মেয়র হতে চান এমপি-মন্ত্রীর স্বজনরা, তৃণমূল আ. লীগে অসন্তোষ

মেয়র হতে চান এমপি-মন্ত্রীর স্বজনরা, তৃণমূল আ. লীগে অসন্তোষ

প্রকাশিত: রাত্রি ০২:১৫; বুধবার ; ২৫ নভেম্বর, ২০১৫ |

মেয়র হতে চান এমপি-মন্ত্রীর স্বজনরা, তৃণমূল আ. লীগে অসন্তোষ

পাভেল হায়দার চৌধুরী ||

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম ডেস্ক : পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হতে চান এমপি-মন্ত্রীর স্বজনরা। এতে তৃণমূল আওয়ামী লীগে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সারাদেশে এমপি-মন্ত্রীর ঘনিষ্টদের প্রার্থী হওয়ার যে হিড়িক পড়েছে, তাতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা মেয়র প্রার্থী হওয়ার সাহসই পাচ্ছেন না। ক্ষমতাসীন দলটির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ও তৃণমূলের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

সূত্র মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে, এমন সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক মহলে নানা মতবিরোধ থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা খুশিতে ছিলেন আটখানা। তবে, এবার এমপি-মন্ত্রীদের নিজস্ব লোকের দৌরাত্ম্যে সেই খুশি বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় হওয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন হতাশ হয়ে পড়ছেন।

সূত্র জানায়, ঈশ্বরদী পৌরসভায় ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের মেয়ের জামাই আবুল কালাম আজাদ মেয়র প্রার্থী হিসেবে এলাকায় কাজ শুরু করে দিয়েছেন। অবশ্য তিনি পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান ছিলেন। ভূমিমন্ত্রী জামাতা মেয়র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় তৃণমূলের অন্য নেতারা প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সাহস করতে পারছেন না বলে জানা গেছে।

নরসিংদী পৌরসভায় বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল গত নির্বাচনে তার ভাই লোকমান হোসেনের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। কিন্তু গত চার বছরের তার কর্মকাণ্ডে তেমন সন্তুষ্ট নয় পৌরবাসী। তারপরও আসন্ন নির্বাচেন দলীয় মনোনয়ন তার প্রায় নিশ্চিত। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম হিরু বলয়ের লোক তিনি। গত ৭ নভেম্বর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের স্মরণসভায় কামরুলকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী হিরু।

রাজশাহীর আড়ানী পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে অংশ নিতে মাঠে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত পরাজিত প্রার্থী বাবলু হোসেন, আড়ানি পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাহীদুজ্জামান সাহিদ, সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মতি, সাংগঠনিক সম্পাদক মুক্তার হোসেন, জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ পারভেজ কলিন্স, উপজেলা যুবলীগ সভাপতি কারুজ্জামান নিপ্পন, পৌর যুবলীগ সভাপতি কামরুল হাসান জুয়েল।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জানান, গত উপ-নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ শাহরিয়ার আলম আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামত পাশ কাটিয়ে তার নিকট আত্মীয় বিএনপি নেতা বাবলু হোসেনকে মনোনয়ন দেন। তাই তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থী- সমর্থকরা। এবারও প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বাবলু হোসেন নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। এখানে অন্য প্রার্থীরা চুপসে গেছেন বলে জানা গেছে।

মেহেরপুর পৌরসভা নির্বাচনে বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগে একদিকে রয়েছেন মেহেরপুর-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন দোদুল। অন্যদিকে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক জেলা সভাপতি জয়নাল আবেদীন। এই দুই বলয়ের রাজত্বে এখানে অন্য প্রার্থীরা দুর্বল হয়ে পড়েছেন।

এ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, মেহেরপুর পৌরসভার বর্তমান মেয়র মোতাছিম বিল্লাহ মতু (স্বতন্ত্র), সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী গোলাম রসুল, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাহফিজুর রহমান রিটন, যুবলীগের সাবেক সভাপতি সাজ্জাদুল আনাম, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষা-বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মান্নান, মেহেরপুর-১ আসনের সাবেক এমপি জয়নাল আবেদীনের শ্যালক ইসলাম আলী।

