বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০১৫
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম ।।
শহিদুল্লাহ শাহরিয়ার ঃ তিন মাসের ডাটাবেজের ভিত্তিতে এক দিনের মধ্যেই আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করা সম্ভব। অথচ চট্টগ্রাম কাস্টমস দফতরের কর্মকর্তারা এর ধারে-কাছেও নেই। কিছু অসাধু কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতা, হয়রানি ও দুর্নীতির কারণে আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে চরম খেসারত দিতে হচ্ছে। পণ্যের আমদানি শুল্ক নির্ধারণে এ চক্রটি ১৫/২০ দিন পার করে দেয়ায় বন্দর ডেমারেজ দেয়াসহ উৎপাদনেও ক্ষতি হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, উচ্চ হারে আমদানি শুল্ক দেয়ার পরও এ রকম ক্ষতির দায় কে নেবে? সরকার, না কাস্টমস কর্তৃপক্ষ? তারা দাবি জানিয়েছেন, আমদানি শুল্ক নিয়ে সর্বোচ্চ দু’দিনের মধ্যে পণ্য ছাড় করতে ব্যর্থ হলে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির দায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তথা সরকারকেই নিতে হবে। এদিকে কেবল ডাটাবেজের নামে আমদানি পণ্যের মনগড়া শুল্কায়ন করেই নয়, (আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পণ্য শনাক্তকরণ কোড-হরমোনাইজড সিস্টেম) এইচএস কোডের ভুল ব্যাখ্যার ফাঁদে ফেলেও আমদানিকারকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা। অ্যাপ্রেইজার প্রিন্সিপ্যাল থেকে শুরু করে সহকারী কমিশনার (এসি), যুগ্ম-কমিশনার (জেসি) পর্যন্ত যাচ্ছে এই ঘুষের ভাগ। এভাবে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নেয়া লাখ লাখ টাকা নিতে রীতিমতো দিন শেষে ব্যাগ নিয়ে আসতে হয় কর্মকর্তাদের। চট্টগ্রামের আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট থেকে শুরু করে ভুক্তভোগী বিভিন্ন মহল যুগান্তরের কাছে এমন অভিযোগ করছেন।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের গ্রুপ-১ এ এইচএস কোডের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতানোর তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আমদানিকারক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, চিপস উৎপাদনে ব্যবহার হয় মিষ্টি আলুজাতীয় দুই কন্টেইনার পণ্য তিনি আমদানি করেন। যে পণ্যের এইচএস কোড ১১০৮১৪০০। কোড অনুযায়ী এই পণ্যের শ্রেণী হচ্ছে ‘নেটিভ টপায়োকা স্টার্চ।’ যার শুল্ক নির্ধারণ করা আছে ৫ শতাংশ। পণ্য ছাড়ের জন্য তিনি ইনভয়েসসহ আমদানির সমুদয় কাগজপত্র জমা দেন গ্রুপে। কিন্তু গ্রুপ থেকে বলা হয় আমদানিকৃত এই পণ্যের এইচএস কোড ১৯০৩০০০০। যার শ্রেণী ‘মেনিয়াক কাসাভা স্টার্চ।’ এই পণ্যের শুল্ক হার ১০ শতাংশ।
ওই আমদানিকারক অভিযোগ করেন, কোনোমতেই তার পণ্যটি ১০ শতাংশ ছাড়া শুল্কায়ন করছিলেন না কাস্টমস কর্মকর্তারা। এক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে মোটা অংকের টাকা তুলে দিলে ঘোষিত কোড অনুযায়ী ৫ শতাংশ শুল্কেই পণ্যটির অ্যাসেসমেন্ট বা শুল্কায়ন করা হয়। ওই গ্রুপের প্রিন্সিপ্যাল অ্যাপ্রেইজার হচ্ছেন জেএম আলী আহসান। এখানে সহকারী কমিশনার (এসি) হিসেবে আছেন মেহবুবুল হক।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে শুধু এরকম একটি গ্রুপের একটি পণ্যের ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতি হচ্ছে না, অধিকাংশ পণ্য ছাড়াতে গেলেই এভাবে আমদানিকারকদের পকেট কাটছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। অপর একজন আমদানিকারক অভিযোগ করে বলেন, মামলা জটিলতার কারণে কোনো কোনো এইচএস কোড ব্লক করা বা রেডমার্কে থাকে। এ কারণে এসব পণ্য আমদানি করলেও শুল্কায়ন করা হয় না। কিন্তু গ্রুপে ঘুষের টাকা দিলেই ভৌতিকভাবে সেই ব্লক কোড খুলে যায় এবং যথারীতি শুল্কায়ন করা হয়।
