্যানেল।

কোন কোন দিন বেশ গর্ব করেই কেউ কেউ বলে বসেন তার মেয়ে বা ছেলেটি ভারতীয় চ্যানেলের কোন না কোন অনুষঠান দেখছিল।অনেকের ঢংয়ে ভরা অনুযোগ-অভিযোগও শুনতে পাই বাসায় তাকে কোন একটা কিছু কিনে দিতে হয়েছে,যে আবদারটি এসেছে ভারতীয় চ্যানেল দেখে। এই যখন অবস্থা তখন আমাদের তৈরি খবর কয়জনা দেখছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় না পড়ে উপায় আছে?তবে সান্ত্বনা খুঁজি অনুষঠান নির্ভর চ্যানেলগুলোর কথা ভেবে। তাদের উদ্যোগের প্রায় ষোল আনাই তো মিছে হয়ে যায় ভারতীয় টিভি চ্যানেলের জোয়ারে।

বাংলাদেশে যখন পিক আওয়ার তখন সবাই তাঁর সেরা অনুষঠানটিই দেখান। কিন্তু ওদিকে সীমানার ওপারে তখন সেখানকার পিক আওয়ারের অনুষঠানগুলোও শুরু হয়ে গেছে। কোন দর্শক হয়তো করুনা করে নিজের দেশের টেলিভিশনে কিছুক্ষন যাত্রা বিরতি দেন। তাতেই ধন্য হতে হয়।

তার উপর দাড়িয়ে কোন কোন অনুষঠানের ঠাই হয় টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট (টিআরপি)তে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর রুগ্ন হবার কারণ একটাই, সেটি হলো এদেশের দর্শকদের ভারতীয় চ্যানেলের নেশাই আসক্ত হয়ে পড়া। এই আসক্তিরোধে সরকারের হস্তক্ষেপ চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু এ কথা সরকারকে মানতেই হবে সেদিন খুব দূরে নেই যেদিন ভারতীয় টিভি চ্যানেল কোথায় দেখা হচ্ছে, তার খোজে অভিযান চালাতে হবে যেভাবে মাদক ও চোরাকারবারিদের খুজতে অভিযান চালানো হয়।

রাশেদুল করিম

ব্যুরো প্রধান, সিটিজিবার্তা ২৪ ডটকম

 




Leave a Reply