নগরীতে ডবলমুরিং ও উপজেলায় শীর্ষে পটিয়া
শিক্ষাডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০১৬
এবার প্রাথমিক বৃত্তি প্রাপ্তির তালিকায় চট্টগ্রাম জেলার ১৪টি উপজেলার মধ্যে শীর্ষ স্থানে রয়েছে পটিয়া উপজেলা। আর মহানগরের ৬টি থানায় সবচেয়ে বেশি বৃত্তি পেয়েছে ডবলমুরিং থানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা।
২০১৫ সালের প্রাথমিক সমাপনীর ফলাফলের ভিত্তিতে গতকাল বৃত্তির এই ফল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় ১৪টি উপজেলা ও মহানগরের ৬টি থানাসহ চট্টগ্রাম জেলায় এবার প্রাথমিক বৃত্তি পেয়েছে মোট ৩ হাজার ৮৬০ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ট্যালেন্টপুল ১ হাজার ৭৫২ জন সাধারণ ২ হাজার ৪৮ জন ও ৬০ জন শিক্ষার্থী সম্পূরক বৃত্তি পেয়েছে।
গতবারের তুলনায় এবার বৃত্তির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন। চট্টগ্রাম জেলায় গতবার মোট বৃত্তির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১২৫টি। এর মধ্যে ট্যালেন্টপুল ৭৯১ সাধারণ ১ হাজার ২৯০ ও ৪৪টি সম্পূরক। আর এবার মোট বৃত্তির সংখ্যা চট্টগ্রাম জেলায় ৩ হাজার ৮৬০টি। কেবল বৃত্তির সংখ্যাই নয় একই সাথে বাড়ানো হয়েছে টাকার অংকও।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার থেকে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে ট্যালেন্টপুল ধারীরা প্রতিমাসে ৩’শ টাকা আর সাধারণ বৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা প্রতিমাসে ২২৫ টাকা করে পাবে। আগে ট্যালেন্টপুল ধারী শিক্ষার্থীরা মাসে ২০০ এবং সাধারণ বৃত্তি প্রাপ্তরা মাসে ১৫০ টাকা করে পেতো। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিন বছর প্রতি মাসে টাকা পাবে বৃত্তি প্রাপ্তরা। বৃত্তির সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ বাড়ানোর ফলে আরো বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী এর সুফল পাবে বলে মনে করেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপ পরিচালক মো মাহবুবুর রহমান বিল্লাহ।
তিনি বলেন বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর ফলে আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে। এটি খুবই ভালো একটি দিক। এর মাধ্যমে আরো বেশি সংখ্যক মেধাবী অথচ গরিব পরিবারের শিক্ষার্থীরা সুফল পাবে। আর মাসিক বৃত্তির টাকার অংক বাড়ানোয় এই টাকা বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত বছর পর্যন্ত ৫৫ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক এই বৃত্তি দেওয়া হলেও এবার দেওয়া হয়েছে মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুলে এবং ৪৯ হাজার ৫০০ জন সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে।
গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বৃত্তিপ্রাপ্তদের এই তালিকা প্রকাশ করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। এসময় মন্ত্রী বলেন, ঝরে পড়া রোধ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, মেধার স্বীকৃতি ও সুষম মেধা বিকাশের লক্ষ্যে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এই বৃত্তি দেওয়া হয়। এর ফলে সব শিক্ষার্থী বৃত্তি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারে এবং শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়।
গতবারের তুলনায় বৃত্তিপ্রাপ্তদের সংখ্যা সাড়ে ২৭ হাজার বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সংখ্যার পাশাপাশি বৃত্তির অর্থের পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। আগে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্তদের মাসে ২০০ টাকা করে দেওয়া হলেও এবার থেকে ৩০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্তদের মাসে ১৫০ টাকার পরিবর্তে ২২৫ টাকা করে দেওয়া হবে। এই পদক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই প্রাথমিক শিক্ষায় অবদান রাখবে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিন বছর বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা বৃত্তির টাকা পায়। আগে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার জন্য আলাদা পরীক্ষা নেওয়া হতো। কিন্তু ২০১০ সালে সমাপনী পরীক্ষা চালুর পর এর ফলের ভিত্তিতেই উপজেলাভিত্তিক প্রাথমিক বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। বৃত্তিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ বাড়াতে নীতিমালাও সংশোধন করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এদিকে নগরীতে বৃত্তি প্রাপ্তির তালিকায় এবারও শীর্ষ স্থান অটুট রেখেছে ঐতিহ্যবাহী কলজিয়েট স্কুল। প্রতিষ্ঠানটির মোট ৪৫জন শিক্ষার্থী এবার বৃত্তি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক মো:গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। এর মধ্যে ৪০ জন ট্যালেন্টপুল এবং ৫ জন সাধারণ। গতবার প্রতিষ্ঠানটির বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৯ জন। যার ২৫ জন ট্যালেন্টপুল, বাকি ৪ জন সাধারণ। তবে বৃত্তিপ্রাপ্তির সংখ্যা বিবেচনায় মহানগরীতে গতবার দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও এবার ছন্দপতন ঘটেছে কোতোয়ালী থানাধীন ডা.খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের। গতবার প্রতিষ্ঠানটির মোট ২৩ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেলেও এবার এ সংখ্যা ১৬ জন। এর মধ্যে ১২ জন ট্যালেন্টপুল আর সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে ৪ জন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হাসমত জাহান এ তথ্য জানিয়েছেন। গতবার বৃত্তি প্রাপ্ত ২৩ জনের মধ্যে ২০জন ট্যালেন্টপুল, বাকি তিনজন সাধারণ বৃত্তি পায় বলেও জানান তিনি। তবে এই থানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৃত্তির সংখ্যায় এবার এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ (বাওয়া)। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার মোট ২৬ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি অর্জন করেছে। এর মধ্যে ২২ জন ট্যালেন্টপুল এবং বাকি ৪ জন সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠান প্রধান আনোয়ারা বেগম। আর ডবলমুরিং থানাধীন সিটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে মোট ৫ জন শিক্ষার্থী এবার প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষিকা পূরবী চৌধুরী। এর মধ্যে ২ জন ট্যালেন্টপুল এবং বাকি তিনজন সাধারণ।
প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, বৃত্তি প্রাপ্তির সংখ্যার দিক দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে পটিয়া উপজেলা। পটিয়ায় ৩২৬ জন শিক্ষার্থী এবার বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ট্যালেন্টপুল ১৩৬ জন এবং ১৯০জন শিক্ষার্থী পেয়েছে সাধারণ বৃত্তি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মীরসরাই উপজেলা। মীরসরাইয়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এবার মোট ৩’শ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ট্যালেন্টপুল ৯২ জন সাধারণ ১৬০ ও সম্পূরক বৃত্তি পেয়েছে ৪৮ জন। অন্যান্য উপজেলাগুলোর মধ্যে (সাতকানিয়ায় ২৫৯ জন ট্যালেন্টপুলে ৯৯ সাধারণ ১৬০), (বাঁশখালীতে ২৪৯ জন ট্যালেন্টপুলে ১০৭ সাধারণ ১৩৬ সম্পূরক ৬), (রাউজানে ২১৭ জন ট্যালেন্টপুলে ৭৫, সাধারণ ১৪২), (রাঙ্গুনিয়ায় ২৩০ জন ট্যালেন্টপুলে ৮২, সাধারণ ১৪৮), (ফটিকছড়িতে ২৪৪জন ট্যালেপুলে ১২০ সাধারণ ১২৪), (সন্দ্বীপ উপজেলায় ২১৬ ট্যালেন্টপুলে ৬৮ সাধারণ ১৪৮), (আনোয়ারায় ১৩৭ জন ট্যালেন্টপুলে ৬৭ সাধারণ ৭০), (বোয়ালখালীতে ১৬৪জন ট্যালেন্টপুলে ৫২ সাধারণ ১১২), (লোহাগাড়ায় ১২৬ জন ট্যালেন্টপুলে ৬৮ সাধারণ ৫৮), (চন্দনাইশ উপজেলায় ১৭২জন ট্যালেন্টপুলে ৬০ সাধারণ ১১২), (হাটহাজারীতে ২০০জন ট্যালেন্টপুলে ১০০ সাধারণ ৯৪, সম্পূরক ৬ এবং সীতাকুন্ড উপজেলায় মোট ২০৫ জন শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুলে ৯৩ সাধারণ ১১২ বৃত্তি পেয়েছে।
অন্যদিকে মহানগরীর ৬টি থানায় শীর্ষে রয়েছে ডবলমুরিং থানার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এই থানায় ১১০টি ট্যালেন্টপুল ও ৬৪টি সাধারণসহ মোট ১৭৪জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। মোট ১৪২টি ট্যালেন্টপুলে ৭৮ সাধারণ ৬৪ বৃত্তি নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কোতোয়ালী থানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অন্যান্য থানার মধ্যে চান্দগাঁও ১৩৪টি ট্যালেন্টপুলে ৮৮ সাধারণ, পাঁচলাইশ ১৩৬টি ট্যালেন্টপুলে ১০২ সাধারণ ৩৪, বন্দর ১১৫টি ট্যালেন্ট ৮১ সাধারণ ৩৪ এবং পাহাড়তলী থানায় মোট ১১৪জন শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুলে ৭৪ সাধারণ ৪০ বৃত্তি পেয়েছে।
বৃত্তির ফল প্রকাশ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা বলেন, প্রাথমিক সমাপনী ফলাফল জেলা থেকে প্রকাশ করা হলেও বৃত্তির ফলাফল মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশ করা হয়। তাই কেবল ওয়েবসাইটে এই বৃত্তির ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীরাই বৃত্তি অর্জন করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা।

