সিটিজিবার্তাডেক্স, ১৬ সেপ্টেম্বর
ডেক্সরিপোর্ট
পৃথিবীর সব দেশে হনারেবেল কোর্ট শব্দটি উচ্চারিত হয় কারণ আপনার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যয়ের বিচার এখানে আপনি পাবেন। কিন্তু বিচার যদি হয় পাশবিক কিংবা অমানবিক তবে আপনি কোথায় যাবেন। কিছুটা এমনি অসহায় অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাজমুল হোসেন ওরফে নোয়েল ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে জানালেন তিনি এই ঘটনার বিচার চান সঙ্গে জানালেন সেদিনকার পাশবিক ঘটনাটিও। ডেক্স থেকে বিস্তারিত জানাচ্ছেন –জামাল আলম
ডেডলাইন ১২ আগস্ট ঃ
১২ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দাতিয়ারা এলাকার জান্নাত জেনারেল স্টোরে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে নিয়মিত চেকে আসে ভ্রাম্যমাণ আদালত। দোকানের রেফ্রিজারেটরে মাংস রাখা এবং আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে দোকানে বাতি জ্বালানোর অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতিস্টানের মালিক নোয়েলকে শাস্তি দেবার সীদ্ধান্ত নেয়। এসময় দোকানটি সীলগালা করে নোয়েলকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচতলার একটি কক্ষে নেওয়া হয়। পরে দরজা বন্ধ করে ‘শাস্তি পর্ব’ শুরু করা হয়। ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) নাজমুল আহসানের নির্দেশে আসামীকে প্রথমে আঙ্গুলের নখে তীক্ষ্ণ সূঁচ ঢুকিয়ে শাস্তি দেয়া হয় যতক্ষণ নোয়েল তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে কাবু হয়ে না পরে , এরপর লাথি আর লাঠি দিয়ে তাকে পেটানো হয়। এভাবে শারীরিক শাস্তি শেষে তাকে তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯ দিন কারাভোগ করে জামিনে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের এ অভিযোগ করেছেন নির্যাতনের শিকার দোকান মালিক নাজমুল হোসেন ওরফে নোয়েল।
বিচারক আসামীর পুর্ব পরিচিত ঃ
সংবাদ সম্মেলনে নোয়েল জানান, দাতিয়ারা এলাকায় প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের ডরমেটরির পাশেই তার দোকান। সেখান থেকে সরকারি কর্মকর্তারা বাকিতে নানা পণ্য কিনেন। অনেকেই তার দোকানে বসে চা খান। এই অবস্থায় কয়েক মাস আগে পাওনা টাকা (বাকি) নিয়ে এনডিসি নাজমুল আহসানের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। গত মার্চ মাসে তিনি এনডিসির কাছে পাওনা ১০টি সিগারেটের দাম চেয়েছিলেন। এতে এনডিসি নাজমুল ক্ষিপ্ত হন। তবে পরে তার দোকানে এসে পাওনা শোধ করেন। এরপর তার দোকান থেকে মালামাল নেওয়া বন্ধ করে দেন প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা।
গুজবে সর্বনাশ ঃ
কিছুটা কান কথার কারনে তিনি বলীর পাঁঠা হলেন সংবাদ সম্মেলনে এমনটাও উল্লেখ্য করলেন ভুক্তভোগী নাজমুল হোসেন নোয়েল।
তিনি জানান, কিছুদিন আগে ডরমেটরির সামনের পুকুরের পানিতে এনডিসি নাজমুল আহসানের ছেলে ডুবে যাচ্ছিল। পরে আনসার সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে। গত ১১ আগস্ট জেলা তথ্য অফিসার তারিক মোহাম্মদ দোকানে এসে এনডিসির ছেলের পানিতে পড়ার বিষয়টি সম্পর্কে তার কাছে জানতে চান।নোয়েল জানান, তিনি ওই কর্মকর্তাকে তখন বলেন, ‘ওই দিন আনসার সদস্যরা থাকায় স্যারের বাচ্চারা বেঁচে গেছে।’কিন্তু তথ্য কর্মকর্তা এনডিসির কাছে গিয়ে বলেন, নাজমুল নাকি তার সন্তানের মৃত্যু কামনা করেছে। এর জের ধরেই নোয়েলের ওপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে।
অসন্তুষ্ট এনডিসি ঃ
সংবাদ সম্মেলনে নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে নোয়েল বলেন, ‘দোকান থেকে আমাকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় এনডিসি নাজমুল আহসান আনসার বাহিনীর সদস্য সহিদুল হোসেনকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, ‘আমার বিষটা মজাইতে পারলাম না। অফিসে নিয়ে তাকে ভালো কইরা শায়েস্তা করবা। আমি তো পিটাইতে পারবো না।’
দোকানে থাকার সময়ই আনসার সহিদুল তাকে লাঠি দিয়ে পেটায়। যে কক্ষটিতে তাকে নির্যাতন করা হয় সেখানে জেলা তথ্য অফিসারও বসা ছিলেন।
আনসার সদস্য সহিদুল ওই কক্ষে নোয়েলের ওপর চড়াও হন। এসময় তার হাতে একটি সুঁচ ও ব্লেড ছিল।
বাম হাতের আঙ্গুলে সূঁচ ঢুকানোর সময় আনসার সহিদুল নোয়েলকে বলেন, ‘বল, তুই স্যারের ছেলের মৃত্যু কামনা করেছিস!’ নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নোয়েলের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিও আদায় করা হয়। ততক্ষণে তার চার আঙুলের নখের ভেতরেই সূঁচ ফোটানো হয়েছে।
নির্যাতন শেষে তথ্য অফিসার নোয়েলকে বলেন, ‘তুই আজ এখানে হওয়াতে রক্ষা পেয়েছিস। যদি ঢাকার মিরপুরে থাকতি তাইলে তোরে ন্যাংটা কইরা বাইড়াইতাম (পিটাইতাম)।’
এদিকে, নোয়েলের দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পর তার পরিবারের সদস্যরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করে নোয়েলের সন্ধান পান।
ঘটনাটি পরিবারের সদস্যরা তাদের আত্মীয়স্বজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের জানানোর পর তারা জেলা প্রশাসককে ফোন করেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেন। যাদের মধ্যে একজন সচিব এবং বিভাগীয় কমিশনার রয়েছেন। এরপর নোয়েলের বড় ভাই মোশাররফ হোসেন টিটো এবং ভাবী নারগিস বেগম একাধিকবার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
যে কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত
হনারেবেল ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রাপ্ততথ্য ঃ
সদর উপজেলা স্যানিটারি পরিদর্শক ছফিউর রহমান ভূঁইয়া নোয়েলের দোকান নিয়ে অভিযোগ দেন। তার অভিযোগ, নোয়েলের দোকানের রেফ্রিজারেটরে আইসক্রিম ও পানীয়ের সঙ্গে মুরগির মাংস ও কাঁচা মাছ মোড়কবিহীন অবস্থায় রাখা হয়েছে। এই অপরাধে ১২ আগস্ট নোয়েলের দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। এছাড়াও তিনি আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন।
এরপর দোকানে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৫২ ধারা মতে, সেবা গ্রহণকারী বা ভোক্তার জীবন বিপন্ন করার জন্যে তাকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মান ও বিএসটিআই-এর সিলবিহীন পণ্য ধ্বংস করা হয়। বিদ্যুৎ আইন-১৯১০ এর ৪২ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের জন্য বিদ্যুৎ বিতরণকারী কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া তার দোকানটি সিলগালা করা হয়। বাংলা ট্রিউবিন
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন গণমাধ্যমকে, ‘আমাকে এ ব্যাপারে সচিবসহ উচ্চপদস্থ অনেক সরকারি কর্মকর্তা ফোন করেছেন। আমি বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেই। কিন্তু তাকে নির্যাতন করা হয়েছে এমন তথ্য আমি কারও কাছ থেকে পাইনি।’
এভাবে মারধর করার কোনও সুযোগ ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেই বলেও জানান ডিসি।
ডিসি আরও বলেন, ‘আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) কাছ থেকেই এ ধরণের অভিযোগ প্রথম শুনলাম।’
স্বীকার ও অস্বীকার ঃ-
পুরো ঘটনার বিষয়ে জানতে চায়লে অভিযুক্ত অবশ্য আনসার সদস্য সহিদুল হোসেন সূঁচ ফোটানোর অভিযোগ অস্বীকার করলেও লাঠি দিয়ে পেটানোর কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘স্যারের নির্দেশেই পিটিয়েছি। আমার কী করার আছে?’
এ বিষয়ে সদর উপজেলা স্যানিটারি পরিদর্শক ছফিউর রহমান ভূঁইয়াকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি অভিযোগ দেইনি। আমাকে আদালতের প্রণব বাবু ফোন দিয়ে দাতিয়ারায় নিয়ে যান। গিয়ে দেখি এনডিসি স্যার আগেই ওই দোকানে উপস্থিত।’
ওই দিন দাতিয়ারা এলাকার আর কোনও দোকানে তারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেননি বলেও জানান তিনি।
এনডিসির বক্তব্য ঃ
অভিযোগের বিষয়ে নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) নাজমুল আহসানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এতদিন আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিলাম কোনও অভিযোগ ছিল না। কিন্তু আমি ঢাকায় আসার পর অভিযোগ কোথা থেকে আসলো।’
তিনি বলেন, ‘ওইদিন তাকে (নোয়েল) সবার সামনে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং কোর্টে এনে হেফাজতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
বাইরে কোথাও তাকে নির্যাতনের কোনও সুযোগ নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গাড়ি থেকে আদালতে নামানোর সময় সে নামতে পারছিল না বলে এক আনসার তাকে লাঠি দিয়ে একটা বাড়ি দিয়েছে। এর বাইরে তাকে পেটানো হয়নি।’
সূত্র – বাংলা ট্রিউবিন
অনি/এমকে
অনি/এমকে
Ctgbarta24.com 24 hours Online News Paper
