প্রকাশিত: বুধবার, ১৮ মে ২০১৬
সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম ডেস্ক ঃ
ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষককে স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে কান ধরে ওঠ-বস করানোর ঘটনা ঘটেছে।
কিন্তু এই ঘটনার নেপথ্যে কী রয়েছে? তার বিরুদ্ধে ওঠা ধর্মীয় অবমাননার ঘটনা আসলেই কি সত্য? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো ব্যাপার? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এনটিভি অনলাইনের পক্ষ থেকে চালানো হয়েছে এক অনুসন্ধান।
নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই শিক্ষককে সমবেদনা জানাতে গেলে নির্যাতনের শিকার শিক্ষক সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার বলে জানান সাংবাদিকদের। এ ছাড়া তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু এ দিকে খবর নিয়ে জানা গেছে, ধর্ম নিয়ে ‘অবমাননার’ বিষয়টি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিসহ স্থানীয় বিচারক এবং স্কুলের অন্য শিক্ষকরা ‘জানেনই না’!
তবে ঠিক কি ঘটেছিল সেদিন? ‘ধর্ম অবমাননা’ নাকি ভিন্ন ষড়যন্ত্র? মসজিদের মাইকে কারা এলাকাবাসিকে উষ্কে দেওয়া ঘটনা ঘটিয়েছিল? একজন প্রবীণ শিক্ষককে এমনভাবে লাঞ্ছনা করা হল কি এমন বলার কারণে? এমন হাজারো প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে প্রগতিশীল সমাজে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা।
সম্প্রতি এনটিভি অনলাইন প্রতিনিধি ঘটনার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও এলাকার বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বলে তুলে এনেছেন বেশ কিছু অজানা তথ্য। পাঠকদের জন্য সেই ঘটনার প্রতিবেদনটি হবহু তুলে ধরা হল।
নিয়মিত সভায় হঠাৎ ভিন্ন ‘এজেন্ডা’
ঘটনার দিন ১৩ মে, শুক্রবার ছিল নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার কল্যাণদি এলাকার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের স্কুল কমিটির নিয়মিত সভা। আর ওই সভার পূর্বনির্ধারিত এজেন্ডা ছিল স্কুলের উন্নয়নমূলক বিষয়।
কিন্তু সভার একপর্যায়ে হঠাৎ করেই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র মো. রিফাতকে গত ৮ মে শ্রেণিকক্ষে ‘মারধর করার’ অভিযোগে প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। স্কুলের উন্নয়নবিষয়ক সভায় হাজির করা হয় ছাত্র রিফাত ও তার মা রিনা বেগমকে। পুরো ঘটনাটিই ঘটেছিল পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাকক্ষে।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্কুলের সামনের একটি মসজিদ থেকে হঠাৎ করেই মাইকে ঘোষণা করা হয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইসলামের বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছেন এবং সেখান থেকে এলাকাবাসীকে স্কুল মাঠে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দলে দলে স্কুলে ঢোকে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাঁরা স্কুলের দরজা ভেঙে ঢুকে প্রধান শিক্ষককে মারধর করে এবং তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
পরে সেখানে পুলিশ উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হওয়ার পর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানকে ঘটনাস্থলে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়। সংসদ সদস্য উপস্থিত হয়ে প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করার শাস্তি দেন।
কান ধরে ওঠবসের পর সমবেত জনতার কাছে করজোড়ে মাফ চাইতেও বাধ্য করা হয় ওই প্রধান শিক্ষককে। পরে সংসদ সদস্যের নির্দেশে প্রধান শিক্ষককে পুলিশের হেফাজতে স্কুল থেকে বের করা হয়। এরপর পুলিশ চিকিৎসার জন্য তাঁকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করে।
কটূক্তির কথা বলতে শুনেনি কেউ
পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র রিফাত এবং তাঁর মা রিনা বেগম দাবি করেন, গত ৮ মে ক্লাসে রিফাতকে বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে গত ১০ মে তাঁরা বিষয়টি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে জানান। সে সময় রিনা বেগম অভিযোগ করেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত রিফাতকে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন।
তবে ওই ক্লাসে উপস্থিত ছাত্ররা জানিয়েছে, তারা কেউই ইসলামের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষককে কোনো কটূক্তি করতে শোনেনি।
ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন স্কুলের ইসলাম ধর্মের শিক্ষক এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি মাওলানা বোরহান উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় ব্যাপারে কোনো শিক্ষার্থী আমার কাছে কোনো কথা বলে নাই। যদি বলত বা আমি জানতাম তাহলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতাম। রিফাত এবং অন্য কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আগে কোনো অভিযোগ করে নাই।’
মাওলানা বোরহান উদ্দিন আরো বলেন, ‘জানাইলে তো স্যারকে (প্রধান শিক্ষককে) জিজ্ঞেস করতাম স্যার কী হইছে বা এই ব্যাপারে কেন বললেন বা পদক্ষেপ নিতাম।’ এ ছাড়া ধর্মীয় বিষয়ে শ্যামল কান্তি ভক্তকে কখনো কোনো উগ্র কথা বলতে শুনেন নাই বলেও জানান তিনি।
