স্বপ্ন সাহস অঙ্গিকার
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, লাইফ স্টাইল : ‘করিতে পারি না কাজ, সদা ভয়, সদা লাজ,/ সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,/ পাছে লোকে কিছু বলে।/ আড়ালে আড়ালে থাকি, নীরবে আপনা ঢাকি/ সম্মুখ চরণ নাহি চলে,/ পাছে লোকে কিছু বলে।’
আশপাশের মানুষের কথার ভয় এভাবেই লিখেছিলেন কবি কামিনী রায়। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এ আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন উচ্চবিত্ত পরিবারের দুই সন্তান তাজুল ইসলাম লিখন ও তাহমিনা রহমান কথা। তরুণ প্রজন্মের অংশীদার এ দু’জন আরাম-আয়েশের জীবনযাপনকে ভুলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে নেমেছে রাস্তায় ‘আপনারে করিতে জয়’।
জীবিকা অন্বেষণে কোরিয়া গিয়েছিলেন লিখন। সেখান থেকে ফিরে লিখন চালু করেন তার স্বপ্ন অভিযাত্রা এবং নাম রাখেন ‘ড্রিম ভ্যান’। লিখনের ভ্যানগাড়িতে রাজ্যের সামগ্রী। নিজেই সেসব সামগ্রী ফেরি করে বেড়াচ্ছেন রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডিতে। লিখনের ঘটনাটা জেনে সাহসী হয়েছেন কথা। গলায় বাদামের ঝুড়ি নিয়ে নেমেছেন পথে। আর দু’জনেরই বক্তব্য, কোনো কাজ করতেই লজ্জা নেই। তাদের সাহস থেকে আর কেউ যদি স্বপ্ন দেখে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করে, তাহলেই তাদের সার্থকতা।
রোববার বর্ষণমুখর বিকেলে ধানমণ্ডির ১৫ নম্বরের সড়কে কথা হয় লিখনের সঙ্গে। কালো গেঞ্জির ওপর বোতাম খোলা শার্ট আর ন্যারো জিন্সের সঙ্গে হাইনেক বুট। দাড়ির ফাঁক গলে উজ্জ্বল হাসিটা চোখে পড়ল। স্বপ্ন তার চোখে-মুখে। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি লিখন। বৃষ্টির কারণে আমার ড্রিম ভ্যান ঘরে বন্দি।’ চায়ের কাপের ধোঁয়ার সঙ্গে শুরু করলেন গল্প, ‘কোরিয়াতে আমি সরকারিভাবে গিয়েছিলাম। প্রথম দিকে কিছুটা নিম্নশ্রেণীর কাজ করলেও পরে ভালো চাকরিই পাই। টাকাপয়সাও খারাপ পাচ্ছিলাম না। পরিবারের সদস্যরাও চাচ্ছিলেন সেখানেই থেকে যাই। কিন্তু দেশের বাইরে থাকতে আমার ভালো লাগছিল না। তাই ফিরে আসি। এসে কিছু সম্পত্তি কিনি। কিন্তু কিছু একটা তো করতে হবে, এমন ভাবনা থেকে মাস ছয়েক আগে ড্রিম ভ্যানের পরিকল্পনা করি। গত পাঁচ মাস আমি নিজেই ভ্যান চালিয়ে বেচাকেনা করছি।’
কী আছে ভ্যানে? জানা গেল সহজেই। থরে থরে সেখানে সাজানো গোল কলারের টি-শার্ট, কলেজ ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্ট, সানগ্গ্নাস, টুপিসহ আরও হরেক জিনিস। আছে বেশ দামি ক্যাকটাসও। লিখন বললেন, ‘১৫ হাজার টাকায় ভ্যান কিনেছি। আরও ১৫ হাজার টাকার পণ্যসামগ্রী। এ নিয়েই আমার ড্রিম ভ্যান। বৃষ্টির দিন বাদে প্রতিদিনই যা ধানমণ্ডি ১৫ থেকে শংকর পর্যন্ত চলাচল করে।’ তিনি জানালেন, প্রতিদিন যা বিক্রি হয়, তাতে বেশ চলে যায় তার।