কুষ্টিয়া পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী হতে চান আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলমের চাচাত ভাই আতাউর রহমান আতা। তিনি শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। জানা গেছে, কুষ্টিয়া পৌরসভায় তিনি নির্বাচন করতে আগ্রহী। হানিফ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ায় তার ছোটভাই মেয়র প্রার্থী হবেন, এ ঘোষণায় জেলার অন্য কোনও নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস করছেন না। তবে কুষ্টিয়া পৌরসভার বর্তমান মেয়র আনোয়ার আলীও ক্ষমতাসীন দলের নেতা। গত ১৫ বছর ধরে শক্ত হাতে কুষ্টিয়া পৌরসভার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। এর আগেও তিনি একাধিক বার নির্বাচিত হন। শহরের উন্নয়নে তিনি প্রচুর কাজও করেছেন। সব শ্রেণির মানুষের মাঝে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ আনোয়ার আলীবিরোধী। যেহেতু কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা হানিফের ভাই মেয়র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, তাই অন্য প্রার্থীরা তেমন সুবিধা করতে পারবেন না মনে করে পিছিয়ে পড়তে পারেন।

স্থানীয় দলীয় নেতারা মনে করেন, পৌর নির্বাচনের হানিফের অনুগত নেতাকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।

মৌলভীবাজার অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিভক্ত আওয়ামী লীগের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মৌলভীবাজার পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে জনসংযোগ করছেন। একইসঙ্গে দলীয় মনোনয়ন পেতে তৃণমূল, জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে লবিং করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নেতৃত্বেও দ্বন্দ্বে বিভক্ত আওয়ামী লীগে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে মেয়র পথে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুর রহমান বাবুল, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী সদ্য প্রয়াত সৈয়দ মহসিন আলীর ছোটভাই জেলা যুবলীগ সহ-সভাপতি সৈয়দ সলমান আলী। সাইফুর রহমান বাবুল, সৈয়দ সলমান আলী সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী প্রয়াত সৈয়দ মহসিন আলী বলয়ের। জেলা যুবলীগ সভাপতি, ক্রীড়া সংগঠক ফজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক নাহিদ আহমদ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ ও সাধারণ সম্পাদক নেছার আহমদ বলয়ের বলে জানা গেছে।

কিশোরগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের নেতার ঘনিষ্ট আত্মীয় প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় তৃণমূলের অনেক দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা মেয়র প্রার্থী হওয়ার সাহসই দেখাচ্ছেন না। এ পৗরসভায় প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের চাচাত ভাই আশফাকুল ইসলাম টিটু। মেয়র প্রার্থী হিসেবে কাজও শুরু করেছেন টিটু। জানা গেছে, টিটু বর্তমানে দলীয় রাজনীতিতে তেমন সম্পৃক্ত নন। তবে, একসময় ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন তিনি। এ পৌরসভায় দায়িত্বশীল অনেক নেতা মেয়র প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাপোষণ করলেও প্রভাবশালী এ নেতার ভাইয় প্রার্থী হওয়ার ঘোষণায় পিছিয়ে গেছেন তারা।

ভোলায় পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে মাঠে নেমে গেছেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের ভাগ্নে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির। তিনি এই পৌরসভার বর্তমান মেয়রও। দলীয় ব্যানারে আগামী পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে ইতোমধ্যে প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছেন। মনির জেলা যুবলীগের আহ্বায়কও। এ পৗরসভায় একদিকে তিনি বর্তমান মেয়র অন্যদিকে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার ভাগ্নে। তাই এখানেও সাহস করে প্রার্থী হিসেবে থাকতে চান না কেউ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠান শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈযদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তারপর এগুলো ঠিক হয়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা যে কেউ পোষণ করতে পারেন। তবে, কাকে দেওয়া হবে, সেটা দল নির্ধারণ করবে।

জানতে চাইলে যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক বড় সংগঠন। এখানে অসংখ্য নেতাকর্মী রয়েছেন। প্রার্থী অনেকেই হতে চাইবেন। যেহেতু দলীয়ভাবে নির্বাচন হবে, দলই ঠিক করবে কাকে মনোনয়ন দেবে। বাংলা ট্রিবিউন

সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

জন মন্তব্যকারী




Leave a Reply

Inline