মিটিং চলাকালে হঠাৎ মসজিদে ঘোষণা
ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি মাওলানা বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের মিটিং চলার মাঝখানে হঠাৎ বাইরে শোরগোল শোনা গেল। তখন আমরা বাইরে বের হয়ে দেখি অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। এর মধ্যে লোকজন স্কুলের বারান্দায় উঠে বলতে থাকল, হেডমাস্টারের অপসারণ চাই।’
এর মধ্যেই মসজিদের মাইক থেকে হেডমাস্টার (শ্যামল কান্তি ভক্ত) ধর্ম সম্বন্ধে আর আল্লাহ সম্পর্কে কটূক্তি করছেন এমন কথা প্রচার করা হয়। মাওলানা বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়টা কিন্তু আমাদের জানা ছিল না। এর মধ্যে মাইকের কথা শুনে চতুর্দিক থেকে লোক আসা শুরু করল। এই অবস্থা দেখে আমরা স্কুল রুমে দরজা আটকাইয়া বসে থাকলাম।’
‘পরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি থানায় এবং বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে এলাকার চেয়ারম্যান, থানা নির্বাহী কর্মকর্তা (টিএনও), উপজেলা চেয়ারম্যান আর এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডেকে আনেন। কিন্তু কেউ কাউকে থামাতে পারছিল না। শেষে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে হেডমাস্টার স্যারকে এলাকাবাসী মারধর করে’- বলেন মাওলানা বোরহান উদ্দিন।
তিনি আরো বলেন, “দাঙ্গা পুলিশ আসার পরও ঘটনা শান্ত হওয়ার লক্ষণ না দেখা যাওয়ায় শেষে এমপি সাহেবকে (সেলিম ওসমান) ফোন দেওয়া হইছে। এমপি সাহেব আসার পর জনগণের একটাই দাবি, ‘হয় হেডমাস্টারের লাশ যাবে অথবা তাঁর ফাঁসি চাই। আমরা কারো কথাই শুনি না।’ এই কথা শোনার পরে এমপি সাহেব হেডমাস্টারকে বলছে, ‘আপনি কী করবেন? আপনি জনগণের কাছ ক্ষমা চান।’ পরে কানবটনি (কান ধরে ওঠবস) দিয়া ক্ষমা চেয়ে তারে পুলিশ দিয়া পাঠাইয়া দিছে।”
স্থানীয় বায়তুল আতিক জামে মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান জানান, শুক্রবার জুম্মার দিন হিসেবে মসজিদ খোলাই ছিল। বাইরে থেকে কয়েকজন এসে মাইকে ধর্মীয় অবমাননার ব্যাপারটি ঘোষণা করে। তাদের কাউকে তিনি চেনেন না বলে জানিয়েছেন।
ইমাম মাহমুদুল হাসানের জবানিতে, ‘সেইদিন মসজিদ খোলা ছিল। এর মধ্যে কয়েকজন ছেলে এসে আমার কাছে মসজিদের চাবি চায়। আমি মসজিদ খোলা জানানোর পর ছেলেরা মসজিদের মাইকে গিয়ে ঘোষণা দিছে।’ একাধিকজন এই ঘোষণা দেয় বলেও জানান তিনি।
এদিকে গ্রাম পঞ্চায়েত কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শামসুল হক শামসু বলেন, ‘মাইকে ঘোষণা পাইলাম আপনারা যে যেখানে আছেন আসেন। আমাদের মুসলমানের ধর্মের ব্যাপারে আঘাত হেনেছে স্কুলের হেডমাস্টার।’
পঞ্চায়েত কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আরো বলেন, ‘আমি এখানে এসে দেখি হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে গেছে। সবার একই কথা স্কুলের হেডমাস্টারের ফাঁসি চাই। তাঁকে বের করে দেন।’ সেই সময়ে তিনিসহ এলাকার আরো গণ্যমান্য ব্যক্তিরা স্কুল কমিটির সদস্য আর প্রধান শিক্ষককে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম জানান, প্রধান শিক্ষক অবরুদ্ধ রয়েছেন এমন খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান এবং সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় ৩০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে কোনো পক্ষ থেকেই আগে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলে জানান তিনি।
‘পুরো ঘটনাটিই ছিল সাজানো নাটক’
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আহত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত দাবি করেছেন, পুরো ঘটনাটিই ছিল সাজানো নাটক। ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে ওই ছাত্রকে দিয়ে বলিয়ে তার ওপর মিথ্যে অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইসলাম ধর্ম নিয়ে কোনো ধরনের কটাক্ষ তিনি করেননি।
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘ধর্মীয় আঘাতের কথা ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মতিউর রহমান মিজুর সাজানো নাটক। আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং প্রাণে নিঃশেষ করার জন্য তারা এটা করেছে।’
শিক্ষক শ্যামল কান্তি আরো বলেন, ‘আমি আজ ১৭ -১৮ বছর ধরে এই স্কুলে আছি। টিনশেড এবং একেবারে জলাবদ্ধ ভূমি থেকে শুরু করে স্কুলকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসছি। এখন তো স্কুল বেশ চোখে পড়ে, তাই হয়তো তাদের (ম্যানেজিং কমিটির) লোভ বা লালসা সৃষ্টি হইছে।’
ধর্মীয় কটূক্তির প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘এটা আমি বলি নাই বা ওইরকম কোনো প্রসঙ্গই উঠে না। বা সেও (ছাত্র রিফাত) বলে নাই, আল্লাহ রাসুল বা আল্লাহ পাক। সে ছেলেটাও বলে নাই। তাকে দিয়ে বলানো হইছে।’
‘আমার বিরুদ্ধে তাকে দিয়ে বলানো হইছে এবং কী বলছে সেটাও আমি জানি না। তার আগেই আমাকে কুপোকাত…’ – যোগ করেন আহত প্রধান শিক্ষক।
এদিকে এ বিষয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান সাংসদ সেলিম ওসমান। তবে ফোনে তিনি জানিয়েছেন, জনরোষ থেকে রক্ষা করতেই শিক্ষককে আমি শাস্তি দিয়েছি। ‘এ ছাড়া আমার অলটারনেট কিছু করার ছিল না’ ঘটনার বর্ণনায় যোগ করেন সাংসদ।

