ইতিহাসের সামনে ‘গোলাপি’ ক্রিকেট
বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৫
খেলা ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
চট্টগ্রাম ঃ আপনি হয়তোবা ভাবছেন সেটা আবার কেমন ক্রিকেট? এতদিন ফ্লাডলাইটের আলোয় ওয়ানডে আর টি২০ ক্রিকেট দেখা গেছে। এবার দেখা যাবে সাদা পোশাকের টেস্ট ক্রিকেট। এ যেন গোলাপি বল আর ফ্লাডলাইটের কাল বিবর্তণের টেস্ট।
টেস্ট ক্রিকেটের ১৩৮ বছরের ইতিহাসে যা হয়নি অ্যাডিলেডে সেটাই হতে চলেছে। সবকিছু ঠিকঠাক। আগামীকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৯.৩০ মিনিটে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়দের অ্যাডিলেড ওভালে পা পড়লেই ক্রিকেটে তৈরী হয়ে যাবে নতুন ইতিহাস। যার নাম ‘গোলাপি’ ইতিহাস।
মূলতঃ ১৯৭১ সালে ক্রিকেটের বিবর্তণ শুরু। ওয়ানডে ক্রিকেট প্রচলনের মধ্য দিয়ে। এরপর ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু বিশ্বকাপ। তবে ১৯৯২ সাল থেকেই শুরু হয়েছে ক্রিকেটের মূল বিবর্তণ ধারা। দারুণ একটা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আধুনিক ক্রিকেট। ১৯৯২ বিশ্বকাপে প্রথম রঙ্গিন পোশাক এবং ফ্লাড লাইটের অভিষেক ঘটেছিল। বিবর্তনের ধারায় ২০০৬ সালে এলো টি২০ ক্রিকেট। শুদ্ধজনদের পছন্দ না হলেও, জনপ্রিয়তার দৌড়ে টি২০ ক্রিকেট এখন ওয়ানডে কিংবা টেস্টের চেয়ে যে কয়েকমাইল এগিয়ে, তা খালি চোখেই দেখা যায়।
এবার বিবর্তনের ধারায় চলে এলো দিবা-রাত্রির টেস্ট। সাদা পোষাকের পাঁচদিনের ক্রিকেটে শুধু ফ্লাড লাইটের আলোয় নয়, গোলাপি বলেরও অভিষেক ঘটানো হচ্ছে। আগামীকালই শুরু হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক দিবা-রাত্রির টেস্ট। অ্যাডিলেডে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে প্রথম গোলাপি বলে দিবা-রাত্রির টেস্ট।
১৯৭৭-৭৮ সালে যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ক্রিকেট কতই কিছুই না দেখেছে। কেরি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজের কথা সবারই জানা। ১৯৭৭-৭৮ এবং ১৯৭৮-৭৯ মৌসুমে ফ্লাডলাইটে ‘সুপার টেস্ট’ এবং রঙিন পোশাকের ওয়ানডে ক্রিকেটের আয়োজন করে ক্রিকেট বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। যদিও তা ছিল আনঅফিসিয়াল।
কারণ, প্যাকারের ওই আয়োজনকে সবসময়ই বাঁকা চোখে দেখেছে অস্ট্রেলিয়া। আজ এতদিন পর এসে যেন তারা প্যাকারের কর্মকান্ডকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো। ওয়ার্ল্ড সিরিজ খেলা ক্রিকেটারদের নামের পাশে তাদের আলাদা পরিসংখ্যান যোগ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রঙিন পোশাকের ক্রিকেটে প্যাকারের অবদান কম নয়। এরই ধারাবাহিকতায় টেস্ট ক্রিকেটও হতে যাচ্ছে কৃত্রিম আলোর নিচে। ফ্লাডলাইটের ম্যাচে প্রথম বিরতি মধ্যাহ্ন ভোজের না দিয়ে দেওয়া হবে চা বিরতির। ধারণা করা হচ্ছে, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) এই চ্যালেঞ্জ সফল হলে, ফ্লাডলাইটে টেস্ট ম্যাচ গোটা ক্রিকেট বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়বে।
একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ফ্লাডলাইটে টেস্ট ম্যাচ আয়োজনের আলোচনা হয়েছিল ২০০৯ সালে। এমসিসি’র ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট কমিটি টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ধুমধাড়াক্কা টি২০ চলে আসায় সাদা পোশাকের ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ ব্যাপকভাবে কমে যায়। ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট কমিটি ভাবনা চিন্তা শুরু করে দেয় যে, টেস্ট ক্রিকেটকে ফ্লাডলাইটে নিয়ে আসা যায় কি না? এতে করে টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি দর্শক আগ্রহ বাড়তেও পারে। ছয় বছর পর অবশেষে টেস্ট ক্রিকেটও চলে এল কৃত্রিম আলোর নিচে।
