ব্রেকিং নিউজ

ডাটাবেজের নামে আমদানি পণ্যের মনগড়া শুল্কায়ন

2_199195চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আমদানি পণ্যের ওপর মনগড়া শুল্কায়ন করার পথ বেছে নিয়েছে। সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে গ্রুপে রক্ষিত পণ্যমূল্যের তিন মাসের ডাটাবেজের ওপর ভিত্তি করে অযৌক্তিক শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন আমদানিকারকরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনি নির্ধারিত সময়ের বাইরে বন্দরে পণ্য পড়ে থাকায় গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের ডেমারেজ। অপরদিকে সময়মতো পণ্য ছাড় করতে না পারায় ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আমদানিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না।

এদিকে এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কাস্টমসের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা বেপরোয়া দুর্নীতিতে নেমে পড়েছেন। পণ্য শুল্কায়নের ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্মকর্তাদের যারা উৎকোচ দিয়ে ম্যানেজড করতে পারেন কেবল তারাই অপেক্ষাকৃত কম শুল্ক দিয়ে পণ্য ছাড়িয়ে নিতে পারছেন। আবার যারা ম্যানেজড না করে নিয়ম মেনে চলতে চান তাদের গুনতে হয় বাড়তি শুল্ক। এসব অসাধু কর্মকর্তার মনমর্জিমতো শুল্ক দিতে না চাইলে আমদানি পণ্য নানা অজুহাতে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়। এ অবস্থায় আমদানিকারকদের অনেকে বাধ্য হয়ে বেশি শুল্ক দিয়ে পণ্য ছাড় করছেন।

এ রকম অবস্থায় চট্টগ্রাম চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নেতারাসহ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরো পৃথিবী যেখানে এক সেকেন্ডে এখন হাতের মুঠোয় চলে আসছে সেখানে পণ্যের আমদানি মূল্য দেখার জন্য তিন মাসের ডাটাবেজ দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের পক্ষ থেকে বড়জোর তিন দিনের ডাটাবেজ দেখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একজন যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে ডাটাবেজ তথা পণ্যের আমদানি মূল্য দেখার জন্য কাস্টমসে একটি আলাদা সেল স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছেন তারা। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে রহস্যজনক কারণে শুরু থেকেই উদাসীন রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, বন্দর দিয়ে দৈনিক গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টি-ইউস (২০ ইউনিট স্কয়ার ফিট) পণ্য আমদানি হয়। আমদানি পণ্যের বিপরীতে সরকার আমদানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করে বিপুল অংকের রাজস্ব। কিন্তু এরপরও কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে আমদানিকারকদের নিত্যদিন হয়রানি করে থাকেন। একদিকে মনগড়া শুল্ক আদায়, অন্যদিকে পণ্য আটকে দিয়ে বন্দরের ডেমারেজ খড়গের নিচে চাপিয়ে দেন আমদানিকারকদের। এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সরকারের হস্তক্ষেপও কামনা করেন চট্টগ্রাম চেম্বার নেতারাসহ ভুক্তভোগী আমদানিকারকরা।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট এএএম মাহবুব চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, কাস্টমস তিন মাসের ডাটাবেজের ওপর ভিত্তি করে পণ্যের মনগড়া যে শুল্কায়ন করছে তা সামন্ত যুগের মতোই। এখন এক সেকেন্ডে যেখানে ওয়ার্ল্ড মার্কেটের চিত্র কম্পিউটারের বাটনে চাপ দিলে এসে যায়, সেখানে তিন মাসের ডাটাবেজ দেখার কোনো মানে হয় না। আমদানিকারক কোন দেশ থেকে পণ্য আমদানি করেছেন, সরবরাহকারী কে, পণ্যের আমদানিমূল্য কত ছিল- তার সবকিছুই আছে আমদানিকারকের জমা দেয়া ইনভয়েসসহ বিভিন্ন কাগজপত্রে। সে অনুযায়ী ইন্টারনেট বা ওয়েবসাইট ঘেঁটে তা যাচাই করা যায় মুহূর্তেই। তাই পণ্যের আমদানি মূল্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করেই তার ওপর শুল্কায়ন করাটাই হচ্ছে যথার্থ। তা না করে তিন মাসে গ্র“পের সর্বোচ্চ ও সর্বনিু ডাটাভেল্যু কত ছিল তা দেখে কাস্টমস কর্মকর্তারা নিজেদের মনগড়া শুল্ক নির্ধারণ করছেন। আর এটি করতে গিয়ে কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তারা দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন। তাদের যারা উৎকোচ দেন তাদের আমদানি পণ্যের শুল্ক কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। আবার যারা উৎকোচ দিতে রাজি হন না তাদের পণ্যের ওপর তিন মাসের ডাটাবেজের নামে বাড়তি শুল্কের ফাঁদ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ জটিলতা ও মারপ্যাঁচে পড়ে দেখা যায় অনেক সময় আমদানিকারক তার পণ্যটি যথাসময়ে ছাড়িয়ে নিতে পারছেন না। এতে করে যে কারখানার জন্য পণ্যটি আনা হয়েছে সে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়াসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে সব পণ্যের দাম ওঠানামা করে। এক মাস আগে পণ্যটি যে দামে কেনা হয়েছে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে সেই পণ্য যখন পৌঁছে তখন ওই পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে বা কমে গেছে বিশ্ববাজারে। এমনকি ঘণ্টায় ঘণ্টায় পণ্যের দামও ওঠানামা করে আন্তর্জাতিক বাজারে। অথচ চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আমদানিকারকের পণ্যের ইনভয়েস মূল্য না দেখে কথিত ডাটাবেজকে ভিত্তি করে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে শুল্কায়ন করে। এতে করে আমদানিকারককে গুনতে হয় বাড়তি শুল্ক।

সূত্র আরও জানায়, অপেক্ষাকৃত কম পণ্য আমদানি করে এমন আমদানিকারকরা অনেক সময় কাস্টমসের চাহিদামতো বাড়তি শুল্ক দিয়ে পণ্য ছাড় করে নিয়ে যায়। এরকম বাড়তি শুল্ক দেয়ার তথ্য ডাটাবেজে রক্ষিত থাকে এবং এটাকেই উদাহরণ হিসেবে দেখায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এটি করতে গিয়ে যারা বেশি ভল্যুয়মের পণ্য আমদানি করছেন সেসব আমদানিকারকের ওপর পড়ছে বাড়তি শুল্কের এ চাপ। তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ডাটাবেজের ভিত্তিতে অযৌক্তিক মনগড়া শুল্ক।

এ প্রসঙ্গে ফ্রেইটফরওর্ডার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক (বন্দর ও কাস্টমস) খায়রুল আলম সুজন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, ডাটাবেজ দেখে শুল্কায়নের নামে কাস্টমসে আমদানিকারকরা বহুমুখী হয়রানির শিকার হচ্ছেন। একদিকে পণ্য নিতে পারেন না তারা। অন্যদিকে বন্দর ও শিপিং লাইনের ডেমারেজ গুনতে হয়। এভাবে হয়রানির শিকারে পরিণত হয়ে অনেক কনটেইনার ভর্তি অনেক পণ্য বন্দরে মাসের পর মাস পড়ে থেকে নিলামে ওঠার উপক্রম হয়েছে।

ডাটাবেজ প্রসঙ্গে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বন্দর ও কাস্টমসবিষয়ক সম্পাদক ওবায়দুল হক আলমগীর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, ‘মূল্যবিধি মালা ২০০০’- এ বলা আছে, আমদানি পণ্য শুল্কায়নের ক্ষেত্রে তিন মাসের ডাটা ভেল্যু দেখে সর্বনিু ডাটাভেল্যু অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণ করার জন্য। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে তিন মাসের ডাটাবেজ দেখে সংশ্লিষ্ট পণ্যটি অধিকসংখ্যক আমদানিকারক যে মূল্যে আমদানি করেছেন ওই মূল্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক নির্ধারণ করে থাকেন। এটি করতে গিয়ে হয়তো কোনো কোনো কর্মকর্তা অসদুপায় অবলম্বন করতেও পারেন।

এ বিষয়ে জানার জন্য মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে বুধবার অফিস সময়ে ফোন করার জন্য বলেন।

তবে এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আজিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তিন মাসের ডাটাবেজের ভিত্তিতে শুল্কায়নের ব্যাপারে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের অনেকের ভিন্নমত আছে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, কিছু অসাধু আমদানিকারক সঠিক চিত্র বা আমদানি মূল্য কাগজপত্রে যথাযথভাবে উপস্থাপন করেন না। এ কারণে সংশ্লিষ্ট আমদানি পণ্যের তিন মাসের ডাটাভেল্যু দেখে সহনীয় শুল্ক আদায় করা হয়। তাও কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চেম্বার যদি ডাটাবেজ দেখার জন্য আলাদা সেল করার প্রস্তাব করে অবশ্যই কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যুগ্ম কমিশনার না হোক একজন সহকারী কমিশনারের নেতৃত্বে হলেও এমন সেল করার বিষয়টি ভেবে দেখবে। তা ছাড়া আগামী ১ জুলাই থেকে আমদানি পণ্যের অ্যাসেসমেন্টের ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ একটি আলাদা ফরম সরবরাহ করবে। আমদানিকারক তথা তাদের নিযুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট পণ্য মূল্যসহ যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত লিপিবদ্ধ করে পণ্যের অ্যাসেসমেন্টের সময় ওই ফরম জমা দেবে। সে অনুযায়ী পণ্যের শুল্কায়ন করা হবে। পণ্য ছাড়ের পরও যদি প্রমাণ পাওয়া যায় আমদানি পণ্যের প্রদত্ত দর বা অন্যান্য তথ্য সঠিক নয় বা অন্য কোনো ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে সে ক্ষেত্রে জরিমানা আদায় করা হবে।