BREAKING NEWS
Search

ডা: জাকারিয়া চৌধুরী ছিলেন গতিময় জীবনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

সোমবার,৩১ অক্টোবর ২০১৬

img_7928চট্রগ্রাম : যুগে যুগে দেশের কান্তিকালে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডরক্ষা, মানব কল্যাণ, সমাজ গঠন, উন্নয়ন ও সম্প্রীতির বন্ধনকে অটুট রাখতে নিজের জীবন যৌবন পৌরত্বকে বির্সজন দিয়ে, শারীরিক, মানসিক আর্থিক, কর্ম মেধা, শ্রম সততা, ন্যায় ও ত্যাগের মাধ্যমে যে ক’জন মহান-মহিয়ষীরা অন্ধকার সমাজে আলোকবর্তিকা জালিয়েছেন তাদের মধ্যে ডা: এ.এম জাকারিয়া চৌধুরী অন্যতম।

ডা: জাকারিয়া চৌধুরী বৃটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ত্রিকাল রাজনীতি ও সামাজিক ইতিহাসের রাজসাক্ষী। তিনি পঞ্চাশের দশকের সোনালী সংগ্রাম মূখর সময়ের তরুণ রাজনীতিবিদ বিরল প্রতিনিধি,। রাউজান কৃতি সন্তানদের জনপদ, এই রাউজানকে যারা বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে পরিচিত ও আলোকিত করেছেন তারা হলেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক মাষ্টার দা সূর্যসেন, মরহুম আব্দুল আল হারুন, মরহুম অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, প্রয়াত সাধন কুমার ধর এবং ডা: এ.এম জাকারিয়া চৌধুরীর মতো কৃতিসন্তানরা।

এই প্রচার বিমুখ, নির্লোভ দেশপ্রেমিক, মহান ব্যক্তি আলহাজ্ব ডা: এ.এম জাকারিয়া চৌধুরীর জন্ম ১৯২৮ সালের ২৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলাধীন পশ্চিম ডাবুয়ার জমিদার বংশে। বাবা মরহুম গোলাম রহমান চৌধুরী ছিলেন ধনাঢ্য ব্যক্তি। দেশের প্রথম জরিপ বিজ্ঞান বই এর প্রনেতা। তিনি পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান ছিলেন। পিতার অঢেল সম্পদ তার অন্তরে বিন্দু মাত্রও কুটারাঘাত করতে পারে নি। পারেনি শিক্ষা, মানবতা নীতি, আদর্শ থেকে এক চুল নড়াতে।

মুসলিম হাই স্কুলে পড়ালেখাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু রাজনীতির প্রতি অনুরক্ত হন। পঞ্চাশের দশকে রাউজান থানা মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে সক্রিয় কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সংস্পর্শে আসেন এবং দলের ত্যাগী ও কর্মঠ নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন ও ঘনিষ্ঠতা লাভ করেন। এর পর ১৯৪৯ সালে রাউজান থানা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাকালে ডা: জাকারিয়া চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৫২ সালে দেশ জুড়ে ভাষা আন্দোলন এর শুরুতেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এর রাউজান উপজেলার সভাপতি দায়িত্ব নিয়ে ভাষা আন্দোলনের সফল নেতৃত্ব দেন।