লাল বলে শুরু থেকে এ পর্যন্ত টেস্ট হয়েছে ২,১৮৮টি। গোটা ক্রিকেট বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গোলাপী বল এবং ফ্লাডলাইটে টেস্ট ক্রিকেট কেমন হয়, দেখার জন্য। ইতিহাসের প্রথম ‘টাইমলেস’ টেস্টে ওভার হতো চার বলে। এরপর লাল বলে পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেটে ওভার ছয় বলে। গোলাপি বলে টেস্ট ক্রিকেটের ওভাওে বল বাড়ছে না। হবে সেই ছয় বলেই।
দিবা-রাত্রির টেস্ট এবং গোলাপি বল নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। দিন-রাতের আলোয় সাদা-টোষাকের ক্রিকেট কেমন হবে, তা নিয়েই নাক সিটকেছেন অনেকে। আবার ফ্লাড লাইটের আলোয় গোলাপি বল দেখা যাবে কম বলেও এই ক’দিন আগে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন স্টিভেন স্মিথ থেকে শুরু করে অসি ক্রিকেটাররা। তবে, বল প্রস্তুতকারী সংস্থা কোকাবুরা প্রথম থেকেই বলে আসছে, ফ্লাড লাইটের আলোয় লাল বলের মতই দৃশ্যমান হবে গোলাপি বল।
তবে, এ নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষাও কম হয়নি। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট লিগে ব্যবহার করা হয়েছে গোলাপী বল। গত মাসেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী একাদশের খেলায় ব্যবহৃত হয়েছিল গোলাপি বল। যদিও ওই ম্যাচের পর অ্যাডাম ভোজেস আর জশ হ্যাজলউড বল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। আবার অ্যাডিলেড টেস্টের আগে যে প্রস্তুতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটা হয়েছিল ফ্লাড লাইটের আলোয়, গোলাপি বলে। এই ম্যাচে সেঞ্চুরি কার কিউই ওপেনার মার্টিন গাপটিল এক কথায় জানিয়ে দিলেন, ‘গুড এনাফ।’
অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড দলের কোন খেলোয়াড়েরই জানা নেই গোলাপি বলে সুইং না সিম বেশি হবে! তবে এরইমাঝে সুপার টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ গ্রেগ চ্যাপেল প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘যতই প্রযুক্তির উন্নতি আনা হোক না কেন, একটা জিনিস কিন্তু বদলাচ্ছে না। গোধূলী। সন্ধ্যা নামার আগে এবং ফ্লাডলাইট জ্বলে ওঠার আগে ব্যাটসম্যানদের খারাপ আলোয় ব্যাট করতে হবে।’ চ্যাপেলের কথা কতটা যুক্তিসঙ্গত সেটা অ্যাডিলেডে টসের পরপরই বোঝা যাবে।
মিচেল জনসনের দূর্ভাগ্য অবসর নিয়ে ফেলায় তিনি ইতিহাসের স্বাক্ষী হতে পারছেন না। উসমান খাজা চোটগ্রস্থ হয়ে না পড়লে নিশ্চিতভাবেই থাকতেন অ্যাডিলেডে। তার চোটে ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছেন শন মার্শ। সেক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে অর্থাৎ তিন নম্বরে ব্যাট হাতে নেবেন অসি অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ। আর জনসনের জায়গা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পিটার সিডলের। প্রথম দুই টেস্টে তিনি দ্বাদশ খেলোয়াড়ের ভূমিকা পালন করেছেন।
ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে মাঠে নামার। বুধবার অনুশীলনের সময় ট্রেন্ট বোল্ট খুব একটা স্বস্তিবোধ করেননি। তারপরও তাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে খেলানোর।
অস্ট্রেলিয়া (সম্ভাব্য): জো বার্নস, ডেভিড ওয়ার্নার, স্টিভেন স্মিথ (অধিনায়ক), অ্যাডাম ভোজেস, শন মার্শ, মিচেল মার্শ, পিটার নেভিল, মিচেল স্টার্ক, পিটার সিডল, জশ হ্যাজেলউড, নাথান লিয়ন।
নিউজিল্যান্ড (সম্ভাব্য): মার্টিন গাপটিল, টম লাথাম, কেন উইলিয়ামসন, রস টেলর, ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, বিজে ওয়াটলিং, মিচেল সান্টনার/মার্ক ক্রেইগ, ডগ ব্রেসওয়েল, ম্যাট হেনরি/নেইল ওয়াগনার, টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট।
সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন