বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৫
নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
উৎপল : জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত দেড় বছরে সাগরপথে অবৈধভাবে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার বাংলাদেশি পাচারের শিকার হয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
গত বছরের মতো এবারও বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে দাঁড়িয়েছে মানবপাচারের লাঘাম টানতে না পারা।
এরই মধ্যে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়াসহ উপকূলীয় বিভিন্ন স্থান থেকে মানবপাচারের জন্য দেশের কয়েকটি জেলা থেকে লোকজন আনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। শীত শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই তাদের সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানোর প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় ইতিমধ্যে দেশ ও দেশের বাইরে লুকিয়ে থাকা মানব পাচারকারীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
শীত মৌসুমকে বলা হয় কক্সবাজারের পর্যটন মৌসুম। আর এখন পাচারকারীরা বলে থাকেন শীতকাল হচ্ছে মানবপাচারের মৌসুম। শীতকে সামনে রেখে উখিয়া, টেকনাফ ও জেলার সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ফিরতে শুরু করেছে মানব পাচারকারীরা। তারা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেপ্তার এড়াতে যারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল, তারাও শীত মৌসুমকে সামনে রেখে এলাকায় ফিরছে। নেওয়া হচ্ছে সমুদ্রপথে মানবপাচারের ব্যাপক প্রস্তুতি।

সূত্রমতে, শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকায় মানব পাচারকারীরা এটিকে মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেন। কারণ দেশীয় ছোট ছোট নৌকায় উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। শীতের শান্ত সমুদ্রের এ সুযোগকে কাজে লাগাতে কক্সবাজারের দুই হাজারেরও অধিক পাচারকারী সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা আগের মতো নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দালালদের নিয়ন্ত্রণে এনে আবারও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মানবপাচার এখন শূন্যের কোঠায়। কোনো মতেই সমুদ্রপথে কাউকে পাচার করতে দেওয়া হবে না। এজন্য পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা খুব সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
কোস্ট গার্ড টেকনাফ স্টেশন কমান্ডার লে. জুলহাস ফায়সাল টেলিফোনে বলেন, শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকায় পাচারকারীরা ওই সময়কে বেছে নেয়। তাই আসন্ন শীত মৌসুমে আবারও সমুদ্রপথে মানবপাচারের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। সে লক্ষ্যেই কোস্টগার্ডের সদস্যরা প্রতিনিয়ত সমুদ্রে টহলের পাশাপাশি আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। বর্তমানে টেকনাফের বাহারছড়া, উখিয়ার ইনানী ও রামুর পেঁচারদ্বীপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কোস্টগার্ডের স্টেশন বাড়ানো হয়েছে। তার মতে, একমাত্র জনসচেতনতাই পারে সমুদ্রপথে মানবপাচার রোধ করতে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের শেষের দিকে কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় আদম পাচারের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১২ সালের দিকে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে এলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বিজিবি সদস্যরা।
পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে থাইল্যান্ড ৭০ এবং সীমান্তের কাছাকাছি মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলের জঙ্গলে পাচারকারীদের ২৮টি ক্যাম্পে ১৩৯টি কবরের সন্ধান পায় সে দেশের সরকার।
এরপর বাংলাদেশ সরকার নড়েচড়ে বসে। শুরু হয় মানব পাচারকারী দমনের অভিযান। প্রথম পর্যায়ে কক্সবাজারের শীর্ষ মানব পাচারকারী ধলু হোসেনসহ জেলায় ছয় মানবপাচারকারী পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। আর গ্রেপ্তার হয়েছে দেড় শতাধিক। এছাড়া কক্সবাজার জেলার তালিকাভুক্ত ও তালিকার বাইরে প্রায় দুই হাজার মানব পাচারকারী পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে যায়। সেই থেকে সমুদ্রপথে মানবপাচার শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
কিন্তু শীত মৌসুমকে সামনে রেখে সম্প্রতি তারা আবারও এলাকায় ফিরে মানবপাচারের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য মতে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে ৯৪ হাজার মানুষকে সমুদ্রপথে পাচার করা হয়। এ ছাড়াও চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত এ সংখ্যা ৩১ হাজার।
মানবপাচারের মৌসুম শুরুর বিষয়ে ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক টেলিফোনে রাইজিং বিডি এর এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত বছর মানবপাচার ইস্যুতে দেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষুণ্ন হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে এ বিষয়ে যেন নতুন করে কোন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে না পড়তে হয়, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে আমাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। আশা করছি, এবার মানবপাচারকীরা সেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘এক্ষেত্রে মিডিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মানবপাচার রোধ করা সম্ভব।’ সূত্র রাইজিং বিডি

One thought on “উপকূলে সক্রিয় হচ্ছে মানবপাচারকারীরা”