নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্ত২৪ডটকম
শুক্রবার, ৮ এপ্রিল ২০১৬ ১৫:৩৩ ঘন্টা
চট্টগ্রাম: বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে ঘিরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে চারজন নিহতের ঘটনার জন্য বিদ্যুতকেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়ক নাছির উদ্দিনকে দায়ী করে তার ফাঁসি দাবি করেছে গণ্ডামারা ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকাবাসী শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু শক্তি প্রদর্শন করতে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে এলাকার নিরিহ মানুষের উপর গুলি চালানো হয়েছে নাছিরের নির্দেশে।
ঘটনার পর থেকে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর কোন অভিযোগ না থাকলেও নাছিরের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের প্রতিবাদ হয়েছে বেশি। তার ফাঁসির দাবিতে এলাকার মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এমনকি ঘর থেকে বেরিয়ে নারীরাও তার ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দিয়েছে। এলাকাবাসী সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্পের মালিক এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের চেয়ে নিজেকে বেশি ক্ষমতাবান হিসেবে প্রকাশ করতেন নাছির। ডাকাত ও সন্ত্রাসী কিছু যুবক নিয়ে এলাকায় মহড়া দিতেন। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কম দামে জায়গা কিনে নিতেন নিজের নামে অথবা কোন স্বজনের নামে।
তারপর সেই জায়গা বিক্রি করেছেন এস আলম গ্রুপের কাছে। এভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে নাছির উদ্দিন। একাধিক মালিকের জায়গা একজনের কাছ থেকে কম দামে কিনে নিয়ে দলীল হাতিয়ে নেওয়া শুরু করেন। এছাড়া বিভিন্ন খাস জমি ও ঝামেলাপূর্ণ জায়গা দখল শুরু করেন। আর তা অনেক বেশি দামে বিক্রি করেছেন।
সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করতে নাছির স্থানীয় জামায়াতের চেয়ারম্যান মাওলানা আরিফ উল্লাহ, আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকে কাছে টানেন। অন্যদিকে প্রকল্পের সহকারী সমন্বয়ক করেন তার ভাতিজা ও দক্ষিণ জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক বদিউল আলম হিরণকে। চাচা-ভাতিজা মিলে এলাকায় জমি দখলে নেওয়ার মিশনে নামেন। অবশ্য এজন্য তারা প্রয়োজনীয় স্থানে টাকা খরচ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাছির উদ্দিন শুরুর দিকে এলাকায় প্রতি কানি(২০ গণ্ডা) জমি কিনেছেন মাত্র ৮ হাজার টাকা দরে। কিন্তু সেই জমি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিক্রি করেছেন ২ লাখ টাকা করে। এভাবে এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমির দামও বাড়তে থাকে। তবে প্রকৃত মালিকরা হয়েছেন বঞ্চিত।
প্রতারণা করে একদিকে একজন ব্যক্তি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন অন্যদিকে সাধারণ মানুষ হারিয়েছে ভিটেমাটি ও পেশা। বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই মূলত এলাকার বাসিন্দারা ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নাছির উদ্দিন এক সময় যুবলীগের সমর্থক থাকলেও পরে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়ান। তবে কৌশলী নাছির জামায়াতের কোন পদ পদবিতে থাকেননি। ছিলেন অর্থের যোগানদাতা হিসেবে। ফলে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নেতাদের বাগে আনতে পেরেছিলেন।
গত সোমবার (০৪ এপ্রিল) স্থানীয় হাজীপাড়া স্কুল মাঠে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে দুই গ্রুপের সমাবেশকে ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন।
এরপরও দুপক্ষের লোকজন সমাবেশস্থলে এলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে ইটপাটকেল ছুড়লে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়ে। এ সময় গ্রামবাসী, আনসার ও পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। তবে স্থানীয় লোকজনের দাবি, তারা ১৪৪ ধারা জারির বিষয়ে কিছুই জানতেন না। সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ৪ জন নিহত এবং ১১ পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়।
চারজন নিহতের পর থেকে উত্তাল হয়ে উঠে গণ্ডামারা। নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদ জানায় হত্যাকাণ্ডের। ফাঁসি দাবি করে প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক নাছিরের।
ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার(৫ এপ্রিল) সকালে স্থানীয় পশ্চিম গণ্ডামারা রহমানিয়া মাদ্রাসা মাঠে জড়ো হন হাজার হাজার নারী-পুরুষ। নাছিরের ফাঁসি দাবি করে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেয় সমাবেশে আগতরা।
বসতভিটা ও গোরস্থান রক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ও গণ্ডামারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী বলেন, সরকার জমি লিজ দেওয়ার আগেই দখল করে নিয়েছে ভূমিদস্যু নাছির। এস আলম গ্রুপের কাছে কানি হিসেব করে কাগজ দিলেও জমি দিতে পারেনি।
এখন জোরপূর্বক জমি নিতে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে হামলা চালিয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় আহত আবদুল্লাহ বাড়ির মরিয়ম বেগম বলেন, আমরা সমাবেশে যাইনি। ঘরে কাজ করছিলাম। এসময় নাছিরের ভাড়া করা সন্ত্রাসীরা ঘরে ঢুকে হামলা করে। তিনি বলেন, আমরা নাছিরের ফাঁসি চাই। তার জন্য এলাকায় বড় ক্ষতি হয়েছে।
একই বাড়ির বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালিক পক্ষ এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। নাছির উদ্দিন এলাকাবাসীর উপর অত্যাচার-নির্যানত চালিয়েছে। আমরা তার ফাঁসি চাই।
এদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সমন্বয়কারী নাছির উদ্দিন গত ২৪ মার্চ নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে বৈঠক করেন। সেখানে বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন গণ্ডামারাকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করবে। ওই হুমকির ১০ দিনের মাথায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা তিনটি মামলায় সাধারণ মানুষকে আসামি করা হলেও নাছিরের নাম না থাকায় বিস্মিত এলাকাবাসী। নাছিরকে গ্রেফতার করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায় ওই বৈঠকে স্থানীয় সংসদ সদস্য, বাঁশখালী থানার ওসিসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় লোকজন উপস্থিত ছিলেন। তবে সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান দাবি করেছেন হুমকি দেওয়ার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন নিয়ে দুই পক্ষ বাকবিতণ্ডার বিষয়টি তিনি লক্ষ করেছেন। এ বিষয়ে বাঁশখালী থানার ওসি স্বপন কুমার মজুমদার কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। সূত্র বাংলানিউজ

