রুহুল আমিন ভুইয়া। ১০ জুন ২০১৬
শিক্ষা, সচেতনতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ও গোড়ামির কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়ে শিশুর ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। ইউনিসেফসহ শিশু ও মানবাধিকার সংগঠন গুলোর প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে আসে প্রতিবছর। কিন্তু বাল্যবিবাহের হার যেন দিনদিন বেড়েই চলেছে। নারীর ক্ষমতায়ন এ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। নারীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে ক্ষমতায়নের পথ উন্মুক্ত করা যাবে না।
আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশর বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার অভাব ও গতানুগতিক মানসিকতার জন্য বাল্য বিয়ের হার বেশি বলে মনে করা হয়।
তবে, সচেতনতার অভাব এক্ষেত্রে বড় একটি নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। দারিদ্রের কারণে বিদ্যমান সামাজিক অবস্থায় নারীকে বোঝা মনে করা হয়। তাই বাবা-মা যত দ্রুত সম্ভব চায় মেয়ের বিয়ে দিতে। আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বোধের অভাবের কারণেই এমনটি হয়ে থাকে।পরিসংখ্যান বলেছে, ১৮ তে পা দেয়ার আগেই দেশের প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়।
২০১৪ সালের একটি ইউনিসেফ রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি।তার মানে, বিদ্যমান আইনে বিয়ের বয়স কমপক্ষে ১৮। কিন্তু বাস্তবে তারও তিন বছর আগেই এ দেশের মেয়েদের বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি। এমন একটি পরিস্থিতিতে সবেচয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয় নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য।
বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর অধিকাংশ মেয়েরাই আর স্কুল যেতে পারে না । ফলে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয় দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী। শিক্ষিত মায়ের মাধ্যমে শিক্ষিত জাতি গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। সেই সাথে নারীর ভবিষ্যত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। ক্ষমতায়ন তো অনেক পরের কথা। বাল্যবিবাহের ফলে প্রসূতি ও শিশু মৃত্যু, দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি নারীর স্বাভাবিক অনুসঙ্গ হিসেবে দেখা দেয়। কিন্তু এতো কিছুর পরও এদেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। বাল্যবিবাহের হার আমাদের দেশে বেশি হলেও,এ তালিকায় আমাদের সাথে আছে ভারত ও নেপাল।
দেশে ১৮ বছরের আগে বিয়ে আইনত নিষিদ্ধ হলেও আমাদের ৬৪ শতাংশ মেয়েরই ১৮’র আগেই বিয়ে হয়ে যায়। বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত নতুন আইন করার প্রাক্কালে মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর এটি প্রস্তাব হচ্ছিল। তবে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছরই থাকছে। তাই বর্তমান আইনে বিয়ের বয়সের কোনো হের ফের হচ্ছে না।
বাল্যবিবাহ রোধে ১৯২৯ একটি আইন (বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-১৯২৯) করা হয়। ওই আইনের ২ ধারাতেই ‘শিশু’র সঙ্গা নির্ধারণ করা হয়েছে পুরুষ হলে ২১ বছরের নীচে ও নারী হলে ১৮ বছরের নীচে। ছেলেদের ২১ আর মেয়েদের ১৮ এর কম হলে তা বাল্যবিবাহ হিসেবে পরিচিত। আইনে এ ধরনের বিয়েকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ আইনে বাল্য বিবাহ বলতে কেবল নারী শিশুদের বিয়ের কথাই বলা হয়নি। ছেলেদের বয়সও ২১ এর কম হলে তা বাল্যবিবাহের অন্তর্ভূক্ত। বিয়ের কোনো এক পক্ষ আইনানুযায়ী বিয়ের জন্য উপযুক্ত বয়সের না হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তবে, এ আইনে শাস্তির যে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে তা অপ্রতুল।
বাল্যবিবাহের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র এক মাস কারাদণ্ড। এ শাস্তি কেবল যে বাল্যবিবাহ করবে তিনিই পাবেন তা নয়, বাল্যবিবাহের উদ্যোক্তা, সম্পাদনকারী, বাবা-মা এমনকি অভিভাবকরাও শাস্তির আওতায় আসতে পারে। আর এক্ষেত্রে জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র এক হাজার টাকা।
১৯২৯ সালের পর ১৯৮৪ সালের আইনটির কিছু সংশোধন করা হয়। এর পর ২০১৩ সালে ১৯২৯ সালের আইনটি বাতিল করার প্রস্তাব করে নতুন একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়। প্রস্তাবিত আইনে বাল্য বিয়ে বন্ধের জন্য আগের শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে দুই বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয় যা খুবই যুগোপযুগি।
তবে বিয়ের ন্যূনতম বয়স কমানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছিল তা বিদ্যমান আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ ও আমাদের বিদ্যমান শিশু আইনের সাথেও তা সাংঘর্ষিক।
ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের আইনে ‘প্যারেন্টস কনসেন্ট’ বা অভিভাবকের সম্মতির শর্ত ১৬ বছরের মেয়ের বিয়ে বিধান আছে। এ ধারনার আলোকেই বাংলাদেশে বিয়ের বয়স শর্ত সাপেক্ষে ১৬ করার এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালের মানবাধিকার সনদে স্বাধীন সম্মতিতে বিবাহ সম্পাদনের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ১৯৭৯ সালের CEDAW সনদ ও ১৯৯৮ সালের ‘বিয়েতে নারীর সম্মতি, সর্বনিম্ন বয়স ও নিবন্ধক সনদে’ও বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয় ১৮।
বাংলাদেশ ওই সব গুলো সনদ সাক্ষর ও গ্রহণ করেছে। ওই সব সনদের আলোকে আমাদের দেশে বিয়ের বয়স ১৮ করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান সরকার বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বিবাহের সংখ্যা শুন্যে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে১৮ বৎসরের নিচে বিয়ের সংখ্যা শুন্যে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। বাল্যবিবাহ রোধ করার একটি বড় অস্ত্র হচ্ছে দারিদ্র দূর করা। দারিদ্র সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণ। কাজেই দারিদ্র দূর করতে পারলে বাল্যবিবাহের হার অনেকটা কমে আসবে।
দেশের দারিদ্রের হার ইতিমধ্যেই অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে সরকারের পাশাপাশি দেশে অনেক বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে। এক্ষেত্রে সরকার ও এসব বেসরকারি সংস্থা গুলোর কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন জরুরি। সমন্বীত ভাবে কাজ করার ফলে দেশে নারী শিক্ষার যে অগ্রগতি অথবা মা ও শিশু মৃত্যু হ্রাসে যে সাফল্য এসেছে, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে ও একই সাফল্য আসবে। প্রয়োজন একটি সমন্বীত কর্মদ্যোগ।
রুহুল আমিন ভুইয়া
লেখক,সাংবাদিক

