এবার টার্গেট পাল্টাচ্ছে জঙ্গিরা


11
11
11
11
11
ctgbarta24.com
Share

কারাগারে পরিকল্পনা : বাবুল আক্তাররসহ চারজনকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল , দেড় বছরে ৪৫ হামলায় ৪৭ নিহত, জড়িতদের অধিকাংশ অধরা , ‘এই রক্তের মূল্য তোদের দিতেই হবে, তোরা যেই হ’

এবার টার্গেট পাল্টাচ্ছে জঙ্গিরা

শাহাদাত হোসেন পরশ/ আহমদুল হাসান আসিক

‘এই রক্তের মূল্য তোদের দিতেই হবে। তোরা যেই হ। বাবুল আক্তার স্যার বাংলাদেশের পুলিশের এক অন্যতম সাহসী, মেধাবী ও ত্যাগী অফিসার। আমি সবসময় তাকে স্যালুট জানাই। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নিরসনে এককভাবে তার অবদান অসীম। লক্ষ লক্ষ পুলিশ অফিসারের মাঝে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। গতকাল রবিবার জিইসির মোড় ওয়েল ফুডের সামনে সকাল ৭টার দিকে তার স্ত্রীকে তিন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে মেরেছে। এ সময় তিনি তার ছোট্ট বাচ্চাকে স্কুলবাসে তুলে দিতে বাসার বাইরে এসেছিলেন। ধারণা করছি, ভাবির এই মৃত্যুর কারণ তার স্বামীর পেশা। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্ত্রী-পরিবার হারানো কোনো পেশাতে কাম্য হতে পারে না।’ কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছানোয়ার হোসেন গতকাল ফেসবুক পেজে হ্যাশট্যাগ দিয়ে এভাবেই পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানান। শুধু ছানোয়ার নন, আরও পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হৃদয়স্পর্শী পোস্ট দেন। যাতে উঠে এসেছে উগ্রপন্থিদের প্রতি ধিক্কার ও স্ত্রীহারা এক শোকাতুর পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি সমবেদনা।

জঙ্গিবিরোধী, অস্ত্র ও স্বর্ণ চোরাচালানের বিরুদ্ধে একের এক এক সাহসী সব অভিযান চালিয়ে অনেক সুনাম অর্জন করেন চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি বাবুল আক্তার। ধারণা করা হচ্ছে, তার স্ত্রীর হত্যার সঙ্গে উগ্রপন্থিরা সম্পৃক্ত থাকতে পারে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) ও জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) কাপুরুষোচিত এই হত্যায় জড়িত। এরই মধ্যে বাবুলসহ চারজনকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দেয় জঙ্গিরা। বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক করে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়। দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এ তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জঙ্গিরা তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করছে। এই প্রথম কোনো নারীকে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি পুলিশের কোনো কর্মকর্তার স্ত্রীর ওপর হামলা চালিয়ে হত্যার ঘটনাও এই প্রথম। গত দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় উগ্রপন্থিদের ৪৫ হামলায় ৪৭ জন নিহত হন। এসব ঘটনায় জড়িতদের অধিকাংশই অধরা। একসময় উগ্রপন্থিরা ব্লগারকে টার্গেট করে। এর পর লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক, বিদেশি নাগরিক, পীর, ইউএসএইড কর্মকর্তা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়।

এবার টার্গেট পাল্টাচ্ছে জঙ্গিরা

ছবি: সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান (প্রশাসন) বলেন, এই হামলা জিঘাংসামূলক। এটা মানবতার বিরুদ্ধে কাপুরুষোচিত হামলা। এর পেছনে জঙ্গি তৎপরতা দায়ী হতে পারে। সব কারণ মাথায় নিয়ে তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে। তার মতে, এই হামলায় পুলিশের মনোবলে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

পুলিশের এআইজি (গোয়েন্দা) মনিরুজ্জামান বলেন, ‘জঙ্গি দমনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুলিশের যেসব সদস্য নিয়োজিত সবসময় তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়। কাজ করলে যে কোনো সময় ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে, এটা সব পুলিশ সদস্যের জানা। তবে কোনো কর্মকর্তার স্ত্রীর ওপর এ ধরনের হামলা এটাই প্রথম। তাই আমরা এখন এ ব্যাপারেও সতর্ক থাকব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘যে কোনো হুমকির ব্যাপারে পুলিশ আগাম তেমন কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। ঘটনা ঘটনার পর দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। উগ্রপন্থিদের ব্যাপারে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার এখনই সময়। আর একটুও দেরি করা যাবে না।’