উল্লেখ্য ১৯৭০ এর নির্বাচনে রাউজানের ফটিকছড়ি আসনের তৎকালীন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা পাকিস্তানের স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন, আজাদী পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সাহেব। তিনি ছিলেন ডা: জাকারিয়া চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধু। ডা: জাকারিয়া চৌধুরী সে নির্বাচন পরিচালনার প্রধান সমন্বয়কারী ও নির্বাচনী প্রচারণা এক হাজার সাইকেল কর্মী বাহিনীর প্রধান। সে নির্বাচনে অধ্যাপক খালেদ ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ১২০৮৬ ভোটে পরাজিত করে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবময় ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ। সে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরী, এম.এ.আজিজ, এম.এ.হান্নান, এম আর ছিদ্দিকী, এম.এ মান্নান ও অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সহ ডা: জাকারিয়া চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখের সারিতে থেকে নেতৃত্ব নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনে বঙ্গবন্ধুর ২৫ মার্চ রাতের স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে তৎকালীন ই.পি.আর মেজর (অব:) রফিকুল ইসলাম ও ওয়ারলেস বার্তা লিখে জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে পাঠালে সে বার্তা নিয়ে আখতারুজ্জামান চৌধুরীর বড় ভাই বশিরুজ্জামানের বান্ডেল রোডের বাসভবনে শীর্ষ নেতাদের গোপন বৈঠকে পৌছান ডা: জাকারিয়া চৌধুরী। সে স্বাধীনতার বার্তাটি পর দিন এম.এ.হান্নান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষাণা করেন। রাউজান ছিল মুসলিমলীগের ঘাটি। তিনি ও অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ রাউজানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনীতির সম্প্রীতি জাগরণ ঘটিয়ে নেতৃত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন যা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ডা: জাকারিয়া ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত অংশীদার ও যুদ্ধজয়ী বীর। তিনি শুধু যুদ্ধই করেন নি, বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধ বিধ্বস্ত এই দেশকে পূর্নগঠনের কাজে নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে নিয়োজিত করেছেন। ডা: জাকারিয়া বঙ্গবন্ধুকে পাগলের মতো ভালবাসতেন। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্ধুদ্ধ করে উৎসাহ প্রেরণা জুগিয়ে তার সন্তানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব সম্পন্ন মেধা ও যোগ্য করেছেন বলেই তার সুযোগ্য সন্তান বখতিয়ার চৌধুরী আরব-আমিরাত বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও প্রবাসী সংগঠন বাংলাদেশ সমিতির দীর্ঘ দিন নেতৃত্বে ছিলেন। সাংবাদিক শাহীনুল ইসলাম জয়বাংলা সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাবেক আহবায়ক ও ঢাকাস্থ সাংবাদিকদের সংগঠন সি.জে এফ.ডির প্রতিষ্ঠাতা। গোল টেবিল বৈঠকের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান নিয়ে উন্নয়নের ভূমিকা রেখে চলেছেন। অপর সন্তান আশেক রসুল চৌধুরী টিপু, সাবেক ছাত্রলীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য আবু ফরহাদ সাহাবু রাউজান উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতির নেতৃত্বকালে স্বাধীনতা বিরোধী সন্ত্রাসীদের হাতে মারাত্মক আহত হন। রিফাত পাশা জঙ্গী এম.ই.এস কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সংগঠিত সম্পাদক এবং আসহাব রসুল চৌধুরী জাহেদ চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সাবেক ও বর্তমান কমিটি সদস্যের দায়িত্বে থেকে জামালখান ওয়ার্ড যুবলীগের সফল নেতৃত্ব দিয়ে বাবার আদর্শ, ত্যাগ, ন্যায় ও সততাকে লালন-পালন করে চলেছেন।

ডা: জাকারিয়া চৌধুরীর দু:খী মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তার জীবনের অন্যতম ব্রত। তাই তিনি ৬০ দশকের শুরতেই হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে রাউজানে সমগ্র এলাকায় ঘোড়ায় চড়ে বাড়ী গিয়ে রোগী দেখে বিনামূল্যে ঔষধ, চিকিৎসা সেবা প্রদান করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। ফলে তিনি সাধারণ মানুষের নি:স্বার্থ ভালবাসা লাভ করেছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম জজ কোর্টের জুরার ও এ্যাসেসর হিসেবে সততা ও সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করেছিলেন; যা প্রশংসনীয়।

নির্লোভ, নিরহংকারী এই মানুষটি কখনও বৈষয়িক প্রাপ্তিকে বড় করে দেখেননি প্রতিটি মানব, ও সমাজ এবং শিক্ষার কল্যাণে তিনি নি:স্বার্থভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, রাউজানে অসংখ্য রাস্তাঘাট,বাঁধনির্মাণসহ স্কুল, মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বেও ভূমি প্রদান করে রাউজানে প্রায় ১ কানি (১৮ গন্ডা) জায়গার উপরে মসজিদ নির্মাণ করেছেন। চট্টগ্রাম শহরের জামালখান দোস্থ কলোনী সংলগ্ন বিশাল মসজিদ ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মৃত্যু অবধি তিনি এই মসজিদের মতোয়াল্লির দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন।

