সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম
শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল ২০১৫
রনিয়া রহিম: আমি একটু বিশ্বাসী-মুসলিমের দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমিকম্পকে দেখতে চাচ্ছিলাম। ভূমিকম্প (বা যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ) এলেই বাংলাদেশে স্ট্যাটাসের ধুম পড়ে যায়, এটি আল্লাহর তরফ থেকে গজব, এবং তার জন্য আধুনিক যুগের আমাদের পাপাচার দায়ী। আপনাদের সবার বিশ্বাস (এবং অবিশ্বাসের) প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে আমি কিছু মন্তব্য করতে চাই।
এর পক্ষে যাঁরা বলেন, তাঁরা বিভিন্ন রেফারেন্স দেন; – আমি আপনাদের সাথে তর্কে মাতবো না। আমার দৃষ্টিকোণ একটু ভিন্ন, এবং আমিও ধর্মীয় ব্যাখ্যাসহই বলছি। ওস্তাদ নোমান আলী খানকে অনেকেই চেনেন, তাঁকে একজন একবার এই প্রশ্নটা করেছিলেন।
তাঁর কাছে প্রশ্নটা ছিল – যখন আমাদের উপরে কোন দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা নেমে আসে, তার জন্য কি আমরা দায়ী? আমরা পাপী, তাই কি আমাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছে?
তাঁর উত্তর ছিলো, না, কখনই নয়! যখন আমাদের সাথে খারাপ কিছু হয়, সেটা এই কারণে হয়না যে আমরা খারাপ, বা খারাপ কাজ করেছি। হু, একটা সময় আসে অবশ্য, যখন আমাদের পাপাচারের কারণে আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তির বিধান আছে – সেটা কখন? সেটা পরকালে! শেষ বিচারের দিনটিতে! আমাদের এই ধুলি-মাটির পৃথিবীতে তো নয়!
তিনি আরো উদাহরণ টানলেন – আমাদের মহানবী (সাঃ) কি খারাপ সময়ের মাঝ দিয়ে গিয়েছিলেন? হ্যাঁ, গিয়েছিলেন তো অবশ্যই। তাঁকে কি আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে চিহ্নিত করি না? তাঁর খারাপ সময়ের মাঝ দিয়ে যাওয়াটাকে কি আমরা তাঁর চরিত্রের সাথে গুলিয়ে ফেলি? না তো! তাহলে কেন আমরা নিজেরা যখন কোন দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ি, তখন নিজেদের এবং আপামর পৃথিবীকে পাপী ঠাওরাই?
নোমান আলী খান তাঁর উত্তরকে আরেকটু বিস্তৃত করলেন। তিনি বলতে থাকলেন, হ্যাঁ, মাঝে মাঝে কোন কিছু আল্লাহর তরফ থেকে শাস্তি হতে পারে, কিন্তু – একটা কিন্তু আছে এতে – এটা কখন আর কোন শাস্তিটা, সেটা আমাদের জানার কথা নয়। – নবী নুহ (আঃ)’এর উদাহরণ তিনি দিলেন; সে সময় কি বন্যা হয়েছিলো? হ্যাঁ; আমাদের সময়ে কি বন্যা হয়? হ্যাঁ। সেই যুগে কি মানুষ মারা গেছে? হ্যাঁ; এখনকার প্রাকৃতিক দুর্যোগে কি মানুষে মৃত্যু হচ্ছে? হ্যাঁ। – কিন্তু এই দুটো কি সমান? না, মোটেও না! সেই সময়ের বন্যা ছিলো আল্লাহর তরফ থেকে শাস্তি, এটা নিয়ে বিশ্বাসীদের দ্বিমত নেই, – কারণ এটা আল্লাহ সুবাহানাতায়ালা