১৬ ডিসেম্বর, বুধবার, ২০১৫
মুহাম্মদ জাফর ইকবাল
দেখতে দেখতে ৪৪ বছর পার হয়ে গেছে। অথচ এখনও মনে হয়, আমাদের বিজয়ের দিনটি বুঝি ছিল মাত্র সেদিন। আমাদের এই বিজয় দিবসটি এমনি এমনি আসেনি। তার জন্য এ দেশের মানুষকে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এই বিজয় দিবসের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে আমাদের প্রজন্ম নিজের চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংস একটি জাতির নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডটি দেখেছি। বাংলাদেশের জন্মলগ্নের অমানুষিক গর্ভযন্ত্রণার কাতর ধ্বনি শুনেছি, মানবতার সবচেয়ে বড় অবমাননাটি চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি এবং স্বজন হারানোর বুকফাটা হাহাকার শুনে নিথর হয়ে থেকেছি।
তারপরও মনে হয়, আমাদের প্রজন্মের মতো সৌভাগ্যবান প্রজন্ম আর কেউ নয়। কারণ আমরা নিজের চোখে বিজয়ের দিনটি দেখেছি। আনন্দ যে কত তীব্র হতে পারে, সেটি বুঝি আমাদের প্রজন্ম থেকে গভীরভাবে পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষ কখনও অনুভব করতে পারবে না। আমি সেই দিনটির কথা, সেই মুহূর্তগুলোর কথা কোনোদিন ভুলতে পারব না।
একাত্তরের বিজয় দিবসের পর একটি একটি করে ৪৪ বছর পার হয়ে গেছে। একটি মানুষের জীবনের জন্য সেটি দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ সময়ে অতীতের সব দুঃখ-কষ্ট এবং যন্ত্রণার তীব্রতা কমে আসার কথা। এই দিনটিতে আমাদের হারিয়ে যাওয়া আপনজনের কথা স্মরণ করে স্নেহ-মায়া ও ভালোবাসার স্মৃতিতে সিক্ত হওয়ার কথা। ত্যাগ, বীরত্ব আর অর্জনের ইতিহাসটুকু স্মরণ করার কথা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা। অথচ আমি এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করেছি, পাকিস্তান নামক বর্বর রাষ্ট্রটি ৪৪ বছর পরও আমাদের বিজয় দিবসের আনন্দের মাঝে জ্বালা-যন্ত্রণা-ক্ষোভ এবং ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, গত ৪৪ বছরেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির মানসিকতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। পৃথিবীর নৃশংসতম গণহত্যা করে তাদের ভেতর এতদিন পরও কোনো অপরাধবোধ বা অনুতাপ নেই। তারা এখনও সেই গণহত্যাকে সদম্ভে অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখায়।
ঘটনাটি শুরু হয়েছে এ দেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দু’জন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর। নিজের দেশের মানুষকে যখন অন্য দেশে মৃত্যুদণ্ড পেতে হয়, পাকিস্তান কখনও তার প্রতিবাদ করে না; কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের যখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, পাকিস্তান তার তীব্র প্রতিবাদ করে। বিষয়টি অবিশ্বাস্য; কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষে সবই সম্ভব। বাংলাদেশ যখন এ দেশের একেবারেই নিজস্ব ব্যাপারে তাদের নাক গলানোর প্রতিবাদ করেছে, তখন পাকিস্তান হঠাৎ ঘোষণা দিয়েছে ১৯৭১ সালে তারা গণহত্যা করেনি। ধোয়া তুলসী পাতা থেকেও তারা বেশি পূত এবং পবিত্র! এটি চেঙ্গিস খানের আমল নয়। নতুন পৃথিবীর ইতিহাস থেকে কেউ পালিয়ে যেতে পারবে না। গোয়েব্ল্সের মতো এক কথা বারবার উচ্চারণ করে একটি মিথ্যাকে এখন সত্যি বানানো যায় না। একাত্তরে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তার মিলিটারি বাহিনী দিয়ে কী করেছে, ইতিহাসের কালো পাথরে সেটা খোদাই করে লেখা আছে। সেই অপরাধের কথা স্বীকার করে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়ে পৃথিবীতে সভ্য জাতি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার একটা সুযোগ ছিল পাকিস্তানের। ভয়ঙ্কর একটি গণহত্যার কথা অস্বীকার করে পাকিস্তান সেই সুযোগটি হারিয়েছে। এখন এটি শুধু নৃশংস হত্যাকারী জাতিই নয়; এটি এখন নির্বোধ মিথ্যাবাদী একটি জাতি।