লিখনের বয়স এখন ৩০। জন্ম ফরিদপুরে। দুই বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন। ২০০৯ সালে মাকে হারানোর পর একা হয়ে পড়েন লিখন। ২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান। ৫ বছর পরে দেশে ফিরে ঢাকায় দুটি প্লট ও কক্সবাজারের ওশান গার্লে একটি ফ্ল্যাট কেনেন। পরিবারের সবাই উচ্চবিত্ত। রয়েছেন সমাজের উচ্চ পর্যায়েও। কিন্তু দেশে ফিরে স্বাধীনচেতা লিখন রাজপথে ফেরির কাজই বেছে নেন।
লিখন বলেন, ‘এ দেশে প্রচুর বেকার রয়েছে। কোনো কাজই আমার কাছে ছোট না। যদি সেটাকে ভালোবেসে করা যায়। অনেকেই বেকার হওয়ায় অসৎ পথ বেছে নেয়। তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, খারাপ কাজ না করে রাস্তায় বাদাম বিক্রি করেন। বিশ্বাস করুন, ভালো লাগবে। বিদেশে গিয়ে যদি আমরা সব ধরনের কাজ করতে পারি, তাহলে দেশে কেন না? আমার পরিবারের সদস্যরাও আমাকে সমর্থন করছেন।’
বেকার যুবকদের অনেকেই এখন তার কাছে পরামর্শ নিতে আসে জানিয়ে লিখন বলেন, “অনেকেই আসে, পরামর্শ নেয়। কিন্তু ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এ ভেবে সরে যায়। ইতিমধ্যেই আমার থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরে তাহমিনা রহমান কথা নামে একটি মেয়ে বাদাম বিক্রি করছে। এভাবেই সবাই যদি লজ্জা ভেঙে এগিয়ে আসতে পারে, তাহলে দেশ থেকে ছিনতাই-রাহাজানির মতো অপরাধও কমে আসবে।” তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশ থেকে ফিরে অনেকেই সব সঞ্চয় দিয়ে ব্যবসায় নামে, না জেনেশুনে। তাদের উদ্দেশে বলব, অল্পস্বল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করেন। যাতে ব্যর্থ হলে আবার দাঁড়িয়ে যেতে পারেন।’
বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ত্রিচক্রযান ছুটল ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরে। সেখানে কথার সঙ্গে কথা হবে বলে তাড়া। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুক্ষণ পরে এসে নামলেন তিনি। এসেই ব্যস্ত ঘরে ভেজে আনা বাদাম নিজের তৈরি করা প্যাকেটে ভরতে ভরতে শুরু করলেন গল্প। চোখে চশমা, কালো রঙের টপসের সঙ্গে জিন্স। হাইলাইট করা চুল বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছিল লালমাটিয়া মহিলা কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে অনার্সে অধ্যয়নরত কথার। চুল সরিয়ে হাসি দিয়ে বললেন, ‘আপনাকে দেওয়া নির্ধারিত সময়ের পরে কিন্তু আমি এসেছি। এটাই আমার মূল সমস্যা। আমি কখনও কোনো কিছু সময় মেনে, নির্দেশনা মেনে করতে পছন্দ করি না। সে জন্যই স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাদাম বিক্রি করছি।’
প্যাকেট করে গলায় ঝুলিয়ে নিলেন বাঁশের ঝুড়ি। রবীন্দ্রসরোবরে বৈকালিক ভ্রমণে আসা সবার কাছে গিয়ে বলছেন, ‘ভাইয়া, আপু বাদাম কিনেন না। মাত্র বিশ টাকা।’ তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গল্প হয়। তিনি বললেন, ‘হাতখরচের জন্য আমার বাবা যথেষ্ট টাকা দেন। কিন্তু আমি সব সময় নিজের মতো করে কিছু করতে চাই। এ টাকা দিয়ে হয়তো আমার খরচ চলবে না। কিন্তু একদিন এভাবেই বড় কোনো কাজ করব। যা দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হবে। যেমন আমি লিখন ভাইয়াকে দেখে হয়েছিলাম।’