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বুলবুল নামে জেএমবির এক সদস্য মাস দেড়েক আগে চার পুলিশ সদস্যকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দেয়। যাদের হুমকি দেওয়া হয় তারা হলেন- এসপি বাবুল আক্তার, এসআই সন্তোষ চাকমা, রাজেশ চাকমা ও আকতার হোসেন। হুমকি পাওয়া চারজনই চট্টগ্রামে জঙ্গিদের গ্রেফতারে একটি অভিযানে অংশ নেন। ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সদরঘাটে একে-২২ রাইফেলের গুলিতে ছদ্মবেশী দুই ছিনতাইকারী ও এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ তিনজন নিহত হন। পরে জানা যায়, তারা জেএমবির সদস্য। এরপর ৬ অক্টোবর নগরীর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে জেএমবি চট্টগ্রামের সামরিক কমান্ডার জাবেদসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয় বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে। পরদিন গ্রেফতার জাবেদকে নিয়ে অক্সিজেন কুয়াইশ সড়কে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গেলে গ্রেনেড বিস্ফোরণে জাবেদ মারা যায়। গ্রেফতার অন্য চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমানবাজার এলাকায় জেএমবির চট্টগ্রামের অন্যতম কমান্ডার রাইসুল ইসলাম ওরফে ফারদিনের ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, গুলি ও সেনাবাহিনীর পোশাক উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানে ফারদিনের তিন সহযোগী গ্রেফতার হয়। ফারদিন আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে বগুড়ায় জঙ্গি আস্তানায় বিস্ফোরণে ফারদিনসহ দু’জন নিহত হয়। মাস দেড়েক আগে আদালতে ফারদিন ও জাবেদের সহযোগী বুলবুল নামে এক জঙ্গির কাছ থেকে একটি চিঠি উদ্ধার করা হয়। আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় বুলবুলের কাছ থেকে চিঠিটি পাওয়া যায়। যাতে বাবুলসহ চারজনকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, জঙ্গিবিরোধী অভিযানে সাহসী ভূমিকা রাখায় কারাগারে বসেই জঙ্গিরা বাবুলসহ কয়েকজনের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। বাবুল বিভিন্ন সময় তার পরিবার-পরিজন নিয়ে তার শঙ্কার কথা ঘনিষ্ঠদের বলতেন।

পুলিশের ওপর হামলা করতে না পেরে হয়তো তারা পরিবারের সদস্যের ওপর হামলা চালায়। এর আগেও দুই পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে জঙ্গিরা। রাজধানীর গাবতলীতে পুলিশ চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে এএসআই ইব্রাহীম মণ্ডল ও সাভারের আশুলিয়ায় কনস্টেবল মুকুলকে হত্যা করা হয়। জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে পুলিশ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মনোবল ভেঙে দিতে জঙ্গিরা হামলার নতুন নতুন টার্গেট করছে। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতার কারণে উগ্রপন্থিদের ব্যাপারে আগাম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। গত দেড় বছরে জঙ্গিদের ৪৫ হামলায় ৪৭ জন মারা গেছেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার হামলায় মারা গেছেন ১১ জন। ওই বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৫ হামলায় নিহত হন ১৯ জন। চলতি বছরে ১৩ হামলায় ১৬ জন মারা গেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২৩টি হামলায় জেএমবি জড়িত। একের পর এক জঙ্গিদের এসব হামলার ঘটনায় দায়ের করা ২৪টি মামলারই পুরোপুরি রহস্যভেদ করতে পারেনি পুলিশ। মাসের পর মাস ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট এসব মামলা তদন্ত করছে। মাত্র চারটি ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। সম্প্রতি ডিএমপির পক্ষ থেকে ছয় জঙ্গির ছবি প্রকাশ করে পুরস্কার ঘোষণা করে তথ্য চাওয়া হয়। দুই সপ্তাহ পার হলেও তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে বাবুল আক্তারের স্ত্রী খুন হওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সারাদেশের ওসি থেকে শুরু করে পুলিশ সুপারদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। ওই বার্তায় চট্টগ্রামের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সবাইকে আরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আশপাশের সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। নজরদারি বাড়াতেও বলা হয়েছে।

চট্টগ্রামের ঘটনার পর গতকাল একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক। ভয়কে উপেক্ষা করে যে কোনো ধরনের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তারা লড়তে প্রস্তুত। শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে এই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তারা।

এদিকে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার সভাপতিত্বে গতকাল রাতে ডিএমপি সদর দপ্তরে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বলা হয়, যে কোনো মূল্যে বাবুল আক্তারের স্ত্রীর খুনিদের শনাক্ত করা হবে।

তথ্যসূত্র – সমকাল

সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ

সারাদেশে একই পদ্ধতিতে খতম তারবি পড়ার আহবান... সোমবার, ৬ জুন ২০১৬ পবিত্র মাহে রমজানে খতম তারাবিহ পড়ার সময় সারাদেশে সব মসজিদে একই পদ্ধতি অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। গতকা...
আজ চাঁদ দেখা গেলে মঙ্গলবার রমজান সিটিজিবার্তা২৪ডটকম সোমবার, ৬ জুন ২০১৬ আজ সোমবার আকাশে চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হবে সিয়াম সাধনার পবিত্র রমজান মাস। সে অনুযা...
বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যায় মামলা... সিটিজিবার্তা২৪ডটকম সোমবার, ৬ জুন ২০১৬ নিহত বাবুল আক্তারে সহধর্মীনি মিতুর লাশ মর্গে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে। চট্টগ্রাম : পুলিশের এসপি বাবুল আক্ত...
সারাদেশে পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা... বাংলাদেশ পুলিশ সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, নিউজ ডেস্ক : পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী খুন হওয়ার পরপরই সদর দপ্তর থেকে সারাদেশের পুলিশ সুপার থেকে...
বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতুর মৃত্যুতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর শোক... রবিবার, ৫ জুন, ২০১৬ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি পুলিশ হেডকোয়ার্টা...



Leave a Reply