৩৪ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে রোলস রয়েস, মার্সিডিজ, রেঞ্জরোভার, ল্যান্ড রোভার, গাড়ি কিনে বিক্রি
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম এর শেকড়ের সংবাদ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এয়ারলাইনস কোম্পানি ফ্লাইদুবাই ঢাকা অফিসের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ৪টি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির চাঞ্চল্যকর তথ্য
আমদানি করা গাড়িতে মিথ্যা তথ্যোর মাধ্যমে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইতিপূর্বে রাজধানী ঢাকায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা দুটি বিলাসবহুল গাড়ি উদ্ধার করে।
এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের এয়ারলাইনস কোম্পানি ফ্লাইদুবাই ঢাকা অফিসের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ৪টি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকার ৩৪ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বিশেষ সূত্রে জানাযায় , অবৈধভাবে আমদানি করা গাড়িগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে নির্দেশ দেয়া হলেও আমদানিকারক বিদেশী এয়ারলাইন্স কোম্পানি গাড়িগুলো মঙ্গলবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফেরত দেয়নি বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে।
মূলত, সংসদ সদস্যদেরকে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ করে দেওয়া হলেও গাড়ির ব্র্যান্ড ও সিসি ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। অথচ ফ্লাইদুবাই-এর ক্ষেত্রে তা ছিল না। একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মদদে তাদেরকে এ বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রে আরো জানাযায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক এয়ারলাইনস ফ্লাইদুবাই তাদের ঢাকা অফিস, বসতি এভিনিউ, প্লট নং-১০, ইউনিট সি-৪, রোড-৫৩, শুলশান এভিনিউ, গুলশান-২ ঢাকার জন্য ৪টি শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি করে। সম্পূর্ণ নতুন গাড়ি ৪টির মধ্যে রয়েছে ২৯৯৩ সিসি ক্ষমতার ইঞ্জিন সমৃদ্ধ ল্যান্ড রোভার জিপ মডেল ডিসকভারি ৪এস। ৩০০০ সিসি ক্ষমতা সম্পন্ন রেঞ্জরোভার জিপ মডেল স্পোর্টস এসই। ৬৬০০ সিসির রোলস রয়েস কার মডেল ঘোস্ট ইডব্লিউবি এবং ৪৬৬৩ সিসি ক্ষমতা সম্পন্ন মার্সিডিজ কার মডেল এস ৫০০এল। প্রথম দুটি গাড়ি ২০১৪ সালের এবং পরের দুটি ২০১৫ সালে তৈরি।
সূত্র জানায়, গোপন সূত্রের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানতে পারে শুল্ক সুবিধার আওতায় আমদানি করা গাড়িগুলো কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি না নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। শুল্ক সুবিধার আওতায় আমদানি করা গাড়ি হস্তান্তরযোগ্য না হওয়ায় বিষয়টি তদন্তের জন্য শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে গত ২৪ জানুয়ারি সংস্থাটির পক্ষ থেকে ফ্লাইদুবাই ঢাকা অফিসে উপস্থিত হয়ে গাড়ির অবস্থান ও আমদানির দলিলপত্র দেখতে চাওয়া হয়। এসময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তদন্ত দলকে অবহিত করা হয় যে, আমদানি করা গাড়িগুলোর মধ্যে ২টি জিপ এবং একটি সিডান গাড়ি বর্তমানে তাদের কাছে আছে। অপর মার্সিডিজ বেঞ্জ চট্টগ্রামে তাদের শাখা অফিসে রয়েছে। এসময় তারা গাড়িগুলো আমদানির কাগজপত্রও উপস্থাপন করে।
সূত্র জানায়, ফ্লাইদুবাই, দুবাই ভিত্তিক যাত্রী পরিবহনকারী একটি বিমান সংস্থা। সংস্থার এ দেশীয় এজেন্ট স্কাই এভিয়েশন নামক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানতে পারেন, নির্দিষ্ট লভ্যাংশের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি ফ্লাইদুবাই-এর স্থানীয় ব্যবসা পরিচালনা করে। একটি এজেন্ট কর্তৃপক্ষ কী ভাবে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ পায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র জানায়, ফ্লাইদুবাই-এর আমদানি করা ৪টি গাড়ির উপর প্রযোজ্য শুল্ক-করাদি মওকুফের বিষয়ে এনবিআর গত ২০১৩ সালের ৭ মার্চ একটি বিশেষ আদেশ জারি করে। এনবিআরের সদস্য (শুল্কনীতি) মো. ফরিদ উদ্দিন স্বাক্ষরিত নথি নং-৩(৫) শুল্কঃযাত্রী ও ক’টঃ সুবিধা/৯৭(অংশ-২)/১৪৭- এ বলা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি অনুযায়ী চুক্তির আর্টিকেল-৬ অনুযায়ী ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ কর্র্তৃক আমদানিতব্য ৪টি গাড়ি (two 4×4 and two sedans) এর উপর প্রযোজ্য শুল্ক-করাদি কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৬৯ এর সেকশন ২০ এবং মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১(১৯৯১ সনের ২২ নং আইন) এর ধারা ১৪ (২ক) মোতাবেক জতীয় রাজস্ব বোর্ডের পূর্বানুমতি ছাড়া শুল্কমুক্ত আমদানি করা ৪টি গাড়ি বিক্রয়/হস্তান্তর করা যাবে না।
সূত্র জানায়, শুল্কমুক্ত আমদানি করা গাড়িগুলো শর্ত ভেঙ্গে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে গাড়িগুলো ফেরত চাওয়া হলে ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ আদালতের স্মরণাপন্ন হয়। এর বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে রীট আবেদন করলে আদালত স্থগিতাদেশ দেন। এর ফলে গাড়িগুলো সরকারের হেফাজতে আনার ক্ষেত্রে আর কোন বাধা নেই বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, এরই মধ্যে এনবিআর যে বিশেষ আদেশে ফ্লাইদুবাইকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানির সুযোগ দিয়েছিল সেই আদেশটি বাতিল করে এর উপর প্রযোজ্য শুল্ক-করাদি আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক, অব্যাহতি ও প্রকল্প সুবিধা) খোজিস্তা আখতার স্বাক্ষরিত বিশেষ আদেশ নথি নং-৩(৫) শুল্কঃযাত্রীও ক’টঃসুঃ/৯৭(অংশ-২) জারি করেছে।
এতে বলা হয়েছে, যে আদেশ বলে ফ্লাইদুবাইকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছিল পরবর্তী সময়ে শুল্ক, গেয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর কর্তৃক দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, এয়ার সার্ভিসেস এগ্রিমেন্ট ও উক্ত চুক্তির ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক জারীকৃত এসআরও নং-১৯৪-আইন/২০১০/২৩১২/শুল্ক, তারিখ ১০/৬/২০১০ এ শুল্ক-করাদি মওকুফের তলিকা প্রদান করা হয়েছে। সেই তালিকায় শুল্কমুক্তভাবে গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখা হয়নি। উল্লেখিত চুক্তিতে ভুল ব্যাখ্যার কারণে প্রকৃত তথ্য গোপন করায় এবং রাজস্ব ক্ষতি হওয়ায় ইতোপূর্বে জারীকৃত শুল্ক-করাদি মওকুফ সংক্রান্ত বিশেষ আদেশটি সরকারের নির্দেশক্রমে বাতিল করা হল।
সূত্র জানায়, যে আদেশের আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে তার ভিত্তি হলো এয়ার সার্ভিসেস এগ্রিমেন্ট। এর অনুচ্ছেদ-১ এ বলা হয়েছে যাত্রী পরিবহনকালে অন বোর্ড যাত্রীদের সেবা দেওয়ার জন্য খাদ্যদ্রব্য, লিকার, বেভারেজ, সিগারেট ইত্যাদি বহনে; অনুচ্ছেদ-২ এ বলা হয়েছে স্টাফ ইউনিফর্ম, কম্পিউটার, ডিসপ্লে ইউনিট, টিকিট, লাইন প্রিন্টার ইত্যাদি সরবরাহে এবং অনুচ্ছেদ-৩ এ বলা হয়েছে এফারক্রাফট স্টোরস, স্পেয়ার্স পার্টস, জ্বালানী ও লুব্রিকেন্ট ইত্যাদি ক্ষেত্রে। এয়ার সর্ভিসেস এগ্রিমেন্ট আর্টিকেল-৬ এ গাড়ি বা অনুরূপ ডিউরেবল আইটেম ও এয়ার কন্ডিশনার, ডিপ ফ্রিজার ইত্যাদি সেমি-ডিউরেবল আইটেম শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করার সুযোগ রাখা হয়নি।
সূত্র জানায়, ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ ৪টি গাড়ি আমদানির জন্য উক্ত এগ্রিমেন্টের আর্টিকেল-৬ অনুযায়ী আবেদন করায় তাদের আবেদনে অসত্য তথ্য পরিবেশন করেছে। ফলে ‘দি কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৬৯’ এর আওতায় মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে গাড়িগুলো আমদানি করে অপরাধ করেছে। এতে সরকারের প্রায় ৩৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
সূত্র জানায়, সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে যে শুল্ক-করাদি মওকুফের সুবিধা দেওয়া হয়েছে তাতে ব্র্যান্ড ও সিসি ক্ষমতার সিলিং আরোপ করা হয়েছে। অথচ ফ্লাইদুবাই যে ৪টি গাড়ি আমদানি করেছে সেখানে কোন সিলিং-এর উল্লেখ না থাকায় স্থানীয় এজেন্ট অত্যন্ত বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করেছে।
এনবিআর-এর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদকবে বলেন, ‘নতুন আদেশ জারি হওয়ার ফলে আগে যে আদেশের বলে ফ্লাইদুবাই শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা পেয়েছিল সেটি বাতিল হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে ফ্লাইদুবাইকে গাড়িগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দিতে হবে। অথবা প্রচলিত হারে শুল্ক-করাদি পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় সরকার আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম/ এনজে/এমএম/এমকে ২০১৬

One thought on “ফ্লাই দুবাইয়ের গাঁড়ি আমদানি কেলেঙ্কারি”