বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
সাইফুল্লাহ সাদেক : নিয়মিত ছাত্র, পরিচ্ছন্ন, মেধাবী এবং ত্যাগীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছে, বললেন কেন্দ্রীয় নেতারা। সদ্য ঘোষিত কমিটিতে সহ-সভাপতি, প্রচার সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক, উপ-সম্পাদক ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া নেতারা বলছেন, ‘ছাত্রলীগ উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ এবং প্রাচীন সংগঠন। এতো বড় সংগঠনে সব নেতাকর্মী এক রকম হয় না। কিছু তুচ্ছ অভিযোগ বাদে এবারের কমিটিকে বিতর্কের উর্ধে রাখতে হবে’।
তারা বলছেন, পৃথিবীতে কোন কিছুই পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত নয়। আর রাজনীতিতে বিতর্ক থাকেই। ভালো-মন্দ, অভিযোগ-অনুযোগ-তর্ক-বিতর্ক এসব নিয়েই ছাত্ররাজনীতি এগিয়ে যাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে’-দাবী ছাত্রলীগ নেতাদের।
পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পরদিন, ২৩ফেব্রুয়ারি দেশের প্রথম সারির একটি দৈনিকে প্রকাশিত ছাত্রলীগের ভাষায় ‘বিতর্কিত’ সংবাদের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় নেতারা এমন দাবী করলেন।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের দীর্ঘ সাত মাস পর ২২ফেব্রুয়ারি, সোমবার সন্ধ্যায় পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটি ২০১সদস্য বিশিষ্ট হওয়ার কথা থাকলেও এবার ৩০১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হয়েছে, যেটিকে কেন্দ্রীয় নেতারা যুগের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তন বলে জানালেন। এর জন্য ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রও সংশোধনের প্রক্রিয়াধীন বলছেন তারা। ঘোষিত কমিটিতে সহ-সভাপতি পদে রাখা হয়েছে ৬১ জনকে, আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাখা হয়েছে ১১ জন করে। এ ছাড়া ১১১ জন উপ-সম্পাদক, ৪৬ জন সহ-সম্পাদক রাখা হয়েছে। এখনো সদস্যদের তালিকা প্রকাশিত হয়নি।
এদিকে কমিটি ঘোষণার পরের দিন ‘ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অছাত্র এবং বিতর্কিতরা’-শিরোনামে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়, ইয়াবা ব্যবসা, অপহরণ, হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আছে এমন নেতারাও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন।
পত্রিকাটি বলেছে, পূর্ণাঙ্গ কমিটির সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে এখন কেউ আর নিয়মিত ছাত্র নন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ‘সুপার ফাইভ’ কমিটির মতো পূর্ণাঙ্গ কমিটিও কথিত ‘সিন্ডিকেটের’ বাইরে যেতে পারেনি’।
আবার অনেক জ্যেষ্ঠ এবং ত্যাগী নেতা এবারের কমিটির কোন পদ পাননি, যাদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন নেতা পদ পেলেও ‘নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী স্থান পাননি এবং তার অনুসারীরাও বঞ্চিত হয়েছেন’-এধরনের মন্তব্য করেন অনেকে।
নাম গোপন রাখা পদ না পেয়ে অনেকের অভিযোগ, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের ঘনিষ্ঠভাজন অনেকে নিষ্ক্রিয় থেকেও পদ পেয়েছেন। বিরাগভাজন হওয়ায় দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও বাদ পড়েছেন কেউ কেউ’। এসব অভিযোগকে পাত্তা দেননি সদ্য ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি(দ্বিতীয়) এরশাদুর রহমান চৌধুরী।
পত্রিকায় বিতর্কিত সংবাদ এবং বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে গত কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা এই নেতা বলেন, অনেক দেরিতে হলেও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেই ছাত্রলীগের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগ এবং বিতর্ক থাকার কারণে অনেক কমিটিতে স্থান পায়নি। পরিচ্ছন্ন, ত্যাগী এবং নিয়মিত ছাত্ররাই কমিটিতে স্থান পেয়েছে। নতুনদের নিয়ে ছাত্রলীগ তার অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে এমনটাই বিশ্বাস ছাত্রলীগের ত্যাগী এই নেতার।
‘কিছু মিডিয়া মূলত নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে থাকে। ছাত্রলীগকে নিয়ে বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করলে তারা একটি গোষ্ঠীর বাহবা লাভ করে। কিন্তু ছাত্রলীগ এসব সংবাদকে পাত্তা দেয় না বললেন, সদ্য ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করা সাইফুদ্দিন বাবু।
তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যতিক্রম বাদে অতীতের চেয়ে অধিকতর পরিচ্ছন্ন এবং যোগ্য ছাত্রদের নিয়েই এবারের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হয়েছে বলে আমি মনে করি’।
এবিষয়ে দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা এবারের কমিটিকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে পরিচ্ছন্ন এবং মেধাবীদের কমিটি বলে মন্তব্য করে পত্রিকায় প্রকাশিত ছাত্রলীগ নিয়ে বিরুপ সংবাদের প্রতিবাদ জানান।
তিনি বলেন, ‘এবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের মধ্যদিয়ে স্বচ্ছ রাজনীতির ধারা শুরু হয়। এই কমিটিতে প্রকৃত ছাত্র, যাদের বয়স ২৯ বছরের নিচে, ভালো ইমেজের ছাত্রদেরকে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে যে বিরুপ সংবাদ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এর তীব্র নিন্দা জানাই’।
সাংবাদিকরা সঠিক তথ্য জেনে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ জাতির সামনে তোলে ধরবেন বলে বিশ্বাস করেন তিনি। নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব সততার সাথে পালন করবেন জানিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ না করে, ছাত্রলীগের সকল ভালো কাজের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান শাহজাদা। ।
সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে বুত্তিবৃত্তিক ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচয় পাওয়া সদ্য ঘোষিত কমিটির অন্যতম সহ-সভাপতি সৈয়দ আশিকের সাথে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তরুণ এই বঙ্গবন্ধু গবেষক এবং লেখক বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অনেক বড় একটি সংগঠন। এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে। সবাই পদ পায় না, সেটি সম্ভবও নয়। এক্ষেত্রে মেধা-যোগ্যতা, সততা, দলের জন্য ত্যাগ এবং দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সৈয়দ আশিক মনে করেন, যারা পদ পায়নি তাদের এমন মনে করার কারণ নেই যে, তারা কমিটিতে নেই, ছাত্রলীগে নেই। তারাও ছাত্রলীগের সহযোদ্ধা, সেবক এবং শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে সবসময় থাকবে। ছাত্রলীগে প্রত্যেকর মেধাশ্রম, সততা এবং ত্যাগকে মূল্যায়ন করা হয়।
ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে পত্রিকায় বিরুপ সংবাদ সম্পর্কে গত কমিটির সাবেক এই শিক্ষা সম্পাদক বলেন, কোন পত্রিকা কুরআন-হাদিস নয়। তাদের কাছে মনে হতে পারে, এই লোকটি খারাপ। আর একটি পত্রিকার মনে হতে পারে ঐ লোকটি ভালো। এটি ঐ পত্রিকার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। আর যদি কারো বিরুদ্ধে আইন-আদালত এবং থানা কর্তৃক সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে সেটি এক জিনিস। তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
তিনি বলেন, অভিযোগের খাতিরে এখন অনেকের নাম বলা হয়, অনেককে পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এতো বড় একটি সংগঠন যে, এসব বিচ্ছিন্ন অভিযোগকে মূল্যায়ন করার বা গুরুত্ব দেয়ার সময়-সুযোগ নেই।
৩০১সদস্য বিশিষ্ট কমিটি সম্পর্কে সৈয়দ আশিক বলেন, মূলত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২৫১জনের কমিটি হওয়ার কথা। এখন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে গঠনতন্ত্র সংশোধনের কাজ চলছে। আমাদের সর্বোচ্চ নেত্রী, অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনা করেই ৩০১সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে সময়। আগে বাংলাদেশের জনসংখ্যা কম ছিলো, ছাত্র সংখ্যা কম ছিলো। এখন সবকিছু বেড়েছে। সময়ের প্রেক্ষিতে কমিটির পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিছু পদ প্রকাশিত হয়েছে, আর কিছু প্রকাশিত হবে।
এসব নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান ছাত্রলীগ অধিকতর পরিচ্ছন্ন। এখানে বয়স, বিবাহিত, চাকরিজীবী; এসমস্ত বিষয়গুলো বিচার করা হয়। একারণে ছাত্রলীগ অনেক বেশি ক্রিয়েটিভ, অনেক বেশি পরিশ্রমী। একঝাঁক তরুণমুখ এবং সবাই নিয়মিত ও মেধাবী ছাত্র। এই মেধা এবং শ্রমকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সুন্দর এবং সাবলীলভাবে এগিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস সৈয়দ আশিকের|

