ব্রেকিং নিউজ

ওমরাহ’র নামে মানবপাচার : শীর্ষে হাবনেতাদের এজেন্সি

বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৫

মানব পাচার

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম নিউজ ডেস্ক ঃ পবিত্র ওমরাহ হজ পালনের নামে সৌদি আরবে মানবপাচারের অভিযোগ উঠেছে ১০৪টি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে। এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন খোদ হজ এজেন্সির মালিকদের সংগঠন হাবের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ নেতা এবং তাদের স্বজনেরা।

সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে ১০ আগস্ট বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়কে ১০৪টি হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ এনে চিঠি দিয়েছে। পবিত্র ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরব গিয়ে অভিযুক্ত এসব এজেন্সির ১১ হাজার ৪৮৫ জন আর দেশে ফেরেননি। এ কারণে কয়েক মাস আগেই বাংলাদেশের ওমরাহ ভিসা বন্ধ করে দেয় সৌদি সরকার। এতো দিন হাব নেতাদের মানবপাচারে জড়িত থাকার বিষয়টি গোপন ছিল। কিন্তু এখন তা সামনে চলে আসায় রীতিমত আলোড়ন তৈরি হয়েছে।

মানবপাচারের অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. শহিদুজ্জামানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। তদন্ত কমিটির প্রথম বৈঠক মঙ্গলবার সকালে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। অভিযুক্ত ১০৪ এজেন্সিকে দুই ভাগে ভাগ করে ১ ও ৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটির কাছে হাজিরা দিতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ওমরাহ ভিসা বন্ধ করে দেওয়ার পর বাংলাদেশে ফেরত না আসাদের সংখ্যা এবং এজেন্সি সম্পর্কে সৌদি আরবের হজ মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য চাওয়া হয় মক্কা-মুকাররমের বাংলাদেশ হজ কল্যাণ অফিস থেকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ আগস্ট দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১০৪টি এজেন্সির নাম উল্লেখ করে তাদের পাঠানো ফিরে না আসাদের একটি তালিকা পাঠায়। এতে দেখা যায়, ওমরাহ ভিসা নিয়ে দেশটিতে যাওয়া ১১ হাজার ৪৮৫ জন ফেরত আসেনি।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো ওই চিঠিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়। ওই তালিকার মধ্যে হাবের বর্তমান ও সাবেক মিলে ২০ জনেরও বেশি নেতা ও তাদের স্বজনদের এজেন্সির নাম রয়েছে। এর মধ্যে হাব সভাপতি ইব্রাহিম বাহারের মেগাটপ ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল (প্রা.) লিমিটেডের পাঠানো ৬৭ জন, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হেলাল উদ্দিনের মুনা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেডের ২১৮ জন, ভাইস প্রেসিডেন্ট ফরিদ আহমেদ মজুমদারের গোল্ডেন বেঙ্গল ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস’র ৪৫১ জন, মহাসচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সনজরী ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস’র ৬৫ জন, হাবের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বর্তমানে আটাবের নেতা আব্দুল কবির খান জামানের বলাকা ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস এবং তার ভাড়া করা মেরিডিয়ান এয়ার সার্ভিসের ৭০ জন এবং তার স্ত্রী নাজনীন সুলতানার সাদ এয়ার ইন্টারন্যাশনালের ৬১ জন, হাবের সাবেক সভাপতি জামাল উদ্দিন আহম্মদের মালিকানাধীন লাব্বাইক ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস এবং তার ছোট ভাই কাউছার উদ্দিনের নামে লাইসেন্স করা লাব্বাইক ওভারসিজের ২০৫ জন, সাবেক সহ-সভাপতি আফতাব উদ্দীন চৌধুরীর মালিকাধীন আফতাব ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরসের ২৪৩ জন, হাবের বর্তমান ইসি মেম্বার আফতাব আহমেদ চৌধুরীর আফতাব ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস’র ২৪৩ জন, যুগ্ম সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন কামালের হাশিম এয়ার ইন্টারন্যাশনাল’র ১৯ জন, ইসি মেম্বার খাদেম দুলালের খাদেম এয়ার সার্ভিসের ৯৪ জন, মো. ইলিয়াসের গোল্ডেন বেঙ্গল ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস’র ১০৬ জন, ইসি মেম্বার আবদুল মালেকের সবুজ বাংলা ইন্টারন্যাশনাল’র ৭২১ জন, আবু বক্কর সিদ্দিকের আল নূর ইন্টারন্যাশনাল ট্রভেলস এজেন্ট’র ২৩৭ জন, হাবের ইসি সদস্য সৈয়দ গোলাম সারোয়ারের চ্যালেঞ্জার ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস এবং তার স্ত্রী কানিজের নামে কানিজ ট্রাভেলসের ২৮ জন, সাবেক ইসি সদস্য মাওলানা ফজলুর রহমানের মালিকানাধীন মদিনা ট্রাভেলস লিমিটেডের ৬৩ জন, ড. কাজী কামালের লর্ড ট্রাভেলসের ৭৭ জন, ওলিউর রহমানের স্টার হলিডেজের ৩৮ জন ও খাদেম দুলালের নামে খাদেম এয়ার সার্ভিসের ৯৫ জন, আটাবের বর্তমান সভাপতি সুরেশ্বর ট্রাভেলসের ৭৪ জন, আটাব চট্টগ্রাম জোনের সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলমের মালিকানাধীন গালফ ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস’র ১৪১ জন, অপর নেতা জাফর আহমেদের কনকর্ড ইন্টারন্যাশনালের ৩১৪ এবং ইলিয়াছের মালিকাধীন গোল্ডেন বেঙ্গল ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস’র (চট্টগ্রাম) ৪৫১ জন, মাওলানা জাকারিয়ার আল আরাফা ওভারসিজের ৭৫ যাত্রী ফিরেনি বলে তালিকায় নাম রয়েছে।

