শুক্রবার,১৪ এপ্রিল ২০১৭
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
অপরাধে জড়িত হওয়ার অভিযোগে গত ছয় বছরে পাঁচ শতাধিক পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এর মধ্যে কনস্টেবল থেকে শুরু করে উপপরিদর্শক (এসআই) যেমন আছেন, তেমনই আছেন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তারাও। তবে চাকরি হারানোর মতো শাস্তির আওতায় আসেননি কোনো পরিদর্শক।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৬ সালের শেষ নাগাদ পুলিশ বাহিনীতে সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৬৬ জন। এর মধ্যে চার ক্যাটাগরিতে পরিদর্শক রয়েছেন মোট ৪ হাজার ৪০২ জন। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে নানা ধরনের অপরাধে সম্পৃক্ততা মেলায় বাহিনী থেকে ৫৫১ জনকে বরখাস্ত করেছে সরকার। এদের মধ্যে এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তা রয়েছেন ১১ জন। বাকি ৫৪০ জনই কনস্টেবল থেকে এসআই পদের। এ ছয় বছরে ২৬২ জন পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে নানা অপরাধের প্রমাণ মিললেও একজনকেও চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তবে ২০১১ সালে একজন পরিদর্শককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী, অপরাধে জড়ালে পুলিশের বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির বিধান রয়েছে। একটি হলো লঘুদণ্ড, অন্যটি গুরুদণ্ড। গুরুদণ্ড হলো কাউকে বিনা অপরাধে শারীরিকভাবে নির্যাতন অথবা হত্যার শাস্তি। ফৌজদারি যেকোনো অপরাধের জন্যই পুলিশ সদস্যদের গুরুদণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে। এমন অপরাধের শাস্তির মধ্যে আছে চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ। বাহিনীর কোনো সদস্যকে গুরুদণ্ড দিতে হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করতে হয়। সেই মামলার মাধ্যমে ওই সদস্য দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে গুরুদণ্ড দেয়া যায়। তবে গুরুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করা যায়। অন্যদিকে হুমকি দেয়া, ঘুষ নেয়া, চাকরি শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করা, দায়িত্বে অবহেলা করা, নির্দেশ অমান্য করা, ভিত্তিহীন বা তুচ্ছ বিষয়ে অভিযোগ করার শাস্তি হলো লঘুদণ্ড। এ ধরনের শাস্তির ক্ষেত্রে অবশ্য বিভাগীয় মামলা রুজু করতে হয় না। এই অপরাধের সাজা চাকরিচ্যুতি ছাড়া যেকোনো কিছুই হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে তিরস্কার করা, সতর্কীকরণ, অতিরিক্ত ড্রিল, আটক বা নজরদারি ও ফেটিক ডিউটি প্রভৃতি।
সূত্রমতে, ২০১১ সালে ২৯ জন পুলিশ পরিদর্শকের নানা অপরাধে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছিল বাহিনী। পরে তাদের বিষয়ে বিস্তর তদন্তে গিয়ে মাত্র একজন পুলিশ পরিদর্শককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এছাড়া বাকি ২৮ জনকে লঘুদণ্ড ও গুরুদণ্ড দেয়া হয়।
২০১২ সালে ৩৫ জন পরিদর্শকের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়ানোর প্রাথমিক প্রমাণ পায় পুলিশ বাহিনী। এদের মধ্যে ৩৩ জনের বিরুদ্ধে লঘুদণ্ড ও দুজনের বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড দেয়া হলেও তাদের কারো বিরুদ্ধেই চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যদিও ওই বছরে অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়ায় চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ১৯২ জনকে। এদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে এসআই পদের ১৭৮ জন ও এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদের চারজন বরখাস্ত হন।
২০১৩ সালে ৩৮ জন পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে অপরাধ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় বাহিনী। প্রাথমিক তদন্ত শেষে ৩৫ জন পরিদর্শককে লঘুদণ্ড ও তিনজন পরিদর্শককে গুরুদণ্ড দেয়া হলেও কাউকেই চাকরিচ্যুত বা স্থায়ী কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যদিও ওই বছর বিস্তর তদন্ত শেষে ৭৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ৭৫ জনই ছিলেস কনস্টেবল থেকে এসআই পদের। বাকি চারজন ছিলেন এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তা।