ওই আমদানিকারক জানান, সুপারি আমদানির শুল্কায়ন করতে তাকে ‘রেড কেনসেলেশন’ অর্থাৎ ব্লক করা কোড খুলে শুল্কায়ন করার জন্য গ্রুপে বড় অংকের ঘুষ দিতে হয়েছে। এভাবে অন্যান্য আমদানিকারকও কাস্টমস কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে আমদানিপণ্য ছাড় করতে হয়। কাস্টমস হাউসে বিভিন্ন গ্রুপে প্রতিদিন আমদানিপণ্য শুল্কায়নের শত শত ফাইল স্বাক্ষর হয়। প্রায় প্রতিটি ফাইলেই এভাবে কখনও এইচএস কোডের ভুল ব্যাখ্যার ফাঁদে ফেলে, কখনও নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রেখে লাখ লাখ টাকা আমদানিকারকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। পণ্য শুল্কায়নের এমন কিছু গ্রুপ আছে যেখানে ঘুষের রেট ও কালেকশন এতটাই বেশি যে, কর্মকর্তারা দিন শেষে ঘুষের টাকা পকেটে করে নিতে পারেন না, কাড়ি কাড়ি টাকা নেয়ার জন্য তাদেরকে রীতিমতো ব্যাগ ব্যবহার করতে হয়। আর প্রতিদিন ব্যাগ ভরে তারা ঘুষের টাকা নিয়ে বাসায় ফেরেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী যুগান্তরকে বিস্ময়কর এমন তথ্য দিয়েছেন।
এইচএস কোডের ভুল ব্যাখ্যার ফাঁদে ফেলে আমদানিকারকদের কাছ থেকে ঘুষ ও উৎকোচ আদায় এবং নানাভাবে হয়রানি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট এএএম মাহবুব চৌধুরী বুধবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, কাস্টমস কর্মকর্তাদের এ ধরনের দুর্নীতি ওপেনসিক্রেট। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এইচএস কোড দ্বারা প্রতিটি পণ্যের ধরন বলা যায়। কোনো কোনো পণ্য আছে যেগুলো একেবারে কাছাকাছি বা একই ধরনের পণ্য। সামান্য তারতম্যের কারণে কোডের ভিন্নতা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এইচএস কোডে ‘আদার্স’ একটি শব্দ লেখা থাকে। কাস্টমস কর্মকর্তারা এই ‘আদার্স’ শব্দটির অপব্যবহার ও প্রয়োগের মাধ্যমেও আমদানিকারকদের পকেট কাটেন। রীতিমতো কাস্টমসে নিয়োজিত বহিরাগত কর্মচারী বা ‘ফালতু’দের লেলিয়ে দেন ঘুষ বাণিজ্যের জন্য।
তিনি বলেন, আমদানিকৃত সব পণ্যের এইচএস কোড অনুযায়ী যদি কাস্টমস হাউস শুল্ক আদায় করত তবে শুল্ক আদায়ের পরিমাণ বহুলাংশে বেড়ে যেত। এখন তারা আমদানিকারকদের কাছ থেকে ঠিকই অতিরিক্ত হারে টাকা আদায় করেন, কিন্তু তার একটি বড় অংশ ঘুষ। তাই ঘুষের বিশাল টাকা সরকারি কোষাগারে না গিয়ে যাচ্ছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের পকেটে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউম আসলেই ঘুষের জমজমাট হাট। যে কারণে এখানে এমন কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই যে, তার আয়বহির্ভূত সম্পদ হিসেবে গাড়ি, বাড়ি ও একাধিক ফ্ল্যাট নেই। বাস্তবতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কাস্টমসে যারাই আসেন তাদের অধিকাংশই রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, নানা আইনি জটিলতা ও ভুল ব্যাখ্যার মারপ্যাঁচে পড়ে অনেক সময় আমদানিকারকের পণ্য আটকে দেয়া হয়। এবার এমনও দেখা যায়, রফতানিকারক যে পণ্যটি দেয়ার কথা সে পণ্যটি না দিয়ে অপেক্ষাকৃত নিুমানের বা অন্য কোনো কোডের পণ্য সরবরাহ করেছে।
রফতানিকারকের সেই ভুল কিংবা অপরাধের মাশুলও অনেক সময় দেশের আমদানিকারকদের গুণতে হয়। কাস্টমসের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা এসব অনাকাক্সিক্ষত সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমদানিকারকদের চরম মাত্রায় হয়রানি করে থাকেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ দরকার বলে তিনি সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।
অন্যদিকে কাস্টমসের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার এ ধরনের হয়রানির কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়াডার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক (বন্দর ও কাস্টমস) খায়রুল আলম সুজন বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আমদানিকারক যে পণ্য আমদানি করেন তার এইচএস কোড যদি ভুল হয় কিংবা এইচএস কোড অনুযায়ী পণ্য আমদানি করা হয়নি এমন সন্দেহ থাকে, সে ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ওই পণ্যের নমুনা সংগ্রহে রেখে পণ্যটি ছাড় করে দিতে পারে।
যদি পরীক্ষায় আমদানিকারকের ঘোষণার ব্যত্যয় পাওয়া যায় বা কাস্টমসের সন্দেহ ঠিক হয়ে থাকে তবে আমদানিকারক কে জরিমানা করতে পারে কাস্টমস। কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তারা নিজেদের ঘুষ-বাণিজ্য বহাল রাখার জন্য এইচএস কোডের ভুল ব্যাখ্যাসহ নানা অজুহাত দিয়ে আমদানিকারকদের পণ্য আটকে রেখে হয়রানি করে থাকেন, যা কোনো মতে মেনে নেয়া যায় না। অবিলম্বে এ অবস্থার অবসান হতে হবে। সূত্র-যুগান্তর
Ctgbarta24.com 24 hours Online News Paper