পাকিস্তান নামক এই রাষ্ট্রটির মানসিকতা বুঝতে হলে শুধু তার ইতিহাসের দিকে একবার চোখ বুলাতে হয়। ‘৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু বিপুল ভোটে জয়লাভ করে যখন পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন লারকানায় পাখি শিকার করার ভান করে ইয়াহিয়া খান অন্যান্য জেনারেল আর জুলফিকার আলী ভুট্টোকে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাংলাদেশের গণহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।
‘৭১ সালের ১ মার্চ যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো, তখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা বাংলাদেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার ভান করে ইয়াহিয়া খান ঢাকা হাজির হয়ে গোপনে পাকিস্তানি মিলিটারি আনতে থাকেন।
২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারি আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা শুরু করে। সেই নৃশংস গণহত্যার কথা যেন পৃথিবীর কেউ জানতে না পারে সে জন্য সব বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল! তারপরও এই গণহত্যার খবর গোপন থাকেনি_ পৃথিবীর মানুষের বিবেককে সেটি ভয়ানকভাবে স্পর্শ করেছিল। গণহত্যার সঙ্গে ছিল নারী ধর্ষণ। অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে এক কোটি শরণার্থী ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এই কালিমাময়, গ্গ্নানির ইতিহাস পাথরে খোদাই করে লেখা থাকার পরও পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কোন মুখে এটি অস্বীকার করে?
মাত্র ৯ মাসের ভেতর মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণে জনবিচ্ছিন্ন পাকিস্তানি মিলিটারির পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। তাই যখন মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী মিলে পাকিস্তানের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হেনেছিল, তখন মাত্র ১৩ দিনের যুদ্ধ শেষে কাপুরুষের মতো তারা আত্মসমর্পণ করেছিল। সেই থেকে চূড়ান্ত বিজয়ের পর আত্মসমর্পণের দিনটি আমাদের বিজয় দিবস।
পরাজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রায় ৯০ হাজার সদস্যকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারতে নিয়ে যাওয়া হলো। তার ভেতর ১৯৫ জন হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের মতো আমিও সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। তার কারণ, তাদের একজন ছিল আমার বাবার হত্যাকারী। সেই সময়ে যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অফিসারের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে মামলা করার সুযোগ ছিল খুব কম। তারপরও আমার বাবার হত্যাকাণ্ডের মামলাটি ছিল অল্প কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ মামলার একটি।
তখন পাকিস্তান সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়াটা থামানোর জন্য তার মজ্জাগত ষড়যন্ত্র শুরু করে দিল। বাংলাদেশের প্রায় চার লাখ বাঙালি তখন পাকিস্তানে ছিল। পাকিস্তান তাদের জিম্মি হিসেবে ধরে রাখল। শুধু তাই নয়, তাদের ভেতর থেকে ২০৩ জনকে আলাদাভাবে বিচার করার হুমকিও দিতে শুরু করল। এটুকুতেই শেষ নয়; পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য ব্যবহার করতে শুরু করল। সবচেয়ে বিপজ্জনক ঘটনাটি ঘটাল চীনকে দিয়ে। বাংলাদেশ যখনই জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার চেষ্টা করেছে, তখনই চীন পাকিস্তানের পক্ষে তাতে ভেটো দিয়েছে। সত্তর দশকের নির্বান্ধব বাংলাদেশ এই সময়কার নিজের পায়ে দাঁড়ানো বাংলাদেশ নয়। তাই তখন বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করার দায়িত্ব পাকিস্তানের হাতে দিয়ে সেখানে আটকে থাকা চার লাখ বাঙালিকে দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনতে শুরু করল।
