“হারিয়ে খুজি তোমায় অসীম শুন্যতায় বেঁচে আছ হাজারো ভক্তের অনির্বান চেতনায় ”

আজ সোমবার ৮ ফেব্রুয়ারী ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু এর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা টিংকু ভাইকে স্মরণ করে আমার কিছু স্মৃতি চারণ করলাম

সিটিজিবার্তা২৪.কম

আজ সোমবার ৮ ফেব্রুয়ারী ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু এর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।

ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু এর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।

ড. বিদ্যুত বড়ুয়া : ৯০ এর দশকে আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকে টিংকু ভাই-এর নাম জানি ও শুনি। আমাদের পরিবার রাজনীতি সচেতন বলে আমার বড় ভাই ও বাবার মুখে ও শুনতাম টিংকু ভাইয়ের নাম। একজন ভালো সংগঠক ও ভালো বক্তা ছিলেন। সবচেয়ে বড় ছিল অল্প সময়ে মানুষকে সম্মোহিত করার মত অসাধারণ গুন। একদিন শুনলাম আমাদের এলাকায় জাতীয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে টিংকু ভাই আসবেন। শুনে খুশি হলাম কেননা টিংকু ভাই এর বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য হবে। অসাধারণ বাচন ভঙ্গি, শব্দ চয়ন ও ইতিহাস সমৃদ্ধ বক্তব্য দিয়ে মানুষকে মোহিত করলেন। তিনি ছাত্র ছিলেন চট্টগ্রামের শ্রেষ্ট বিদ্যাপীঠ চটগ্রাম কলেজের ও তখনকার সরকারী ৮ টি মেডিকেল কলেজের শ্রেষ্ট মেডিকেল কলেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজের। তাই ভাবতাম মেধাবী, পড়ুয়া টিংকু ভাই যদি ছাত্র রাজনীতির শীর্ষ পদে আসীন হতে পারেন- তাহলে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতির করা যায়। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সমাজের অপরিসীম ভুমিকা সবাই অবগত। সেই আন্দোলনে প্রতিদিন খবরের কাগজগুলোতে দেখতাম টিংকু ভাইয়ের রাজপথের বিভিন্ন মোমেন্টাম এর ছবি ও খবর। ৯০ এর আন্দোলনে টিংকু ভাই সহ তৎকালীন ছাত্রনেতাদের জাতীয় বীর খ্যাতি দিয়েছিল। এর পরে দেখা ৯৩ এর টিংকু ভাই এর ৯ পুরানা পল্টন এর বাসায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করার পর আমার ভাই বিপ্লব বড়ুয়া (বর্তমানে ব্যরিস্টার ও সুপ্রিম কোর্ট এ আইনজীবী) সহ টিংকু ভাই-এর সাথে দেখা করতে যাই। অনেক উপদেশ দিয়েছিল ভালো করে লেখাপড়া করে পাশাপাশি রাজনীতি সচেতন হওয়ার জন্য।

