অপরাজনীতির বলি হতে হয়েছে ডাঃ জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুকে

সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

সিটিজিবার্তা২৪.কম

অপরাজনীতির বলি হতে হয়েছে টিংকুকে

ছবি ঃ ডাঃ জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু

মিনার মনসুর : যুধিষ্ঠিরকে জীবিতাবস্থায় স্বর্গারোহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি সরাসরি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘মহাভারতের কথা’ গ্রন্থে এ-প্রসঙ্গে গুরুতর একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। সেটি হলো, যুধিষ্ঠির স্বর্গবাসী হওয়ার উপযুক্ত কিনা তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন হলো, স্বর্গ আদৌ কি যুধিষ্ঠিরের উপযুক্ত স্থান? জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই আমার কেন জানি এ কথাগুলো মনে পড়ে যায়। টিংকু নামক অত্যন্ত মেধাবী চিরকিশোরটি যে বিদ্যমান নষ্টভ্রষ্ট রাজনীতির বলি- তা নিয়ে আমার মনে কোনো সংশয় কখনোই ছিল না। কিন্তু অমীমাংসিত যে-প্রশ্নটি আমাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তাহলো, যে-রাজনীতির আবহের মধ্যে টিংকু বেড়ে উঠেছিল- সেই রাজনীতিই কি টিংকুর অনুপযুক্ত ছিল, নাকি টিংকু নিজেই উপযুক্ত ছিল না এই রাজনীতির।

আমরা শুধু যে এক পাড়ায় একই পরিবারের অভিন্নহৃদয় সদস্যের মতো বেড়ে উঠেছি তা নয়, জীবনের জটিল যাত্রাপথে আমরা ছিলাম একই নৌকার যাত্রীও। এখন বুঝি যে আমার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কথা ছিল না। তবে রাজনীতি যে আমার চায়ের কাপ নয়- তা বুঝতে আমার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সময় লেগে গিয়েছিল। কথাটি টিংকুর ক্ষেত্রেও সত্য হতে পারতো। কারণ সে ছিল আপাদমস্তক ভালোবাসাকাতর কবিতাপ্রিয় কোমল মনের মানুষ- যে তার শিশুকালেই পিতার বটবৃক্ষছায়া থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। সম্ভবত এ কারণেই টিংকুর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই বিশ্বাস করেন যে তার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার জন্যে আমিই দায়ী। কথাটি পুরোপুরি অসত্য নয়। তবে আমাদের মতো ‘মিসফিট’ মানুষদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার জন্যে আসলেই যদি কাউকে দায়ী করতে হয় তাহলে প্রথমেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে পঁচাত্তরপরবর্তী সেই রুদ্ধশ্বাস সময়কে।

প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন যে এমন সময় বাংলার ইতিহাসে আগে কখনো আসেনি। ভবিষ্যতেও হয়তো আর আসবে না। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাধীনতার যে অনিন্দ্যসুন্দর আলোর আস্বাদ তারা পেয়েছিল, সেটা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঘটে যায় মানবেতিহাসের নৃশংসতম সেই হত্যাযজ্ঞ। স্বাধীনতার যিনি স্থপতি তাঁকেই কিনা হত্যা করা হলো সপরিবারে। রক্ষা পেল না গর্ভবতী নারী কিংবা নিষ্পাপ শিশুও। অথচ যাদের প্রতিবাদে গর্জে ওঠার কথা, যারা বঙ্গবন্ধুর কানে সর্বক্ষণ বর্ষণ করতেন মোসাহেবির মধু- মুহূর্তে বদলে যায় তাদের অনেকের মুখের আদল ও আলখেল্লা। প্রতারক এ সময়ই মূলত আমাদের টেনে নিয়ে আসে রাজনীতির রুক্ষ ও কণ্টকময় মাঠে। আমার এ বক্তব্য নিয়ে যদি কারো মনে বিন্দুমাত্র সংশয় জাগে আমি তাকে সবিনয়ে অনুরোধ করবো সেই সময়ের টিংকুর কচি মুখখানি দেখার জন্যে- মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যা শিশুর মতো সরল। কী অদ্ভুত মায়াময় সব মুখ। এও স্মরণ করতে বলি যে সেই তুমুল প্রতিযোগিতার যুগে টিংকু ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। আর মোজাম্মেল বাবু বুয়েটে। মন্টিই (বর্তমানে বিবিসিতে কর্মরত মিজানুর রহমান খান) বা কম কীসে!

