সোমবার,১৪ আগস্ট ২০১৭
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
ডেস্ক সংবাদ : আজকে (১৩ আগস্ট ২০১৭) রাত তিনটায় আমার কোন কারণে ঘুম ভেঙ্গে যায়। মেসেঞ্জারে দেখি জনৈক ছাত্রের পাঠানো একটি লিংক। লিংকটি একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের একটি সংবাদ আমার ছবি সহ, যেখানে শিরোনাম হয়েছে আমি নাকি শেষ কার্যদিবসে অর্ধশত লোককে ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে চাকরি দিয়ে বিদায় নিয়েছি।
গতকাল থেকে আমি দপ্তরে নেই। সে জন্য প্রতিবাদলিপিটি আমার জনসংযোগ কর্মকর্তাকে দিয়ে না লিখিয়ে আমিই ফেইসবুকে দিচ্ছি, যেখান থেকে আশা করি অনলাইন মাধ্যমটি ডাউনলোড করে তাঁদের সংবাদ মাধ্যমে ছাপাতে পারবেন।
এ রিপোর্টটি নিছক আমাকে অপমান করার জন্য রচিত, যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কিছুই সঠিক নয়। প্রথমত বলে নিই, আমার উপাচার্য থাকাকালীন সময়ে আমি ৫ কোটি নয়, ৫ পয়সাও কখনো কারো কাছ থেকে অনৈতিকভাবে বা বেআইনিভাবে গ্রহণ করিনি। একেবারে নিষ্পাপ মন নিয়ে কাজ করে গেছি। এবং সে জন্য আমার বিদায়বেলায় অঝোর বৃষ্টির মধ্যে যে শ পাঁচেক লোক (শিক্ষক, কর্মকর্তা, এবং তাঁদের কারো কারো পরিবার, শিক্ষার্থী, এবং এলাকাবাসী) উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা সবাই কেঁদে কেটে আমাকে বিদায় জানিয়েছিলেন যা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন বিদায়ী উপাচার্যের জন্য স্বপ্নসম।
আমি প্রায় বলেছি, এ দায়িত্ব আমি যখন পাই, আমি এটাকে আল্লাহ্র তরফ থেকে পবিত্র আমানত হিসেবে পেয়েছি বলেছিলাম। এবং জাতীয় কবি নজরুলের নামে বিশ্ববিদ্যালয়টি হওয়াতে একনেকের একটি সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুষ্পষ্ট নির্দেশ ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে যেন একটি আর্ন্তজাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করি। এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের আমি একজন সৈনিক। সে জন্য জাককানইবির সকল পর্যায়ের সবাইকে নিয়ে বিরাট একটি সমঝোতা ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে আমি এই স্বপ্নের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছি আমার সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দিয়ে। সে জন্য এটা অন রেকর্ড থাকতে পারে যে আমার আমলে বিশ্ববিদ্যালয় একদিনের জন্যও অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে বন্ধ থাকেনি। তার চেয়েও বড় কথা কোন ছাত্র সংঘর্ষ হয়নি যাতে কোন মায়ের কোল খালি হতে পারে। কোন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান কখনো মিস যায় নি। সকল ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠূভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এবং কোথাও ব্যত্যয় ঘটলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ বছরের জীবনে প্রথম সমাবর্তন অত্যন্ত সুষ্ঠূভাবে সমাপন হয়, যেখানে সভাপতিত্ব করেছিলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বয়ং। যে ছাত্রলীগ সংগঠনটি নিয়ে বহু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা সংকট তৈরি হয় বলে শোনা যায়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ছাত্র সংগঠনটি অত্যন্ত গোছালো, সুসংগঠিত, দেশপ্রেমিক ও ইতিবাচক সংগঠন, যাদের সহযোগিতা আমি আমার উন্নয়ন ও শিক্ষামূলক উন্নয়ন কাজে সর্বোতভাবে পাওয়া নিশ্চিত করেছি।
আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের অন্যতম আগুয়ান সৈনিক, এবং সে জন্য আমি সকল বিভাজনের ঊর্ধে্ব থেকে বাংলাদেশের সতত উন্নতি করার ক্ষেত্রে আপোষহীন। সে জন্য যাঁরা আমার কর্মকান্ড কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তারা জানেন যে আমি ক্ষুদ্র স্বার্থান্বেষী দলাদলীকে কখনো প্রশ্রয় দিইনি, বরঞ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময় উন্নতিকে সামনে রেখে অকুতোভয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছি। অফিসতো নিয়মিত ৯-৫টা করেছি, এবং সবাইকে সৎ পরামর্শ দিয়ে অনুপ্রেরণা দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে বিশ্ববিদ্যালয়টা আমাদের গর্বের বস্তু। একটা ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে, আরেকটা ৪৮০ কোটি টাকার প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। ত্রিশালের আকাশ এখন জাককানইবির দশতলা ভবনগুলির ছাদ ছুঁতে প্রতীক্ষমান।
মাস্টার রোলের ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলি। মাস্টার রোলের একটা বোর্ড সিন্ডিকেইট কর্তৃক নির্ধারিত হয়। কিন্তু ইউজিসির নিয়মে আছে তাঁদের পূর্বানুমতি ছাড়া মাস্টার রোল নিয়োগ দেয়া যাবে না। এখানে বলে রাখি আমার ওপর সবসময় বিভিন্ন মহল থেকে মাস্টার রোলে লোক নিয়োগ দেবার চাপ ছিল। আবিষ্কার করেছি, আমার সঙ্গে যে কোন সম্পর্কের তলায় তলায় থাকে একটি বা একাধিক লোক নিয়োগের আর্জি। কিন্তু আমি কখনো এ অন্যায় সুযোগটি গ্রহণ করিনি। আবার এটাও সত্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভূত ভৌত অবকাঠামো দ্রুত গড়ে উঠছে বিধায় এবং যানবাহন পুলে গাড়ি বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত জনবলও প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। বলা আবশ্যক যে বার্ষিক বাজেটেও সরকার/ইউজিসি মাস্টার রোলের খাতে কিছু টাকা দিয়ে থাকেন। কিন্তু জাককানইবিতে আমরা কখনো মাস্টার রোলে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ম বহির্ভুত লোক নিয়োগ দিইনি, বোর্ড বসিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিধায় সরকারের অডিট এবং ইউজিসির এ ব্যাপারে কোন আপত্তি কখনো আসেনি।
আর শেষ কার্যদিবসের যে লোক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে সেটা পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা থেকে এসেছে। আগেই বলেছি, ইউজিসির পূর্বানুমোদন ছাড়া মাস্টার রোলের বোর্ড বসানো যায় না। গত ৫ তারিখের সিন্ডিকেইটে মাস্টার রোলের বোর্ডটি পুনরগঠিত হয়। কিন্তু আমার সময় শেষ হয়ে আসাতে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এবং আমি পরামর্শ করে ঠিক করি যে ইউজিসির নিয়ম ভাঙ্গা যাবে না, এবং বোর্ডও বসানো যাবে না। বোর্ড বসানোর আগে ইউজিসির পূর্বানুমোদন লাগবে। এবং এ মর্মে একটি চিঠি ইউজিসিকে লিখতে আমি রেজিস্ট্রারকে নির্দেশ দিয়েছি।
কিন্তু যেটা ভিতরে ভিতরে আমার বা প্রশাসনের অগোচরে হয়েছে সেটা হচ্ছে যে বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু লোক নানা জায়গায় লোক দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন যাতে ভবিষতে তারা মাস্টার রোলের জন্য বিবেচিত হন। এবার মাস্টার রোল বোর্ডটি না বসানোতে এ মহলটিই ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের ভাগ্যলক্ষ্মী ছিঁড়ে যাচ্ছে বিধায় আমার নামে পাল্টা অভিযোগ আনতে গণমাধ্যমের কোন কোন মহলকে উৎসাহিত বা উস্কানি দিয়েছে বলে আমার ধারণা হয়।
এ রিপোর্টটির আরেকটি হাস্যকর দিক হচ্ছে, মানুষ যদি আমাকে ৫ কোটি টাকা দিয়ে থাকে, কীসের ভিত্তিতে দিল! আমি বা প্রশাসন কি তাদেরকে নিয়োগ দিয়েছি? আর আমি যদি আমার শেষ দিনে তাদেরকে নিয়োগ দিই, যে নিয়োগের কোন আইনগত ভিত্তি নেই, উপরন্তু আমার যাবার শেষ দিনে তারা কেন আমাকে বিশ্বাস করবে? তাদেরকি এতটুকু মগজ নেই এ কথা বোঝার জন্য যে আমি কিভাবে অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেব? টাকা কি মানুষ এত সহজে ছাড়ে? আসলে যেটা হয়েছে আমার মনে হয়, কেউ বা কারা কারা হয়ত কোথাও কোথাও মিথ্যা আশ্বাসের ভিত্তিতে লোক দাঁড় করিয়েছে, যেগুলি আমি বা প্রশাসন কখনো জানি না। এখন আমার বিদায়ের সময় বলা হচ্ছে যে আমি নাকি লোক দাঁড় করিয়েছি? কী আশ্চর্য, যেখানে আমার চাকরির মেয়াদ এক দিন ছিল সেদিন আমি কোন যুক্তিতে লোক নিয়োগ দেব? তাও বোর্ড ছাড়া, কাগজপত্র ছাড়া? আর ওরাও বা আমার কথায় বিশ্বাস করবে কেন? আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, শেষ কার্যদিবসে আমি ধর্নাদারী ব্যক্তিবর্গকে বলেছি বোর্ড বসানো সম্ভব নয়, এবং এ ব্যাপারে আমার কোন দিগনির্দেশনাও ছিল না।
তবুও মাস্টার রোল নিয়ে একটি দর্শনের কথাও আমি বলি। সেটা ছিল আমাদের প্রথম মাস্টার রোল নিয়োগ। আমি ত্রিশালে এসে কবি নজরুল যেখানে জায়গীর ছিলেন সে বেচুতিয়া ব্যাপারির বাড়িটা দেখতে যাই। দেখি যে পরিবারটি খুব দরীদ্র। এর আগে আমি কখনো মাস্টার রোল কনসেপ্টটার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। জানলাম যে মাস্টার রোল হচ্ছে অনির্ধারিতভাবে দিনের কাজের দিনের মজুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ। তখন আমি চিন্তা করলাম, যে বেচুতিয়া ব্যাপারির বাড়িতে জায়গীর থেকে কবি নজরুল কবি নজরুল হয়েছেন, এবং যিনি পরবর্তীকালে একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় কবি হয়েছিলেন, এবং যে কবির নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং ভাগ্যক্রমে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি উপাচার্যগিরি করার দায়িত্ব পেয়েছি, সে পরিবারের দারিদ্র মোচনে কিছু একটা করা যেন আমার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তখন সে বাড়ির একটা ছেলেকে আমরা বাসের হেল্পার হিসেবে চাকরি দিলাম মাস্টার রোলে। এ দর্শন থেকে আপনারা যাঁরা গণমাধ্যমে আছেন জরীপ করলে দেখতে পাবেন, মাস্টার রোলে শারীরিকভাবে সক্ষম কিন্তু অত্যন্ত দরিদ্র—যেমন বিধবার একমাত্র ছেলে– সেরকম লোকই নিয়োগ পেয়েছে। আমি ব্যাপকভাবে দারিদ্র-দূরীকরণ নীতিতে বিশ্বাসী, এবং আমার সে ভাবনা আমাদের নিম্নবিত্ত কর্মচারীদের নিয়োগের বেলায় প্রতিফলিত হয়েছে। একজন পঙ্গু মালিকে শুধু চাকরি দেওয়া নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দু:স্থ খাত থেকে একটি রিকশাও কিনে দেওয়া হয়েছে তার চলাচলের জন্য।
