আন্তর্জাতিক ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
বৃহস্পতিবার, ৫ মে ২০১৬
বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে কাজের সন্ধানে নয় বছর আগে পাড়ি জমিয়েছিলেন মিজানুর রহমান। এরপর তার সময়গুলো কেটেছে কাজের মধ্যেই। মিজান এর মধ্যেই তবে জড়িয়ে পড়েছেন জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে দেশ থেকে ছুটি কাটিয়ে সিঙ্গাপুরে ফিরে যান মিজান। সেখানে স্থানীয় একটি নির্মাণ কোম্পানিতে ড্রাফটসম্যানের (নকশাকার) কাজ করতেন মিজান।
সিঙ্গাপুরের গণমাধ্যম স্ট্রেইট টাইমস জানায়,৩১ বছরের যুবক মিজানের সাথে জঙ্গীদের সেখানে গিয়েই যোগাযোগ হয়। গত ডিসেম্বরে সিঙ্গাপুর ফিরে যাওয়ার মাসখানেক পর থেকেই সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিজের দলে ভেড়াতে শুরু করেন মিজান। আর এ কাজে তাকে সহায়তা করেছে মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি সংগঠন আইএস এবং আল কায়েদা।
চলতি বছরের মার্চ মাসের মধ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ (আইএসবি)। সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানায়, একটি সাংগঠনিক কাঠামোও ছিল আইএসবি’র। দলে সদস্যদের ভূমিকা অনুসারে নির্ধারণ করা হতো পদ-পদবি। লিডার, ডেপুটি লিডারসহ অর্থ সংগ্রহের জন্যও ছিল দায়িত্বরত সদস্য। বাংলাদেশ সরকার এবং সামরিক কর্মকর্তারা ছিল তাদের হামলার লক্ষ্য।
আরো পড়ুন ঃ বাংলাদেশে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা: সিঙ্গাপুরে আটক ৮, ঢাকায় ৫
চলতি বছরের এপ্রিলের দিকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১৩ বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে সিঙ্গাপুরের নিরাপত্তা সংস্থা ইনটার্নাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (আইএসএ)। পরে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ না পাওয়ায় ৫ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। গত মঙ্গলবার তাদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। একই দিন ঢাকায় অভিযান চালিয়ে ফেরত পাঠানো ওই পাঁচজনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। এদের গত ২৯ এপ্রিল সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের সবাই গত তিন থেকে ১০ বছর ধরে সেখানে কাজ করে আসছিলেন। তারা নির্মাণ শ্রমিক অথবা নৌযান শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। প্রথম যখন তারা দেশটিতে পৌঁছেন তখন জঙ্গিবাদ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তাদের।
সিঙ্গাপুরী গোয়েন্দা সংস্থা ইনটার্নাল সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট এক অনুসন্ধানে দেখেছে, অনলাইনে জঙ্গিবাদ বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ পড়ে ২০১৩ সালের দিকে জঙ্গিবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েন আটকদের দলনেতা মিজান। যদিও তারা আইএসের সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হতে পারেনি। তবে মিজানের মতো আরো অনেকেই সংগঠনটির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছেন। গত বছর বাংলাদেশে আসার পর তার অনুসারী এক বাংলাদেশি সিঙ্গাপুর থেকে আইএসের প্রচারণামূলক বিভিন্ন নথিপত্র তার সাথে আদান প্রদান করার পর থেকেই গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যান তারা।
এই সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আইএস প্রায় ৩০ হাজার বিদেশিকে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। ফ্রান্স, তুরস্ক বেলজিয়ামসহ আরো বিভিন্ন দেশে হামলা চালায় সংগঠনটির বিদেশি সদস্যরা। মুসলিমদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন ভাষায় নিজেদের আদর্শ প্রচার করে তারা। এক পর্যায়ে ইরাক কিংবা সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মিজানসহ তার অন্য সঙ্গীরা। তবে সিরিয়া কিংবা ইরাক ভ্রমণ জটিলতাপূর্ণ হওয়ায় বাংলাদেশকেই হামলার লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয় তারা।
আরো পড়ুন ঃ আটককৃত জঙ্গীদের হামলার টার্গেটে ছিল মন্ত্রী, সংসদ, গণমাধ্যম, ব্যক্তিসহ আরো অনেকে
বাংলাদেশ সরকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত- সুতরাং জোরপূর্বক সরকার উৎখাত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে মিজানের দল। ইরাক ও সিরিয়ার আইএসের অধীনে বাংলাদেশেও একটি ‘খেলাফত’ রাজ্য স্থাপনের পরিকল্পনা করে তারা। গণতন্ত্রকে ইসলাম সম্মত মতবাদ বলে মনে করে না আইএস। আগ্নেয়াস্ত্র কেনার জন্য অর্থ জমা করতে শুরু করে মিজানের দল আইএসবি।
তবে শেষ পর্যন্ত তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি বলে জানিয়েছে সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সিঙ্গাপুরে ২৭ বাংলাদেশি গ্রেপ্তারের পর থেকে সতর্ক ছিল গ্রেপ্তারকৃত আটজন। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে তারা সিঙ্গাপুরের কোনো পার্ক কিংবা মাঠে একত্রিত হতো। দেশটির স্বরাষ্ট্র এবং আইনমন্ত্রী কে শানমুগাম সংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশে অন্তত দুইজন আইএসবি সদস্য রয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকার সাথে তারা যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন বলেও জানান তিনি।
সিঙ্গাপুরের জাতীয় উন্নয়ন মন্ত্রী লরেন্স উং বলেন, ‘এটা বিদেশি শ্রমিক কিংবা ইসলামের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়। এটা লোকদের একটি ক্ষুদ্র দলের সাথে সম্পৃক্ত, যারা ধর্মকে বিকৃত করতে পছন্দ করে। তারা তাদের চরমপন্থি আদর্শ অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় এবং নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সন্ত্রাস ও সহিংসতাকে ব্যবহার করে।’
এছাড়া দেশটির স্থানীয় সংসদ সদস্য রায়াহু মাহজাম বলেন, ‘সবার সতর্ক থাকা উচিৎ। তবে সব বাংলাদেশিকে একই পাল্লায় মাপা উচিৎ নয়। কয়েকজনের সমস্যা থাকতে পারে। তবে তাদের বেশিরভাগই এখানে আইন মেনে চলে।’