এই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর অপরাধের সুদীর্ঘ তালিকা পাকিস্তানের নিজের হাতেই ছিল। তাদের জেনারেলদের লেখা বইয়ে তার বর্ণনা আছে। সে দেশের বিচারপতি হামুদুর রহমানের রিপোর্টেও সেটা খুবই স্পষ্টভাবে লেখা আছে। তারপরও পাকিস্তান তার ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার কখনও করেনি। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির চরিত্রের সঙ্গে এটি এতটুকু বেমানান নয়।
আমি এবং আমার ভাইবোনেরা আমার বাবার হত্যাকাণ্ডের বিচার কখনও পাইনি এবং সে জন্য আমরা কখনও পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে ক্ষমা করিনি; কখনও ক্ষমা করবও না ।
‘৭৪ সালে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তানে আটকে পড়া চার লাখ বাঙালির সঙ্গে বিনিময় করা হয়েছিল। এই বিনিময়টি ছিল বাংলাদেশের মানুষের এক ধরনের মহানুভবতা। পাকিস্তান এই মহানুভবতাটি অনুভব করতে পারেনি; তাদের সেই ক্ষমতা নেই। তাই ৪৪ বছর পরও তারা বলে_ ১৯৭১-এ তারা এ দেশে গণহত্যা করেনি। পুরো ব্যাপারটি কি এখন নতুন করে ভেবে দেখার সময় হয়নি?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক আদালতে এখনও সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা সম্ভব। তা-ই যদি সত্যি হয়, তাহলে কেন আমরা সেই প্রক্রিয়াটি শুরু করি না! বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে আমরা নিজের দেশকে গ্গ্নানিমুক্ত করতে শুরু করেছি। ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে আমরা কেন এই পৃথিবীটাকেও আরও একটু গ্গ্নানিমুক্ত করার চেষ্টা করি না?
২.
বিজয় দিবসের কথা লিখতে গিয়ে ঘুরে-ফিরে শুধু পাকিস্তান নামক অশুচি একটা দেশের অশুভ কাজকর্মের কথা বলছি বলে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। ৪৪ বছর আগে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করার পর এখনও তারা আমাদের মানসিকভাবে যন্ত্রণা দেবে সেটা আমরা কখনও মেনে নেব না। উন্মত্ত পাকিস্তান যে কথা বলে বলুক, আমরা আমাদের স্বপ্ন দেখে যাব। আমাদের প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশটিকে স্বাধীন করে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছে। দেশটি ভুল পথে আনাগোনা করে শেষ পর্যন্ত ঠিক পথে উঠে এসেছে। আমাদের দেশের নতুন প্রজন্ম আর কখনও এই দেশটিকে পথ হারাতে দেবে না আমি সেই বিষয়ে নিশ্চিত। এই নতুন প্রজন্মকে নিয়ে আমি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে চাই। আমাদের কাছ থেকে আর কেউ আমাদের স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারবে না।
কত কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়। আমি শিক্ষক, তাই লেখাপড়া নিয়ে স্বপ্নটি সবার আগে চলে আসে। এ দেশের স্কুল-কলেজে তিন কোটি ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে। তাদের মাঝে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের প্রায় সমান; অনেক জায়গায় মেয়েরাই বেশি। এই ছেলেমেয়েরা যে আমাদের কত বড় শক্তি, সেটি কি কেউ ভেবে দেখেছেন? আমরা যদি শুধু তাদেরকে ভালো করে লেখাপড়া করাই, তাহলেই এ দেশটি একটি অমিত শক্তির দেশ হয়ে যাবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
লেখাপড়ার পাশাপাশি তাদের বুকেও স্বপ্নের বীজ বপন করে দিতে হবে। সেই স্বপ্নের বীজ দেখতে দেখতে মহীরুহ হয়ে যাবে। আমরা যেটা করতে চেয়েও করতে পারিনি, এ দেশের নতুন প্রজন্ম নিশ্চয়ই সেটি করতে পারবে। নিশ্চয় তারা এ দেশটিকে একটা অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে। নিশ্চয় তারা বুকের ভেতর এ দেশের জন্য একটা গভীর ভালোবাসা নিয়ে বড় হবে।
বিজয় দিবসটি আমাদের স্বপ্ন দেখার দিবস। আমাদের সেই স্বপ্ন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তার কারণ, সেই স্বপ্ন পূরণ করে যারা নিজের রক্ত দিয়ে এ দেশ আমাদের উপহার দিয়েছে, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে।