আমরা যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের এর আস্ফালন এ আমরা সবসময় ঝামেলায় থাকতাম। কিন্তু তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি বশির আহমেদ বাদল, সাধারণ সম্পাদক মশিকুর রহমান বিটুসহ তুলিন, ফিরোজ, আতিক, ইমু, আনোয়ার, ত্রিদিব, সুমন, সাইদ, জাকারিয়া, সোহেল, রনি, দিপু, জিকু, শুভ্র, মিলন, সুমন, জুয়েল রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বাংলদেশ ছাত্রলীগ খুব শক্তিশালী ও সংগঠিত। প্রথম বর্ষে আমরা উচ্চাস নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন করি। সেই সংগঠনের অভিষেক অনুষ্ঠানে টিংকু ভাইকে অতিথি করে নিয়ে গিয়েছিলাম, সাথে ছিল ছড়াকার লুত্ফর রহমান রিটন, নাট্যকার ইমদাদুল হক। টিংকু ভাই এর জীর্ণ শীর্ণ লাল টয়োটা করোলা গাড়িতে নিজে ড্রাইভ করে গিয়েছিল অনুষ্ঠানে, সাথে আমিও ছিলাম, সেই স্মৃতিটা এখনো চোখে ভাসে। এরপরে ভুবন মোহন হাসি আর সম্মোহনী বক্তব্য দিয়ে সবাইকে বিমোহিত করেছিলেন। এরপরে বিভিন্ন সময়ে টিংকু ভাইয়ের কাছে যাওয়া হতো। আমাদের কলেজ এর পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে টিংকু ভাই অবশ্যই হাজির হত শত ব্যস্ততার মাঝে। কাকতালীয় ভাবে ছাত্র অবস্থায় টিংকু ভাই শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি হলের যে রুমে থাকত, আমি ও পরবর্তীকালে সেই রুমে ছিলাম। তাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে আসলে তিনি অবশ্যই সেই রুমে আসতেন এবং আড্ডা দিতেন কিছু সময়। এরপরে ঢাকা মেডিকেল ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ইমু ভাই (বর্তমানে নিউরলোজিস্ট ), বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সভাপতি জাকারিয়া ভাই (বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসক) সহ অনেকবার গিয়েছি টিংকু ভাই এর বাসায় । টিংকু ভাই এর সন্তান ধ্রুব ও শ্রেয়া দুইজনের জন্ম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিনি সব সময় গর্ব করতেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর দক্ষতা নিয়ে। তিনি সবসময় আস্থা রাখতেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর চিকিৎসকদের উপর। সময়ের সাথে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ এর সাহিত্য সম্পাদক, ছাত্র সংসদের সর্বোচ্চ পদ সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা মেডিকেল কলেজের আহবায়ক এর মত গর্ব করার পদ পদবি পেয়েছি। সবকিছুতে টিংকু ভাই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ পেয়েছি অকৃপণভাবে। টিংকু ভাই জানতেন কর্মীদের উদ্দীপ্ত করতে, সাহসী করতে এবং কর্মীদের দায়িত্ব নিতে। একজন নেতা তখনি হয় যখনি কর্মীদের স্নেহ, মমতা, ভালবাসা দিয়ে আগলে রাখবেন, শাসন করবেন এবং সবকিছুর পর কর্মীদের দায়িত্ব নিবেন। রাজনৈতিক জীবন নয় শুধু, ব্যক্তিগত জীবন এর সমসাময়িক অভিজ্ঞতার আলোকে ও পরামর্শ দিতেন। তিনি কর্মীদের শুধু রাজনীতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্দীপ্ত করতেন না, পাশাপাশি তাদের পরিবার পরিজন এর সুখ-দুখের, কর্মীদের অর্থনৈতিক অবস্থার খোঁজ নিতেন। কর্মিবান্ধব এমন নেতা আজ খুব কম আছেন। তিনি চট্টগ্রাম যখন আসতেন সদরঘাটের শেঠ বাড়ির বাসায় যেন মেলা বসত। সুজন ভাই, জামশেদ ভাই, মশিউর ভাই, জালাল ভাই, তারেক সোলায়মান ভাই সহ অনেকেই রাজনৈতিক আড্ডায় অংশ হতাম। হরেকরকমের মাছ-এর রান্না থাকত আড্ডার খাবার এর মেনু তে। আড্ডায় উঠে আসতো দেশের সামজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয় সমূহ। সেই আড্ডার স্মৃতি এখনো জ্বলন্ত। ২০০৬ বিএনপি-জামাতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সুষ্ট নির্বাচনের আন্দোলনের সময় টিংকু ভাইয়ের সাহসী দিক নির্দেশনা পেয়েছি খুব কাছ থেকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগের কর্মীদের যখন বিএনপি জামাতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও শিবির হলে থাকতে দিচ্ছে না সেইদিন তিনি কলেজের অধ্যক্ষকে ফোন করে বলেছিলেন – সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ও শেখ হাসিনার কর্মীদের জন্য তিনি যেকোন সময় সাহায্য ও সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসতেন। আমি উচ্চশিক্ষার্থে সুইডেনের ভিসা নেয়ার পর পর যখন আসতে চাইনি তখন তিনি বলেছিলেন, ক্যরিয়ার তৈরী কর তাহলে রাজনীতি ও রাজনীতিক দর্শনকে আরো বেশি ধারণ করতে পারবি।

টিংকু ভাই এর জন্মদিনে আমি ফোনে উইশ করতাম সবসময়। ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর এর জন্মদিনে বেশ কয়েকবার ফোন করে না পেয়ে উনার পিএস রাজু কে ফোন করে জানতে পারি- সকালে খুব মাথা ব্যাথা তাই ল্যাব এইডে ভর্তি করেছে। এর পরে সব কিছু কেমন জানি অন্ধকারের পথে হারিয়ে গেলে টিংকু ভাই। ব্রেন ক্যান্সার গ্রেড ৪ — যার পরিনিতি নির্মম মৃত্যু। শারীরিক টিংকু ভাই হারিয়ে যেতে পারে – কিন্তু আমাদের অন্তরের টিংকু ভাই কখনো হারাবে না- অসংখ্য তরুনের মনে যে রাজনীতির দীপ্ত শ্লোগান জাগিয়ে দিয়েছিল তা অক্ষয় হয়ে থাকবে। তুমি অমর হয়ে রইবে আমাদের অন্তরে আজীবন।

সবশেষে বলতে ইচ্ছে করে “হারিয়ে খুজি তোমায় অসীম শুন্যতায় বেঁচে আছ হাজারো ভক্তের অনির্বান চেতনায় ” ..

কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক

সিটিজিবার্তা২৪.কম/চট্টগ্রাম/এমকে




Leave a Reply