একই চিত্র ছিল ২০১৪ সালেও। ওই বছর প্রাথমিক তদন্তে ৫০ জন পুলিশ পরিদর্শকের অপরাধ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় বাহিনী। এদের মধ্যে ৪৫ জনকে লঘুদণ্ড ও পাঁচজনকে গুরুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বিস্তর তদন্তে এদের কারো বিরুদ্ধেই স্থায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। যদিও ওই বছর বিস্তর তদন্ত শেষে ৭৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে এসআই পদের ৭৩ জন ও এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদের একজন। ২০১৫ সালে এসে ৫৮ জন পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়ে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বিস্তর তদন্ত শেষে পরিদর্শকের মধ্যে কাউকেই চাকরিচ্যুত বা স্থায়ী শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। যদিও ওই বছর ৭৪ জনকে অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে চাকরিচ্যুত করা হয়। এদের মধ্যে ৭২ জন কনস্টেবল থেকে এসআই পদের। বাকি দুজন এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তা।
সর্বশেষ ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আসে পুলিশ সদর দপ্তরে। ওইসব অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত করে ৬১ জন পরিদর্শককে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু পরবর্তিতে বিস্তর তদন্ত শেষে কোনো পরিদর্শককেই চাকরিচ্যুত বা স্থায়ীর শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। যদিও ওই বছর অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে কনস্টেবল থেকে এসআই পদের ৫৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।
পুলিশ পরিদর্শকদের স্থায়ী শাস্তি না হওয়ার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের কোনো কর্মকর্তাই প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, বেশির ভাগ পুলিশ পরিদর্শকই বিভাগীয় দায়িত্বে থাকেন। আর এ কারণেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগটাও অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ভালো থাকে। সে সুযোগটি কাজে লাগিয়েই তারা স্থায়ী শাস্তি এড়িয়ে যান।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিশেষ শাখার (সিটি এসবি) এক পরিদর্শকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ব্যাংক চেকে জোর করে স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগ ওঠে। আজিজ আহমেদ নামে ওই পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে অভিযোগটি করেছিলেন একজন কোচিং সেন্টার মালিক। নগরের জিইসি মোড় এলাকায় ‘এমসিএইচ’ ও ‘ইউনিএইড’ নামের দুটি কোচিং সেন্টারের মালিক রাশেদ মিয়া চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চাঁদাবাজির এ অভিযোগ করেন। আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগর পুলিশ বরাবর লিখিত অভিযোগ করার কথাও ওই সময় জানান তিনি।
শুধু চাঁদা দাবিই নয়, পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে রয়েছে যৌন হয়রানির অভিযোগও। পুলিশের বিশেষ তদন্ত শাখার (সিআইডি) পরিদর্শক ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগটি করেছিলেন সাবিহা রহমান মিনা নামে এক সংগীতশিল্পী। ২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্রাব) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক এবং অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. এআই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী কেউ অপরাধ করে থাকলে সার্ভিস রুল অনুযায়ী তার শাস্তি হওয়া উচিত। না হলে সেটাকে আইনের ব্যত্যয় বলা হয়। পরিদর্শকদের স্থায়ী শাস্তির বিধান না হওয়ার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। এর একটি রাজনৈতিক, অন্যটি অর্থনৈতিক। পুলিশের এসব পদে যারা অধিষ্ঠিত হন, তারা সাধারণত রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকেন। এ কারণেই গুরুতর অপরাধ করেও পার পেয়ে যান তারা।
তিনি আরো বলেন, পুলিশের একটি বিশেষ পদের ক্ষেত্রে স্থায়ী শাস্তি না হওয়ার কারণে দুই ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। এর একটি হচ্ছে অসন্তোষ। এই অসন্তোষ শুধু বাহিনীতে নয়, জনগণের মধ্যেও তৈরি হয়। আর দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো এর মধ্য দিয়ে অপরাধীকে উত্সাহিত করা হয়। কিন্তু অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে হলে অবশ্যই সবার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
উৎসঃ বণিকবার্তা









