সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
শনিবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৬
মঞ্জুর চৌধুরী: আস্তিক তিন প্রকার। লজিকাল আস্তিক, সাধারণ আস্তিক এবং ফাজিল আস্তিক। লজিকাল ও সাধারণ আস্তিকের সংজ্ঞা বুঝানোর আগে ফাজিল আস্তিকের সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দেই। ফাজিল আস্তিক হচ্ছে সেই সমস্ত নরাধম যারা ধর্মকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে। এই ধরনের আস্তিকে পৃথিবী ভরপুর। এরা আগে ইমেইলে বা এসএমএসে কলিমা লিখে দিয়ে বলতো “দশজন মানুষের কাছে ফরোয়ার্ড করলে আপনার মনের ইচ্ছা পূরণ হবে। আর না পাঠালে আগামী দশদিনের মধ্যে আপনার জন্য দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছে।”
এদের প্রধান শিকার হতেন সাধারণ আস্তিকগণ। তাঁরা মোবাইলে ব্যালেন্স থাকুক কী না থাকুক, কোন কিছুর পরোয়া না করে, মনে মনে কিছু একটা চেয়ে সাথে সাথে নিজের পরিচিত দশজনের কাছে এই বার্তা পাঠিয়ে দিতেন। আর যদি না পাঠাতেন, তাহলে আগামী দশদিন দুর্ভাগ্যের আশংকায় ঘুম হারাম করতেন। দেখা গেল রিক্সা থেকে নামতে গিয়ে প্যারেকে লেগে শাড়ি বা প্যান্ট ফুটো হয়ে গেছে, ব্যস, সাথে সাথে মনে মনে ভেবে বসা, “আমি দশজনের কাছে পাঠাইনি। নিশ্চই এটা তার ফল! হে আল্লাহ, মাফ করো!”
আর লজিকাল আস্তিক এইসব ম্যাসেজ পেয়ে প্রথমেই ডিলিট বাটনে চাপ দিয়ে আস্তাকুড়ে ফেলবে। আল্লাহ কোন মার্কেটিং এজন্সি খুলে বসেননি যে তাঁর কলিমা কাউকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফরোয়ার্ড না করলে তিনি রাগ করে তাকে শাস্তি দিবেন।
ফাজিল আস্তিকরা নিত্যনতুন মন গড়া কাহিনী বানায়। তাদেরই একটা এমন হতে পারে, হয়তো আপনিও শুনে থাকবেন, “একদিন এক ব্যক্তি মদিনা শরীফে ইবাদত করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন রাসূল (সঃ) তাঁর স্বপ্নে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘আমার উম্মতদের বলে দাও, কেয়ামত অত্যন্ত নিকটবর্তী। এখনই সবাই যেন পাপের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম দয়ালু।’ রাসূল (সঃ) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এই বাণী মানুষের কাছে পৌছে দিবে, সে বেহেস্তের আটটি দরজা দিয়েই প্রবেশ করতে পারবে।’ সুবহানাল্লাহ! এখনই লাইক ও শেয়ার দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিন।”
এবং সাধারণ আস্তিক বেহেস্তের আটটি দরজা দিয়ে প্রবেশের লোভে হুরোহুরি করে শেয়ার করতে করতে নিউজফেড ভরিয়ে দিবেন।
লজিকাল আস্তিক জানেন যে এইসব ভুয়া কথাবার্তা। নবীজি (সঃ) সেই চৌদ্দশ বছর আগেই এই নির্দেশ দিয়ে গেছেন। তিনি তখনই বলে গেছেন তাঁর বাণী লোকের কাছে পৌছে দিতে। মাঝে দিয়ে লাইক ও শেয়ার পাবার উদ্দেশ্যে শুধু শুধু এইসব গল্প ফাঁদবার কোনই প্রয়োজন ছিল না।
যে কোন বিপদে পড়লে ফাজিল আস্তিক কথা ছাড়াই অন্যকে দোষারোপ করবে। সাধারণ আস্তিক দোয়া পড়তে শুরু করবে। এবং লজিকাল আস্তিক দোয়ার পাশাপাশি সেই বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় খুঁজবে। সে জানে, বিনা চেষ্টায় বসে থাকলে আল্লাহ আসমান থেকে ফেরেস্তা পাঠিয়ে তাঁকে বিপদমুক্ত করবেন না। সে জানে যুদ্ধের ময়দানে আমাদের নবীজিও (সঃ) বর্ম পড়তেন, তাঁর পবিত্র দেহ শরবিদ্ধ হলে রক্তপাত হতো। “আমি নবী, আমি দোয়া করলেই কাজ হবে” – এইসব তিনিও ভাবতেন না। মৃত্যুর অনিশ্চয়তা তাঁরও ছিল। জীবনের গ্যারান্টি আর সবার মতন তাঁরও ছিল না।
তবে লজিক্যাল আস্তিকের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে, এরা কখনই কারও ধর্মবিশ্বাসে আঘাত হানেনা। নিজের বিশ্বাস নিয়েই বেঁচে থাকে। এবং নিজের জিহ্বা ও শরীর থেকে সবাইকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করে।
লজিক্যাল বা সাধারণ আস্তিক নিরীহ হলেও ফাজিল আস্তিক কিন্তু সমাজের জন্য ভয়ানক। কেন ভয়ানক, সেটা ব্যখ্যা করার আগে নাস্তিক ক্যাটাগরিও দেখে নেয়া যাক।
আস্তিকদের মতই নাস্তিকও তিন প্রকার। লজিকাল নাস্তিক, সাধারণ নাস্তিক, এবং ফাজিল নাস্তিক।
প্রথমেই বলি লজিকাল নাস্তিকের কথা। এরা লজিক দিয়ে সবকিছু মেলাবার চেষ্টা করে, এবং যখন লজিকে মিলে না, তাঁরা সেটা বিশ্বাস করেননা। এরা পড়াশোনা করেন, এবং অনেক কিছুই জানেন। ইশ্বরে বিশ্বাস না থাকলেও এরা মানবতায় বিশ্বাসী। কারও সাথে খারাপ আচরণ করেন না, ঝগড়া বিবাদ এড়িয়ে চলেন। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেন, সাহায্যও করেন তাঁদের সাধ্য মতন। এরা আমার খুবই প্রিয় লোকজন। আমার বেশ কিছু প্রিয় বন্ধু আছেন, যারা লজিকাল নাস্তিক। এবং যদি মুহাম্মদ (সঃ) পৃথিবীতে না আসতেন, তবে আমিও হয়ত এদেরই কাতারে পড়তাম, নিঃসন্দেহে।
লজিকাল আস্তিকের মতই এদেরও চিন্তাধারা স্বচ্ছ, এবং এরা একে অপরের উল্টো পিঠ। যেমন একটি প্লেন ক্র্যাশের ঘটনা ঘটল, এবং সব যাত্রী ও ক্রু মারা পড়লেন। লজিকাল নাস্তিক তখন বলবেন, “ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলে প্লেন ক্র্যাশ হতো না।”
লজিকাল আস্তিক বলবে, “পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে লাখ খানেক প্লেন ওঠানামা করে। ঈশ্বরের কৃপাতেই বছরে মাত্র দুয়েকটা প্লেন ক্র্যাশ করে। জীবনে একটিও দুর্ঘটনা না ঘটলে, মানুষের জীবনে একদমই দুঃখ কষ্ট না আসলে কেউই ঈশ্বরের করুণাটা উপলব্ধি করতো না।”
একে অন্যের সাথে সহমত পোষণ না করলেও যার যার বিশ্বাস অন্যের উপর চাপানোর চেষ্টা করেনা।
লজিকাল আস্তিকের মতন লজিকাল নাস্তিকও বিপদের সময়ে বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় খুঁজে। পার্থক্য শুধু, সে ভাবে তাঁর নিজের বুদ্ধিতেই সে বিপদ মুক্ত হয়েছে, এবং আস্তিকের বিশ্বাস, তাঁকে ঈশ্বর বিপদ মুক্ত হতে সাহায্য করেছেন।
আরেকটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। মাতৃগর্ভের শিশু মনে করতেই পারে, মাতৃগর্ভই তাঁর পৃথিবী এবং এর বাইরে বেরুলেই তাঁর জীবন শেষ। “মা বাবা” বলে আসলে কোন ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব নেই, সবই মীথ। এটি লজিকাল নাস্তিকের ভাবনা। এবং লজিকাল আস্তিকের ভাবনা হচ্ছে, ওটা একটি সাময়িক জীবন, আসল জীবন শুরু হবে জন্মগ্রহনের পর।
সাধারণ নাস্তিক হচ্ছেন তাঁরা যারা একটা সময়ে একটা ধর্মের চর্চা করতেন, এবং ধীরে ধীরে সেই ধর্ম থেকে তাঁদের বিশ্বাস উঠে গেছে। এঁদের মনের গহিনে সবসময়েই ঈশ্বরের বসবাস। বিপদে পরলেই তাঁরা সেই ইশ্বরের পদতলে আশ্রয় খুঁজেন। এরা ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন, নিজেদের জীবন নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালবাসেন। এরাও হার্মলেস প্রজাতি।
ফাজিল আস্তিকের মতই অতি হার্মফুল প্রজাতি হচ্ছে ফাজিল নাস্তিক গোষ্ঠী। এরা ইচ্ছা করেই বিভিন্ন ধর্মের অপব্যাখ্যা করবে, ইচ্ছা করেই বিভিন্ন ধর্মকে ছোট দেখানোর চেষ্টা করবে, এবং ইচ্ছা করেই দাঙ্গা উস্কে দেয়ার চেষ্টা করবে। এরা মানবতার দোহাই দিলেও বাস্তবে কিছুই পালন করেনা। উল্টা অবাধ যৌনাচারের (অযাচার – ভাইবোন, বাবা-মেয়ে, মা-ছেলের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন) সমর্থনে ক্যাম্পেইন করে। মানুষকে গালাগালি না করে কথা বলতে পারেনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এদের থেকে আশা করাও ভুল।
এই ক্যাটাগরির উদাহরণ ভুরি ভুরি। সহজ কথায়, “আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছি” – এমন নিরীহ স্ট্যাটাসের মধ্যেও ইচ্ছে করে ধর্মকে আক্রমন করে দুয়েকটা কথা ঢুকিয়ে দিবে। তারপর লাইক ও শেয়ার শেয়ার পাবার আশায় হাভাতের মতন মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকবে।
সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এরাও বিপুলাংশে দায়ী। এদের উস্কানি পেয়েই ফাজিল আস্তিকেরা এদের দমাতে ধর্মকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে ফাঁদ পাতবে, এবং সাধরণ আস্তিকেরা সেই ফাঁদে ধরাও পড়বে।
“আমার নবীকে, আমার আল্লাহকে ওরা গালি দিয়ে ফেলেছে! এদের কল্লা না ফালালে ঈমান চাঙ্গা হবে না! নারায়ে তাকবির! আল্লাহু আকবার!”
“ওরা গো মাতাকে হত্যা করে, ওরা মন্দির ভাংচুর করে। ওদের একেকটাকে ধরে না মারলে নরকে পঁচতে হবে। হরে রাম, হরে হরে!”
এখন আপনিই বুঝে নিন, আপনি কোন ক্যাটাগরির।
মঞ্জুর চৌধুরী – অসংখ্য গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য পরিচিত। ফেইসবুক ভিত্তিক গ্রুপ ক্যানভাসের প্রতিষ্ঠাতা এবং একটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে ফিনান্সিয়াল এনালিস্ট হিসেবে বর্তমানে আমেরিকাতে কর্মরত আছেন।

