চট্টগ্রামে হোটেল-রেস্তোঁরা-বেকারি-মিস্টির দোকানে
শুক্রবার, ৪ মার্চ, ২০১৬
নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

চট্টগ্রামের সুনামধন্য বেশ কিছু রেস্টুরেন্টে এভাবে ময়লাযুক্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবারের উপকরণগুলো পরিষ্কার করা হয়
চট্টগ্রাম : নগরীর হোটেল, রেস্তোঁরা এবং বেকারিতে ব্যবহার করা হচ্ছে পোড়া পামওয়েল। খাবারের উপকরণ ফেলে রাখা হচ্ছে হোটেলের রান্নাঘরের নোংরা মেঝেতে। বেকারির খাবারে মেশানো হচ্ছে পচা ডিম, নষ্ট বা নিম্নমানের ডালডা, কাপড়ের রং। চট্টগ্রাম নগরের খাবারের হোটেল, রেস্তোরাঁ আর বেকারিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে নগরের ৫৩টি হোটেল-রেস্তোরাঁ আর বেকারিতে অভিযান চালানো হয়। সব কটি দোকানে কোনো নানা অনিয়ম পাওয়া যায়। জরিমানা গুনতে হয় দোকানগুলোকে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ভোক্তা হিসেবে আমরা খুবই আতঙ্কিত। হোটেল-রেস্তোরাঁ বা বেকারি থেকে আমরা কী কিনে খাচ্ছি? এগুলোকে ‘স্লো পয়জন’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত ঘন ঘন এবং ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালানো।’
নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য উৎপাদনের দায়ে গত বছরের ১ ডিসেম্বর চান্দগাঁওয়ের আল হাসান বেকারিকে ২০ হাজার টাকা, সুগন্ধা বেকারিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজিয়া শিরিন। এই দুটি বেকারিকে একই অপরাধে গত ৮ ফেব্রুয়ারি মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘সাড়ে চার বছরে চালানো আমাদের ৯০ শতাংশের বেশি অভিযানে খাবারের দোকান ও কারখানায় অনিয়ম পেয়েছি। বারবার অভিযান চালানোর পরও বেশির ভাগেরই টনক নড়ছে না।’

নগরীর জামালখানে দাওয়াত রেস্টুরেন্টে খাবারের উপকরণ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ধোওয়া-পালা করারত অবস্থায় জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত
অভিযানে প্রায় প্রত্যেক হোটেল-কারখানাতেই পোড়া ও নিম্নমানের তেল ব্যবহারের চিত্র পাওয়া গেছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি চকবাজারে হাজি বিরিয়ানির কারখানায় অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। রান্নায় পোড়া ও নিম্নমানের পাম তেল ব্যবহারের দায়ে কারখানাটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এই কারখানা থেকে নগরের তিনটি শাখায় বিরিয়ানি সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে হাজি বিরিয়ানির ব্যবস্থাপক আবদুর রাজ্জাক অবশ্য দাবি করেন, তাঁরা পামওয়েলে রান্না করেন না।
বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে দেখা গেছে, অনেক বেকারিতেই নিম্নমানের পণ্যসামগ্রী ব্যবহৃত হচ্ছে, ডালডার সঙ্গে চিনি মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ক্রিম। কেক-বিস্কুটে মেশানো হচ্ছে পচা ডিম, কাপড়ের রং বা নষ্ট চিনির শিরা। জিলাপি বা নিমকি ভাজা হয় কালো পোড়া তেলে। বেশির ভাগ দোকানে খাবারে উৎপাদনের তারিখ থাকে না। রান্না করা খাবার খোলা অবস্থায় ফেলে রাখার কারণে ধুলাবালির পাশাপাশি মশা-মাছি কিংবা তেলাপোকাও মেলে সেসব খাবারে।

মিস্টিতে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর বিষাক্ত উপকরণাদি যা ভ্রাম্যমাণ আদালত জব্দকরে উক্ত প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ বলেন, পোড়া তেল, খাবারের অনুপযোগী রং, নিম্নমানের সামগ্রী মানবদেহের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি খাবারের কারখানা বা রান্নাঘরের অপরিচ্ছন্নতা, অস্বাস্থ্যকরভাবে খাবার সংরক্ষণও ক্ষতিকর। এসব খাবারে তাৎক্ষণিকভাবে ডায়রিয়া বা খাদ্য বিষক্রিয়া হতে পারে। আর দীর্ঘ মেয়াদে কিডনি, লিভারের পাশাপাশি ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
১৫ ফেব্রুয়ারি গোসাইলডাঙ্গা কে বি দোভাষ লেনের রহমানিয়া বেকারিতে অভিযান চালান জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। পোড়া তেল, নষ্ট উপাদান ব্যবহার ও নোংরা পরিবেশের জন্য এই বেকারিটিকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মাদ রুহুল আমীন। এই কারখানা থেকে ৫০ লিটার পোড়া পাম তেলও জব্দ করা হয়। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বেকারির মালিক আবদুর রাজ্জাক দাবি করেন, ‘পোড়া তেল খাবারে ব্যবহৃত হতো না। এগুলো জ্বালানি হিসেবে লাকড়িতে মেশাতাম।’
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মাদ রুহুল আমীন বলেন, ‘বেশির ভাগ হোটেল-রেস্তোরাঁর রান্নাঘর কিংবা বেকারিগুলোর কারখানার পরিবেশ খুবই নোংরা, দুর্গন্ধময়। একই ফ্রিজে কাঁচা ও রান্না করা মাছ-মাংস রাখা হয়। শিঙাড়া, সমুচা, নিমকি বা জিলাপির সব দোকানেই পোড়া তেল পেয়েছি। এগুলো দেখে তেল না মবিল সেটা নির্ধারণ করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।’