সুস্পষ্ট করে পবিত্র কুরআন শরীফে বলেছেন। এবং, সেই যুগে, সেই মানুষদের মাঝে আল্লাহ’র তরফ থেকে একজন নবী তাদের মাঝেই ছিলো। তাদের শাস্তি এই কারণেই দেয়া, কারণ তারা নবীর কথা শুনেও শোনেনি। – আমাদের সময়টা ভিন্ন। আমাদের মাঝে কি এই মুহুর্তে কোন নবী আছেন? না। আল্লাহ তায়ালা কি ওহী পাঠিয়েছেন আমাদের কাছে, আজকের এই ভূমিকম্প, গতকালের বন্যা, এইগুলো গজব? না, পাঠাননি। দুটোকে আমরা তাই এক করে দেখতে পারি না। সুস্পষ্ট করে আমরা তাই কেউ দাবি করতে পারি না – যে এটা আল্লাহর গজব; অথচ এই জিনিসটাই আমরা অহরহ করে থাকি।
যেটা মানা করা আছে আমাদের, সেটা হলো শেষ বিচারের দিনের আগে আমরা নিজেরাই যখন আমাদের আশপাশের মানুষজনদের বিচার করা শুরু করে দেই। এর উদাহরণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রচুর আছে, বিশ্বাসের আবরণেই তা আমরা নিত্য করি, অথচ আমাদের ধর্মমতেই এই বিচারকাজটা আমাদের নয় – স্বয়ং স্রষ্টার, এবং, সেটা শেষ বিচারের দিনে। হাজারবার বরং আমাদের যেটা মনে করানো আছে, আমাদের ধর্মগ্রন্থে, মহানবীর বয়ানে, সেটা হলো আল্লাহর ভালবাসা ও করুণা তাঁর ক্রোধ ও শাস্তির চাইতে বহুগুণ বেশি। – আমরা সেই স্রষ্টার সৃষ্টি হয়েও কতজনা সেটি মনে রাখি নিজেদের ব্যবহারে? আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করি, কিন্তু এই ভুলটা আমারও বহুবার হয়, আমি সবিনয়ে স্বীকার করছি; গতকালই এক প্রিয়মুখকে আমার একটি কথা কষ্ট দিয়ে ফেলেছে।
এই ভূমিকম্পের বেলাতেও ঠিক একই কাজটা করছি আমরা; আঙ্গুল তুলে বিচার করছি আশপাশের মানুষদের, এবং, এটি অন্যায়।
আমি আজকে এই লেখাটি লিখলাম, একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হিসেবে। চারপাশে যখন আমারই ধর্ম-বিশ্বাসের মানুষেরা সমানে লিখছেন এই ভূমিকম্প এসেছে আমাদের পাপাচারের শাস্তি হিসেবে, আমার ধর্মটার এই ব্যাখ্যাটা আমাকে প্রত্যেকবারই অস্বস্তিতে ফেলে, তাই এইবার লিখেই ফেললাম।
আশা করি ভূমিকম্পে সবাই নিরাপদ থাকছেন, প্রার্থনা করি ক্ষয়ক্ষতি যদি হয়েও থাকে, সেটা যেন সামান্যই হয়। আর একজন বিশ্বাসী হিসেবে পবিত্র কুর’আনের যে বাক্যটি আমাকে শক্তি দেয়, সেটি শেয়ার করে ইতি টানছি:
“সত্যিই, প্রতি দুর্ভোগের সাথে আসে স্বস্তি। প্রতি দুর্ভোগের সাথে আসে স্বস্তি।” (সুরাহ ৯৪: ৫-৬)
নিজে যখন কোন কঠিন সময় পার করি, সেটাকেই যখন চূড়ান্ত বলে মনে হয়, তখন চেষ্টা করি এই কথাগুলো মনে রাখতে – আর তাতে ভরসা পাই।
লেখিকা: রনিয়া রহিম,হিস্টোরিয়ান Humans of 1971এবং ফেইসবুকে তার গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য পরিচিত। এবং মুক্তিযুদ্ধের সত্যি কাহিনী গুলো সংগ্রহ, সংরক্ষন এবং প্রচারের জন্য তার নেয়া উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

