রনিয়া রহিম: মাসিক বা পিরিয়ড খুবই সাধারণ একটি শারীরিক চক্র, আমাদের দেশে বা সমাজে আমরা যেটিকে নোংরা আর ট্যাবু বানিয়ে রেখেছি।
ইসলামকে সাধারণত প্রয়োজনের অধিক রক্ষণশীল বানিয়ে রাখি আমরা; উদারতা আর আধুনিকতার পরিপন্থী ধরে রাখি, – তার প্রভাব হয়তোবা কিছুটা এই মাসিক-সংক্রান্ত মনোভাবে এসে পড়ে।
তবে শুনুন হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একটি গল্প; একটি কিশোরীর সাথে তাঁর এই সময়ে কী সুন্দর করেই না তিনি আচরণ করেছিলেন, একটুও তাঁকে লজ্জা পেতে দেননি, বিব্রত করেননি, বরং পুরো ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়ে তাঁকে সহজ করে দিয়েছিলেন!
উমাইয়া বিনতে কায়েস (রাঃ) একবার বেশ অনেকের সাথেই হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথে যাত্রাপথে ছিলেন। ঊটে বসা ছিলেন তিনি, যেখানে আরো কিছু ব্যাগপাটরাও রাখা ছিলো। হঠাৎ ছোট মেয়েটি দেখেন সে ব্যাগে রক্ত লেগে গেছে – তাঁর প্রথমবারের মতো মাসিক হয়েছে, তিনি এখন কি করে সামলাবেন বুঝতে পারছেন না। এই ঘটনাগুলো বেশ বিব্রতকর হয়, বড়দের জন্যেও। অনেকেরই মাসের একটা নির্দিষ্ট সময়ে হয়, আগাম কিছু লক্ষণ ধরা দেয়, তাই প্রস্তুত থাকা যায়। কারো কারো বেলায় হয়না সেরকম, – আর বিশেষ করে প্রথমবার হলে পুরো ব্যাপারটা কিরকম অস্বস্তিকর হতে পারে একটা ছোট মেয়ের জন্য, তা কল্পনা করে নিতে আসলে নারী হওয়ারও প্রয়োজন নেই নিশ্চয়ই!
উমাইয়া (রাঃ) একটু সরে বসার চেষ্টা করলেন যেন ব্যাগের রক্ত কারো চোখে না পড়ে, বিশেষ করে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর চোখে, যিনি সেখানেই ছিলেন। কিন্তু তিনি ঠিকই দেখে ফেললেন, আর বললেন, “তোমার বুঝি পিরিয়ড হয়েছে?” মেয়েটি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ”। মহানবী (সাঃ) রাগ বা বিরক্ত তো হলেনই না, বরং খুব সহজভাবেই বললেন, “যাও, নিজের খেয়াল আগে রাখো; তারপর ব্যাগটাকেও ধুয়ে দিও। তারপর আবার এখানেই ফিরে এসো।” – তিনি তাঁকে তাড়িয়ে দিলেন না, বা নোংরা ভেবে সরিয়ে রাখলেন না। যেখানেই শুরুতে ছিলেন উমাইয়া (রাঃ), তাঁর স্থানটা সেখানেই তিনি রেখে দিলেন।
যাত্রাপথের শেষে,- তাঁরা যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন, সেই যুদ্ধজয়ের পর, – হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরেকটি কাজ করলেন। তিনি উমাইয়া বিনতে কায়েস (রাঃ)কে উপহার স্বরূপ একটি মালা দিলেন, নিজ হাতে তা পরিয়েও দিলেন, যা সারাজীবন এই মেয়েটি পরে তো ছিলেনই, তাঁর দাফনও যেন এই মালাটির সাথে হয়, এই অনুরোধ করে গিয়েছিলেন। যে যাত্রাপথের স্মৃতি এই মেয়েটির জন্য ভীষণ বিব্রতকর হতে পারতো তাঁর মাসিকের রক্ত এভাবে জনসম্মুখে চলে আসায়, -তাও আবার স্বয়ং মহানবী (সাঃ)-এর সামনে!- তা বরং তাঁর জন্য আজীবনের খুব প্রিয় একটি স্মৃতি হয়ে থাকলো নবীজি (সাঃ)-র সংবেদনশীল আচরণের জন্য।
~ আপনারা যারা ইসলাম-ধর্মে বিশ্বাসী, আর ধর্মীয়-বিশ্বাসের ভিত্তিতে নিজের ভাবনা, কথা আর আচরণ নির্মাণ করেন, এর চাইতে সুন্দর আর স্পষ্ট উদাহরণ আপনাদের কাছে আর কিছু হতে পারে কি?🙂
[ Reference: Nadwi, M. K. 2007. Al-Muhadithaat: The Women Scholars in Islam. London and Oxford: Interface Publications, pp. 59 ]
রনিয়া রহিম: ফেইসবুকে গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য সুপরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সত্য গল্প সংরক্ষনে তার অবদান প্রশংসনীয়।