তালিকার বিষয়টি স্বীকার করে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব চৌধুরী বাবুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘হজ কাউন্সিলর ও সৌদি আরবের বাংলাদেশ এ্যাম্বাসির কাছ থেকে সব মিলিয়ে ১০৪টি এজেন্সির নাম পেয়েছি। এসব এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো- ওমরাহ করতে পাঠানোর পর তাদের অনেকেই দেশে ফিরে আসেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. শহিদুজ্জামানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তাদের খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে খুব তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তালিকায় হাবের শীর্ষ নেতাদের নামও রয়েছে— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, ৫-৭ শীর্ষ নেতার এজেন্সির নামও রয়েছে।’

এ ব্যাপারে হাব সভাপতি ইব্রাহীম বাহারকে বার বার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে, হাবের মহাসচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ১০৪টি এজেন্সির যে তালিকা মন্ত্রণালয়ে এসেছে তা সৌদি সরকারের নয়। এটি হাবের মতই সে দেশের একটি বেসরকারি এসোসিয়েশন মোয়াসাসা অফিসের। এর আগে তারা ৮০টি এজেন্সির তালিকা দিয়েছিল, এখন আবার ১০৪টি এজেন্সির তালিকা দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. শহিদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন একই মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (হজ) নাসির উদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব কাজী নাজির হোসেন, ধর্মমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ড. মো. আবুল কালাম আজাদ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব নায়েব আলী মণ্ডল। মঙ্গলবার সকালে তদন্ত কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সূত্র জানায়, সভায় অভিযুক্ত ১০৪টি এজেন্সির মালিকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তদন্ত কমিটি। প্রথম দফায় ১ সেপ্টেম্বর ৫২টি এজেন্সিকে এবং বাকিগুলোকে৩ সেপ্টেম্বর ডাকবে কমিটি। সংশ্লিষ্ট এজেন্সি যদি তাদের প্রেরিত লোক দেশে ফেরার বিষয়ে প্রমাণ দিতে না পারে তাহলে ওমরার নামে মানবপাচারের অভিযোগে তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

এ ব্যাপারে কমিটির প্রধান মো. শহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার প্রথম বৈঠক শেষ করেছি। ১০৪ এজেন্সিকে তলব করা হচ্ছে। আগামী ১ ও ৩ সেপ্টেম্বর পর্যায়ক্রমে আমরা তাদের সঙ্গে বসবো। অভিযোগ অনুযায়ী তারা তাদের লোক দেশে ফিরে আসার যাবতীয় তথ্যসহ প্রমাণ দেবে। বিশেষ করে অনলাইনে তার প্রমাণ দেখাতে হবে।’