বাধা পাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কথা বললেন, ‘মানুষ খুব ভালোভাবে নিচ্ছে বিষয়টি। প্রথমে অনেকে বিশ্বাস করতে না চাইলেও, এখন সবাই খুব ভালোভাবে নিচ্ছে। বাবা, বড় ভাই, ওনারা ব্যাপক সাপোর্ট দিচ্ছেন। ছোট ভাই একটু নারাজ। আশা করি, সেও তাড়াতাড়ি মেনে নেবে। কেননা আমি তো কোনো খারাপ কাজ করছি না। যে কোনো কাজই তো কাজ এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। একজন রিকশচালক যেমন পরিশ্রম করেন, একজন শিল্পপতিও তেমন পরিশ্রম করেন। সুতরাং কোনো কাজই ছোট না।’
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় জন্ম কথার। সেখানকার হাসপাতালে কাজ করেন বাবা হাবিবুর রহমান। ২০০৮ সালে মাকে হারান কথা। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর বাসা থেকে চাপ আসে উচ্চশিক্ষার জন্য মাললেশিয়া যাওয়ার। তার জন্য পুরো পরিবারও সেখানে স্থায়ী হতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনচেতা কথা ছোটবেলা থেকেই নিজের মর্জির মালিক! তাই তো সম্মান শ্রেণীতে ভর্তির পরই বান্ধবীদের সঙ্গে কলেজে পহেলা বৈশাখে স্টল দেওয়া, বিভিন্ন উৎসবে পানি ও ফুল বিক্রি করছিলেন তিনি। তবে গত ১ জুন থেকে পুরোদমে বাদাম বিক্রেতা কথা। গত কয়েক দিন ধরে গড়ে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় করছেন তিনি। এরই ফাঁকে জানালেন, রমজানে মাসে তিনি বাদাম বিক্রি করবেন না। কারণ, রোজার মধ্যে কেউ বাদাম খাবে না। ঈদের পর আবারও তিনি ফিরে আসবেন রবীন্দ্রসরোবরে।
সব শেষে কথা বললেন, ‘অনেকেই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, আমি তেমনটা না। নিজের মতো করে কিছু করতে চেয়েছি সব সময়ই। এ জন্য কোনো খারাপ পথ বেছে না নিয়ে যেটা আমার ভালো লাগে সে কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছি। এর আগে আমি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করেছি। কিন্তু সেখানেও সেই ধরাবাঁধা নিয়ম। এভাবে কাজ করা, বাঁচা আমার পক্ষে সম্ভব না।’
সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ছে, তখন বিক্রি থামিয়ে বললেন, ‘বাদাম বিক্রি করে আমি হয়তো সংসার চালাচ্ছি না। কিন্তু আমি আমার বয়সীদের বলতে চাই, খালি আড্ডা না দিয়ে কিছু একটা করি। কোনো কাজেই লজ্জা না করি। এমনটা হলেই একদিন দেশে বেকারত্ব থাকবে না।’
কথাগুলো বলেই আবারও ব্যস্ত কথা। এ সময়ই একজন পাশ থেকে বলে উঠলেন, বড়লোকের মেয়ে বলেই এসব করছে, দু’দিন পর হারিয়ে যাবে। তার বাক্যগুলো শুনে আবার মনে এলো কামিনী রায়ের সেই কবিতার বাকি অংশ ‘মহৎ উদ্দেশ্যে যবে একসাথে মিলে সবে,/ পারিনা মিলিতে সেই দলে,/ বিধাতা দিয়েছেন প্রাণ, থাকি সদা ম্রিয়মান,/ শক্তি মরে ভীতির কবলে,/ পাছে লোকে কিছু বলে।’
তথ্যসূত্র – সমকাল