আর সিন্ডিকেইটে অনুমোদিত বিভিন্ন নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা আরেকটা হাস্যকর ব্যাপার। প্রতিটি নিয়োগ নিয়োগ-কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে সিন্ডিকেইটে অনুমোদিত হয়। এখানে উপাচার্যের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করার কোন সুযোগ নেই।
তবে মিথ্যা অভিযোগে আমাকে হেয় করার চেষ্টা বা প্রচেষ্টা আমি জাককানইবিতে যোগদান করার শুরু থেকেই চলে আসছে। তখন আমি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির কথা চিন্তা করে নিজের মান-মর্যাদাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে দিতেও রাজি হয়েছি। কারণ আমার বিশাল লক্ষ্যের কাছে আমার নিজস্ব এই ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত পরিচিতির মান-মর্যাদা থাকা বা না থাকা আমি কোনদিনই কোন ম্যাটার মনে করি নি। এখনো করি না।
আর ব্যক্তিগত জীবনে আমার বৈষয়িক জীবনের প্রতি বা টাকা-পয়সার প্রতি কোন লোভ নেই। ঢাকায় আমি যে বাসায় গত দশ বছর ধরে ভাড়া থাকি সেটিও আমার নিজের বাসা বলে বিরোধীরা খুব সোচ্চার থাকেন! তবে আমার একটা নেশা আছে, আর নেশাটা হচ্ছে, একটা লোক উন্নতি করুক, একটা জায়গা উন্নতি করুক, একটা বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতি করুক, এবং একটা দেশ উন্নতি করুক। আমার এই নেশার ছোঁয়া জাককানইবির গায়ে পরতে পরতে লেগে আছে।
যাঁরা শুরু থেকে আমার বিরুদ্ধে খেয়ে-না-খেয়ে লেগে আছেন, এবং আমি মেয়াদ শেষ করার পরও লেগে আছেন এবং বিভিন্ন্ভাবে আমার মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার নিরন্তর প্রচেষ্টায় আছেন, তাঁদের কাছে বিনয়ের সঙ্গে আমার একটি ক্ষুদ্র প্রস্তাব দিতে চাই। দেশে আরো ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আপনারা সেগুলি ঘুরে আসুন এবং গত চার বছরে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী উন্নতি হয়েছে এবং, কী শৃঙ্ক্ষলা ছিল সেটা দেখুন আর জাককানইবিতে গত চার বছরে কী কী হয়েছে সেটিও দেখুন। এই স্টাডিটা হওয়া দরকার। জাতি উপকৃত হবে।
আরো একটা অনু-প্রস্তাব আছে: আয়নাটা শুধু উপাচার্যের ওপর না ধরে নিজেদের ওপরও একটু ধরুন। আমাকে ভিলেন বানান, অসুবিধা নেই, কিন্তু আপনাদের হিরোইজমের তলানীতে যে ঝুরঝুরে বালি সেটিও খেয়াল করুন।
সবাই ভালো থাকবেন।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
মোহীত উল আলম
১৪ আগস্ট সকাল ৯টা, ২০১৭।
বি. দ্র.: যত রিপোর্টই আমার বিরুদ্ধে ছাপা হোক, আমি আর প্রতিবাদলিপি দেব না। এটাই শেষ এবং একমাত্র, এবং এটাকেই ভবিষ্যতের সবগুলো রিপোর্টের জবাব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ সময় ব্যয় করার শ্রেয়তর রাস্তাগুলো টিকে আছে বলে এখনো মানবসভ্যতা ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে।
ধন্যবাদ।