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় জরাজীর্ণ একটি হোটেলে আমরা আড্ডা দিতাম। স্বপ্নরাঙা ঝাঁক ঝাঁক মায়াবী চোখের অপরূপ আলোয় ভেসে যেত তার যত জীর্ণতা। টিংকু-বাবুরা ছিল সেই আড্ডার নিয়মিত সদস্য। সারা দেশে এরকম অসংখ্য মেধাবী তরুণ জড়ো হয়েছিল রাজনীতির মাঠে। তারা কবিতা লিখত। প্রকাশ করত তাকলাগানো সব লিটলম্যাগ। তাদের লেখা দেয়াললিখন স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়তো জনতার হৃদয়ে হৃদয়ে। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের লালনপালনকারী জান্তা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রকম্পিত হতে থাকে বঙ্গবন্ধুর জয়ধ্বনিতে- যে বঙ্গবন্ধুর নাম তারা মুছে ফেলতে চেয়েছিল চিরতরে। এ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিল টিংকুর মতো অদম্য তরুণরা। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর শোনার পর সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন তাঁর ডায়েরীতে লিখেছিলেন, মৃত বঙ্গবন্ধু জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে শক্তিশালী হয়ে পুনরার্বিভূত হবেন। সেটাই হয়েছে। কিন্তু ট্র্যাজিডি হলো, যারা অন্ধকারের অচলায়তনে নিজেদের জীবন ঘষে এ পুনরুত্থানের পথ তৈরি করেছিল, এমনকি বঙ্গবন্ধুর স্বপক্ষের রাজনীতিও তাদের গ্রহণ করেনি।

সমরেশ মজুমদার নকশাল-বিদ্রোহ নিয়ে লেখা তাঁর সাড়া জাগানো ট্রিলজিতে একটি চরিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন, সে চেয়েছিল ‘বড়ো বাঘের’ মতো বাঁচতে। স্বাধীন স্বয়ম্ভর। এ অংশটা টিংকুর খুব প্রিয় ছিল। বলতে দ্বিধা নেই যে টিংকুও ছিল বড়ো বাঘের মতো এক মানুষ। হৃদয় ছিল বিশাল। ক্ষুদ্র জীবনে বহু ঝড়ঝঞ্ঝা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। তার ব্যক্তিজীবনও কম ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ছিল না। কিন্তু সেই আঘাতও টলাতে পারেনি তাকে। কিন্তু যে-রাজনীতির জন্যে সে সর্বস্ব পণ করেছিল সেই রাজনীতির যে কদর্য রূপ তাকে দেখতে হয়েছে- সেটাই সম্ভবত বদলে দিয়েছিল টিংকুর জীবনের রসায়ন। আমি নিশ্চিত যে ঢাকা মেডিক্যালের মেধাবী ছাত্র টিংকুর যে ঠিকাদার রূপটি পরবর্তীকালে আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে গভীর বেদনার সঙ্গে- সেটা তার আসল চেহারা ছিল না। প্রত্যাখ্যানের এক অসহ্য যন্ত্রণাই তাকে এ-পথে ঠেলে দিয়েছিল বলে আমার বিশ্বাস। সেই যন্ত্রণার জন্যে মূলত দায়ী ছিল আমাদের নষ্টভ্রষ্ট রাজনীতি। আমাদের বন্ধু কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ লিখেছেন, ‘বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে/রাজনীতিকের ধমনীশিরায় সুবিধাবাদের পাপ।’ যে-কারণে ‘হাজার মুজিব মরে/হাজার সিরাজ মরে/বেঁচে থাকে চাটুকার/পা-চাটা কুকুর।’

এ-রাজনীতির খোলনলচে যারা বদলাতে চেয়েছিল- টিংকু ছিল তাদের পুরোভাগে। জাতির দুর্ভাগ্য যে, শেষপর্যন্ত সেই অপরাজনীতিরই জয় হয়েছে। আর তার বলি হতে হয়েছে টিংকুর মতো অমিত সম্ভাবনাময় অসংখ্য তরুণকে। অকালপ্রয়াত এ অনুজের উদ্দেশ্যে প্রতিবারই বলি, ‘টিংকু, যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।’ কিন্তু অন্তর্গত উপশমহীন এক দীর্ঘশ্বাসের তোড়ে আমি নিজেই তো ভেসে যাচ্ছি খড়কুটোর মতো।

minarmonsur@gmail.com




Leave a Reply