রনিয়া রহিম: মা দিবসের স্থাপয়িতা যিনি তাঁর নাম অ্যানা জার্ভিস। ১৮৭৬ সালে তাঁর বয়স যখন বারো, তখন তাঁর মায়ের একটি প্রার্থনা তিনি শোনেন: “আমি আশা করি কেউ কোনদিন সব মায়েদের সম্মানে একটি দিবস সৃষ্টি করবে; তাঁরা জীবনের প্রত্যেকটি স্থানে যে সমস্ত অসংখ্য অসামান্য অবদান রাখেন, তার বিনিময়ে এইটুকু তো তারা পেতেই পারেন!” – মায়ের সেই বাসনা আক্ষরিক অর্থে করা ছিলো কিনা জানা নেই, কিন্তু তাঁর কন্যার মনে গভীর ছাপ ফেলে যায় কথাগুলো! অ্যানা’র মা – অ্যান রিভস জার্ভিস – শুধুমাত্র একজন মমতাময়ী মা’ই ছিলেন না, সমাজসেবামূলক কাজেও ছিলেন নিয়োজিত, বিশেষ করে মায়েদের স্বাস্থ্যসেবামূলক কাজে তাঁর শহরে নিরলস খাটতেন।
সেই মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অ্যানা জার্ভিস প্রতিজ্ঞা করেন তিনি ‘মা দিবস’ প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বেন; আর আনুষ্ঠানিক ভাবে তার তিন বছর পর, ১৯০৮ সালে, তা প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয়। কাছের কিছু মানুষদের সাথে পালন করেই তিনি ক্ষান্ত দিলেন না, বহুবছর ধরে ধরণা দিতে দিতে অবশেষে ১৯১৪ সালে খোদ আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে দিয়েই বিল পাশ করিয়ে ছাড়লেন, এখন থেকে প্রত্যেক বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটি উৎসর্গ করা হবে সমস্ত মায়েদের প্রতি, তাঁদের বিশেষ অবদানের সম্মানে! ততদিনে প্রত্যেক স্টেটে এমনিতেও পালন করা হচ্ছিলো, – এমনই প্রচারণার জোর ছিলো অ্যানা’র, – আর এখন ব্যবসায়ীরাও এই দিবসের সুযোগ নিতে থাকলেন! ফুল, কার্ড, উপহারসামগ্রী – বিক্রিবাট্টা বেড়ে গেলো; বিক্রেতারাও বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে দেশ ভরিয়ে দিতে থাকলেন মা দিবস উপলক্ষ্য করে!
অ্যানা জার্ভিসের উদ্দেশ্য ছিলো খুব সাধারণ: – এই দিনে অন্তত তোমাদের মায়েদের কথা একটু আলাদা করে ভেবো, যদি মায়ের কাছে না থাকো তো তাঁকে দেখতে যাও, তাঁর সাথে একটু সময় কাটাও, মা খুশি হবেন! – যখন থেকে দিবসটি নিয়ে ব্যবসা শুরু হয়ে গেলো, অ্যানা জার্ভিসেরও মন উঠে গেলো, রীতিমত ত্যক্তবিরক্ত তিনি, পারলে দিবসটাকেই থামিয়ে দেন! চেষ্টাও করেছিলেন তিনি; কিন্তু ততদিনে রমরমা ব্যবসা, সাধারণ মানুষেরাও খুশি এই দিবসে – মূল স্থপতি কি ভাবছেন, তাতে কি যায় আসে?
“মা দিবস” “বাবা দিবস”-এ অনেককেই দেখি ফেসবুকে ঝড় তুলতে, “আমার কাছে সব দিবসই বাবা-মা দিবস, আলাদা করে একদিন পালন করবো ক্যান??” হক কথা, সব দিনই তাঁদের ভালবাসি, আলাদা করে ব্যবসায়ীদের লাভের জন্য এই লোক-দেখানো ‘লাভ’ দেখানোর কি মানে? – কিন্তু আমার কাছে দিনটাকে জন্মদিনের মতো মনে হয়। জন্মদিন পালন করতেই হবে এমন কোন কথা নেই – আর পালন করার ধরন আড়ম্বর থেকে সাধারণ থেকে নিতান্তই দায়সারা সবরকমই হতে পারে! – কিন্তু কাছের মানুষেরা যখন মন থেকে শুভেচ্ছা জানায়, সেটা মুখ ফুটে ঐ শব্দটা না বললেও, একরকম তো “ভালোবাসি” বলাই, তাই না? “এই একটা দিনে তুমি মানুষটা যেরকম, আমার জন্য যে মানেটা তুমি রাখো, আমি আজ তোমার সেই স্বত্তাটিকে উদযাপন করছি, সম্মান দেখাচ্ছি!” কাছের মানুষদের আমরা প্রতিদিনই ভালোবাসি, কিন্তু এই একটা দিন যখন আলাদা করে জানাই, তখন সেটা জানাতেও ভালো লাগে, নিজের বেলাতে জানতেও সুখ লাগে।
তার মানে এই না যে অন্যদিন তাদের গুরুত্বটা কিছু কম; তার মানে এও না অন্য কোনদিন আচমকা হুট করে তাদের ‘স্পেশাল’ বোধ করানো যাবে না; কিন্তু একদিন একটু হলে, কি এমন ক্ষতি? smile emoticon
#
অ্যানা জার্ভিসের মূল ভাবনাটি কিন্তু সুন্দর ছিলো বেশ! – আমি নিজের বেলাতেই বলি, আমি প্রায়ই আমার বাবামা’কে নিয়ে ভাবি, তাঁদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা, ভরসা, শিক্ষা, চেতনা, আর দৈনন্দিনের যতরকম সাপোর্ট আমি পেয়েছি আর পাই, তার জন্য আমি স্রষ্টার কাছে খুব কৃতজ্ঞ!! আলাদা করে সেটা আব্বু আম্মুকে বলতে আমার একটু লজ্জা লাগে, যদিও মাঝে সাঝে হুট করে বলেছি টুকটাক, কিন্তু তাদের ভালোবাসার তুলনায় আমার সামান্য কথাগুলো যথেষ্ঠ না, আমি জানি। আমি কোনদিন সেটাকে ম্যাচ করতে পারবো না, সম্ভবই না, – গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনটির মতোই আমি জাদুর চেরাগ পেলে প্রথমেই ভেবে ফেলবো নিজের কথা, আর তারা ভাববে আমার আর আমার ভাইটির কথা।
তাই এই দুই দিবসকে (“মা” ও “বাবা”) – তার তাদের জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী -সামনে রেখে যখন ভাবতে থাকি, কি করতে পারি, কি দিতে পারি, তখন বেশ ভালোই লাগে কিন্তু! অন্যদিন যা মুখ ফুটে বলা হয়না, কাজে বা আচরণেও দেখাতে ব্যর্থ হই হয়তো, তখন এই দিনটাকে যদি একটু আলাদা করে পালন করেই ফেলি, খুব কি ক্ষতি তাতে?
রনিয়া রহিম:ফেইসবুকে গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য পরিচিত।মুক্তিযুদ্ধের সত্য গল্প সংগ্রহ এবং সংরক্ষনে তার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