সাহিত্যে ও সাংস্কৃতিক জগতের গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করেছিলেন ডা: জাকারিয়া চৌধুরী। তিনি যুগ থেকে যুগান্তরে রাজনীতি, সামাজিক, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখা বিভিন্ন স্বনামধন্য লেখকের গ্রন্থ সংগ্রহ করতেন। তার নিজস্ব সোফান নামের ব্যক্তিগত লাইব্রেরী ছিল, যার মাধ্যমে তিনি তা পড়া এবং লেখালিখি করতেন যা কিনা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রামে সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীও সংগঠকরা তাঁর কাছ থেকে ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য ও বই সংগ্রহ করতেন। তিনি মৃত্যু অবধি টিভি দেখতেন, গান শুনতেন। তিনি মনেপ্রাণে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ও বাবু সাধন কুমার ধর ছিলেন তাঁর বাল্যকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আজাদী পত্রিকা ভবনে তাঁদের দীর্ঘদিনের আ্ড্ডা ছিল। সেখানে বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সমাজের জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের মিলনস্থল ছিল, যারা অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে অনেকে জীবিত আছেন।

ডা: জাকারিয়া চৌধুরী একজন সফল পিতা ও অভিভাবক। দুই কন্যা, দশ পুত্র ও পুত্রবধু, নাতি-নাতনী নিয়ে যৌথ সংসার। তার ন্যায়নীতি, ত্যাগ ও মমতাময়ী হৃদয়ের বিশালতায় সংসারে আদর, সোহাগ ও শাসনের মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের লালন পালন করেছেন বলেই আজ ছেলেরা স্ব স্ব অবস্থানে সফল হয়েছেন। আজকে এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে তা খুবই দূর্লভ ও বিরল। ডা: জাকারিয়া চৌধুরীর বাসভবনের ড্রইয়িং রুমে দেখেছি আয়না ফ্রেমে সাজানো একটি লিখা “ভাষা ও ব্যবহারে বংশের পরিচয়”।

ডা: জাকারিয়া চৌধুরী ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত, তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি অতি সহজেই মানুষের সাথে মিশে যেতে পারতেন। তিনি উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন।

তিনি মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে সমাজ উন্নয়ন ও মানবতার জন্য কাজ করে গেছেন। ক্ষমতা, অর্থ, বিত্ত, লোভ-লালসা তার জীবনকে স্পর্শ করতে পারেননি। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন নি। তিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি, তিনি আজীবন মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন। তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিরহংকারী, উদার, সৎ, ন্যায় ও আদর্শবান প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক, ধার্মিকতা সকল ক্ষেত্রে সফলতার সহিত বিচরণ করেছেন। চট্টগ্রামের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে যারা লালন পালন করেছেন তার মধ্যে ডা: জাকারিয়া চৌধুরী অন্যতম। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে রাজনৈতিক, সামাজিক উন্নয়নে যে ত্যাগ, ন্যায়, সততা, মানবিক বর্তমান সমাজে খুবই বিরল। তাঁর শুন্যস্থান পুরণ হবার নয়। তার কর্ম ও আদর্শ এই সমাজে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আলোর দীপ শিখার মতো দেদীপ্যমান ও চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে।

ডা: জাকারিয়া চৌধুরী ছিলেন গতিময় জীবনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যার মধ্যে জীবনের তারুণ্য ও ব্যক্তিত্ব ছিল প্রাণময়। চট্টগ্রামের কৃতি এই মহান পুরুষের বর্ণাঢ্য জীবন আদর্শকে নতুন প্রজন্ম অনুসরণ করলেই এই অন্ধকারচ্ছন্ন সমাজকে আলোকিত করতে উৎসাহ প্রেরণা যোগাবে।

এই মহান মহিয়সী ডা: জাকারিয়া চৌধুরী ২০১৩ সালে ২১ অক্টোবর বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করে চির বিদায় নিয়েছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামী’ন উনার বেহেস্থ নসীব দান করুন।

অধ্যাপক মাসুম চৌধুরী




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *