ফাঁসি যে কোনো মুহূর্তে

প্রস্তুত ফাঁসির মঞ্চ

শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

সিটিজিবার্তা২৪.কম

Salauddin-Mujahid

নিউজডেস্ক ঃ  যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকরে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রিভিউ খারিজের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপিতে স্বাক্ষর করেন আপিল বিভাগের চার বিচারপতি। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সেটি পাঠানো হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সেখান থেকে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে রায়ের কপি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছানো হয়। রাত ১০টার দিকে দুই আসামিকে রায়ের কপি পড়ে শোনানো হয়। সুপ্রিমকোর্ট ও ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার অফিস এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে দুই আসামি- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাকা চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদের সঙ্গে দেখা করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি দেখা করার আবেদন করেছেন মুজাহিদের পাঁচ আইনজীবী। কারাগারে চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে ফাঁসির মঞ্চ। এছাড়া যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে ছয়জন জল্লাদকে। তৈরি রাখা হয়েছে ফাঁসির রশি। আর রায় কার্যকরকে সামনে রেখে কারাগার ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়। নাজিমউদ্দিন রোডের প্রবেশমুখ চানখাঁরপুল থেকে চকবাজার পর্যন্ত রাস্তায় সকাল থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে সন্ধ্যায় খুলে দেয়া হয়েছে। কারাগারের চারপাশে মোতায়েন রয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। নগরীর অন্যান্য স্থানেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

কারা সূত্র জানায়, রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসেন কারা অধিদফতরের কর্মকর্তারা। সেখানে আইজি প্রিজনের সভাপতিত্বে কারা অধিদফতর ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রায় কার্যকরের প্রস্তুতির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বিচারকদের স্বাক্ষরের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদেও চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজের রায় প্রকাশ করা হয়। রায়ের কপি ট্রাইব্যুনালে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায় স্বাক্ষর শেষে তা ট্রাইব্যুনালে পৌঁছেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দণ্ডিতরা এখন যদি প্রাণভিক্ষা চান, শুধু সেটাই এখন বিবেচনায় নেয়া হবে। এছাড়া আর কিছুই করার নেই।’ তবে প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই বলেও উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

বুধবার দুই আসামির রিভিউ আবেদন খারিজ করে রায় দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চ। বেঞ্চের অপর সদস্যরা ছিলেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। বৃহস্পতিবার সকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রিভিউ খারিজের সংক্ষিপ্ত রায়ের কপি চেয়ে আপিল বিভাগের কাছে মৌখিক আবেদন জানায়। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, সংক্ষিপ্ত রায়ের কপির প্রয়োজন হবে না। এদিন সন্ধ্যায় চার বিচারপতিই রিভিউ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপিতে স্বাক্ষর করেন। এরপর আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণভ চক্রবর্তীসহ কয়েকজন কর্মকর্তা রিভিউ খারিজের রায়টি ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যান।

ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মাইক্রোবাসে (ঢাকা মেট্রো চ ৫৩-৮১২১) রাত পৌনে ৯টায় ট্রাইব্যুনালের ৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কারাগারে যান। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার আফতাবুজ্জামান। তার সঙ্গে ছিলেন- ট্রাইব্যুনালের আইন ও গবেষণা কর্মকর্তা ফাহিম ফয়সাল, লাইব্রেরিয়ান তাপস চন্দ্র রায়, ট্রাইব্যুনালের স্টাফ জহুরুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলাম। কারাগার থেকে বের হয়ে কারা ফটকে তাদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জানানো হয়, রায়ের দুটি কপি কারাগারে এবং দুটি কপি জেলা প্রশাসকের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

কারাগার সূত্র জানায়, নিয়ম অনুসারে ফাঁসির রায় কার্যকর করার সময় উপস্থিত থাকবেন কারা অধিদফতরের কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন, অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. ফজলুল কবীর, উপ-কারা মহাপরিদর্শক গোলাম হায়দার, সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির, কারাধ্যক্ষ (জেলার) নেসার আলম, ঢাকার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিঞা, ডিএমপি কমিশনারের প্রতিনিধি, লালবাগ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকার সিভিল সার্জন ডা. মালেক মৃধা, কারাগারের চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রস্তুত ফাঁসির মঞ্চ : কারা সূত্রে জানা গেছে কারাগারের পূর্ব-পশ্চিম কোণে ফাঁসির মূলমঞ্চ। এর দৈর্ঘ্য আট ফুট এবং প্রস্থ সাড়ে চার ফুট। এর আগে গত ১১ এপ্রিল রাত ১০টায় এই মঞ্চেই ফাঁসি দেয়া হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামান ও ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কারা কর্মকর্তারা জানান, এই মঞ্চটি ভূমি থেকে উঁচুতে এবং পাশাপাশি দু’জনের ফাঁসি কার্যকর করার ব্যবস্থা আছে। মঞ্চের উপরে যে ফাঁসির কাষ্ঠ তার উচ্চতা আট ফুট। আর মঞ্চ থেকে নিচের দিকে বারো ফুট গভীর গর্ত আছে। সেই গর্ত কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢাকা। ফাঁসি কার্যকরের জন্য দক্ষিণে রাখা হয়েছে একটি লম্বা টেবিল, যাতে পাশাপাশি ১০ জন বসতে পারেন। তার সামনে আরেকটি টেবিলও রাখা হয়েছে। ফাঁসি কার্যকর করার পর ফাঁসকূপ থেকে লাশ তুলে মরদেহ ওই টেবিলে রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। পুরো ফাঁসির মঞ্চে লাল ও সবুজ রঙের শামিয়ানা টানিয়ে দেয়া হয়েছে। যাতে বাইরে থেকে ফাঁসির মঞ্চ দেখা না যায়।

দুই আসামির ফাঁসি একইসঙ্গে কার্যকরের সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে কারাগারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ডেপুটি জেল সুপার যুগান্তরকে জানান, দু’জনই শুধু নয়, এক রাতে পাঁচজন বা তারও বেশি আসামির রায় কার্যকরের অভিজ্ঞতা কারা কর্তৃপক্ষের আছে। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মহিউদ্দিন আহমেদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিনের ফাঁসি একযোগে কার্যকর করা হয়েছিল। তাই দুই আসামির রায় একযোগে কার্যকর করার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সক্ষমতা কারা কর্তৃপক্ষের আছে।

প্রস্তুত ছয় জল্লাদ : কারাগারের জল্লাদ রাজুর নেতৃত্বে ছয় জল্লাদকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। দুটি রায় একইসঙ্গে কার্যকর করা হলে প্রয়োজনে জল্লাদের সংখ্যা বাড়ানো হবে। ছয় জল্লাদের অন্যরা হল জল্লাদ রানা, ফল্টু, শামসু, জনি ও ফারুক। তবে শেষ মুহূর্তে জল্লাদের নামে পরিবর্তন হতে পারে। জল্লাদের সংখ্যা কমানো বা বাড়ানো হতে পারে। তাছাড়া প্রধান জল্লাদের দায়িত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে।

কারা সূত্র জানায়, আলবদর কমান্ডার কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করেছিল জল্লাদ রানা। তার সহযোগী হিসেবে ছিল জল্লাদ ফল্টু, রাজু, শামছু ও জনি। এর আগে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার রায় কার্যকর করে জল্লাদ শাহজাহান ভুঁইয়ার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল। তার দলে সহযোগী ছিল ফারুক, সারোয়ার, তানভীর ও জনি। কারাবিধি অনুযায়ী কোনো আসামির রায় কার্যকর করতে কোনো কয়েদি জল্লাদের দায়িত্ব পালন করলে সংশ্লিষ্ট কয়েদির এক মাসের সাজা মওকুফ হয়। শাহজাহান ভুঁইয়া এর আগে বহুল আলোচিত জেএমবি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমান ও বঙ্গবঙ্গুর খুনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল।

তওবা পড়ানো হবে : আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে ফাঁসি কার্যকরের আগে আসামিদের তওবা পড়াবেন কেন্দ্রীয় কারাগারের মসজিদের ইমাম। এবারও মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মনির হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে জেল সুপার কনডেম সেলে যাবেন। ওই সময় কারা অধিদফতরের ডিআইজি পদমর্র্যাদার একজন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন। নিয়ম অনুযায়ী জেল সুপার আসামিকে জানাবেন- ‘এটাই আপনার শেষ রাত। এই রাতেই আপনার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। এখন আপনাকে তওবা পড়তে হবে।’ তওবা পড়ানোর ১০ মিনিট পর প্রধান জল্লাদের নেতেৃত্ব জল্লাদরা কনডেম সেলে যাবেন। আসামিদেরকে নিয়ে যাবেন ফাঁসির মঞ্চে। পরিয়ে দেয়া হবে জম টুপি। কার্যকর করা হবে ফাঁসি।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে : নিয়ম অনুযায়ী অসুস্থ কোনো ব্যক্তিকে ফাঁসি দেয়া হয় না। রায় কার্যকর করার আগে আসামিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন কারা চিকিৎসক। ইতিপূর্বে কামারুজ্জামানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছিলেন কারাগারের ডা. আহসান হাবীব। এবারও তিনি আসামিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন বলে একজন কারা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যাবেন : রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পড়ে শোনানোর পর আসামিরা দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা সেটা জানার জন্য কারাগারে যাবেন দু’জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। প্রাণভিক্ষা করবেন কিনা সেটা তারা আসামিদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইবেন। যদি প্রাণভিক্ষা না করেন তাহলে রায় কার্যকরের পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। আর প্রাণভিক্ষা করলে সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছানো হবে। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

নিরাপত্তা বলয় : বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কারাগারকে ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। চাঁনখারপুলে নাজিম উদ্দিন রোডের প্রবেশ মুখেই যানবাহন আটকে দেয়া হয়। সেখানে বসানো হয়েছে পুলিশের তল্লাশি চৌকি। এছাড়া নীরব হোটেল, মাকুশাহ মাজার, কারাগারের ফটক, বেগম বাজার এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। চকবাজার থানার ওসি আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, কারাগারে ১০টি ফোর্স মোতায়েন আছে। তার দাবি সেটা সাধারণ নিরাপত্তারই অংশ, অতিরিক্ত কোনো ফোর্স মোতায়েন হয়নি। সন্ধ্যায় নাজিম উদ্দিন রোডে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।

কারাগারকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করেছে এলিট ফোর্স র‌্যাব। পোশাকে তাদের সতর্ক পাহারার পাশাপাশি সাদা পোশাকে ও র‌্যাবের গোয়েন্দারাও সেখানে নিয়োজিত রয়েছেন। কারাগার এলাকাটি র‌্যাব-১০ এর আওতাভুক্ত। র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর যুগান্তরকে বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ৩০ জন র‌্যাব সদস্য পোশাকে কারাফটকে মোতায়েন আছেন। সাদা পোশাকেও মোতায়েন আছেন অনেকে। প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তে র‌্যাবের সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হবে।
এছাড়াও কারাকর্তৃপক্ষ কারারক্ষীদের কারাগারের গেট ও আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র অবস্থায় মোতায়েন করেছে। তারাও কারাগারের সামনে সতর্ক পাহারায় রয়েছেন।

সাকার পরিবারের সাক্ষাৎ : ফাঁসির আসামি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাৎ করেছেন তার পরিবারের ১৪ জন সদস্য। তারা দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে কারাগারে প্রবেশ করেন। প্রায় এক ঘণ্টা সাক্ষাৎ শেষে বেলা ১টা ৩০ মিনিটে তারা বের হন। তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা জিজ্ঞাস করা হলে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর এক ভাই রাগান্বিত স্বরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই সরকারের কাছে আবার প্রাণভিক্ষা’।

সাকার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন, তার স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী, বড় ছেলে ফজলুল কাদের চৌধুরী (ফাইয়াজ), ছোট ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মেয়ে ফারদিন কাদের চৌধুরী, বড় ছেলের স্ত্রী তানিয়া খন্দকার, মেয়ের জামাই জাফর খান, বোন জুবাইদা মনোয়ারা চৌধুরী ও হাছিনা কাদের চৌধুরী, ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামাল উদ্দিন কাদের চৌধুরী, ভাতিজা উমর আবু আদনান, ভাবী সেলিনা কাদের চৌধুরী, ভাগ্নি মাহবুবু কাদের চৌধুরী, তার আত্বীয় শাকিল কাদের চৌধুরী ও চাচাতো ভাই ইকবাল হোসেন চৌধুরী।

মুজাহিদের পরিবারের সাক্ষাৎ : ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাৎ করেছেন তার পরিবারের ১২ জন সদস্য। বৃহস্পতিবার ১টা ৫০ মিনিটে তারা কারাগারে প্রবেশ করেন। বের হয়ে আসেন পৌনে ৩টার দিকে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন- মুজাহিদের স্ত্রী তামান্না-ই-জাহান, বড় ছেলে আলী আহমেদ তাজদীদ, মেজো ছেলে আলী আহমেদ তাহকীক, ছোট ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর, মেয়ে তামরীনা বিনতে মুজাহিদ, মেয়ের জামাই নুরুল হুদা ফুয়াদ, বড় ছেলের স্ত্রী নাসরিন আক্তার কাকলী, মেজো ছেলের বউ সৈয়দা রুফায়দা, ছোট ছেলের স্ত্রী ফারজানা জেরিন, ছোট ভাই উজায়েদ এমএ আকরাম, ভাগ্নে আনম ফজলুল হাদী ও আত্মীয় মো. আবদুল খালেক। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সাক্ষাতের আবেদন করেছিলেন মুজাহিদের ছেলে মাবরুর।

সাক্ষাৎ শেষে মুজাহিদের ভাই উজায়েদ আকরাম বলেন, এটা অন্যায়। এটা রাষ্ট্রীয় হত্যা। আমার ভাই ন্যায়বিচার পায়নি। মুজাহিদের স্ত্রী বলেন, তার স্বামী ইসলামী আন্দোলন করার কারণে তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেয়া হচ্ছে।

মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর বলেন, ‘আমার আব্বা অনেক দৃঢ় ও সুস্থ আছেন। তিনি বিচলিত নন। তাকে বিমর্ষ দেখা যায়নি। তিনি (মুজাহিদ) বলেছেন, ‘আমি ’৭১-এ কোনো অপরাধ করিনি। শুধু ইসলামী আন্দোলন করার কারণে এই রায় দেয়া হয়েছে। এটা সরকারের নীল নকশার অংশ। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা, মিথ্যা, মিথ্যা।’

মাবরুর আরও বলেন, ‘আমার বাবা দেশবাসীর কাছে, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি এই মুহূর্তে কাউকে কোনো উপদেশ বা পরামর্শ দেননি।’ প্রাণভিক্ষার আবেদন সম্পর্কে মাবরুর বলেন, ‘আমার বাবা জানিয়েছেন-রাষ্ট্রপতির কাছে তিনি একটি আবেদন করবেন। কারণ তিনি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের অভিভাবক। তিনি একজন আইনজ্ঞ ও আইনজীবী। নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে তিনি রাষ্ট্রপতিকে জানাবেন। তবে সেটা প্রাণভিক্ষার আবেদন নয়। আবেদনে কি উল্লেখ করবেন কি ধরনের আবেদন করবেন সেটা তিনি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন।’ মাবরুর আরও জানান, তার বাবার জন্য চা-কপি, বিস্কিটসহ কিছু খাবার নিয়ে যান। সেটা তার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য কারা কর্তৃপক্ষ রেখে দিয়েছে।

আবার সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন : চূড়ান্ত রায়ের কপি পড়ে শোনানোর পর রায় কার্যকরের আগে আবারও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন সালাহউদ্দিন কদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পরিবারের সদস্যরা। রায় কার্যকরের আগে কারা অধিদফতর থেকে শেষ সাক্ষাতের জন্য তাদের ডেকে পাঠানো হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাক্ষাৎ করে আসার পর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কারা কর্তৃপক্ষ শেষ সাক্ষাতের জন্য পরিবারের সদস্যদের ডেকে পাঠাবে।

আইনজীবীদের সাক্ষাতের আবেদন : বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় মুজাহিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আবেদন করেছেন। আইনজীবীরা আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় দেখা করার সুযোগ চেয়েছেন গাজী এইচএম তামীম। আইনজীবীদের দলে রয়েছে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম খান, সাইফুর রহমান, মশিউল আলম ও মতিউর রহমান আকন্দ। তাদের আবেদনের বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। আইনজীবীরা জানিয়েছেন তারা আবেদনে উল্লেখ করেছেন পরবর্তী আর কোনো আইনি প্রক্রিয়া আছে কিনা, আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় কিনা এসব বিষয়ে তারা আসামির সঙ্গে পরামর্শ করবেন।

সাকা ও মুজাহিদের বিচার : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা-নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম অভিযোগে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণের পর হত্যা এবং ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবীসহ গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ওই দণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেয়া হয়েছিল। একই রায় এসেছিল সপ্তম অভিযোগে, ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায়। চূড়ান্ত রায়ে চলতি বছরের ১৬ জুন আপিল বিভাগ মুজাহিদের আপিল আংশিক মঞ্জুর করে প্রথম অভিযোগে আসামিকে খালাস দেন। সপ্তম অভিযোগে তার সাজা কমিয়ে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে মুজাহিদের ফাঁসির আদেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত।

অন্যদিকে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল-১ সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রসিকিউশনের আনা ২৩টি অভিযোগের মধ্যে নয়টিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এর মধ্যে চার অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। এ বছর ২৯ জুলাই সর্বোচ্চ আদালত তার আপিল আংশিক মঞ্জুর করে আটটিতে দণ্ডাদেশ বহাল রাখেন, একটিতে সাকা চৌধুরীকে খালাস দেয়া হয়। ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগে চট্টগ্রামের রাউজানে কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, সুলতানপুর ও ঊনসত্তরপাড়ায় হিন্দু বসতিতে গণহত্যা এবং হাটহাজারীর এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তার ছেলেকে অপহরণ করে খুনের ঘটনায় তার সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখা হয়। ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ২০ বছরের কারাদণ্ড বহাল থাকলেও ৭ নম্বর অভিযোগে ২০ বছরের সাজার ক্ষেত্রে আপিল মঞ্জুর করে তাকে খালাস দেন আপিল বিভাগ। ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া পাঁচ বছর কারাদণ্ডের রায় বহাল রাখা হয় চূড়ান্ত রায়ে।

পরবর্তীতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এই দুই যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বহাল সংক্রান্ত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। ওই দিনই রায়ের কপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেয় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল তাদের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে কারাগারে পাঠায়। মৃত্যু পরোয়ানা হাতে পেয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক মুজাহিদ এবং কাশিমপুর কারাগারে আটক সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে তা পড়ে শোনায় কারা কর্তৃপক্ষ। আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আসামিপক্ষ রায়ের কপি হাতে পাওয়ার অথবা আসামিকে মৃত্যু পরোয়ানা জারির বিষয়টি পড়ে শোনানো যেটি আগে হয়, সেই হিসাব ধরে তারা রিভিউ আবেদন করার জন্য ১৫ দিন সময় পান। সেই হিসাবে নির্ধারিত সময়ের ১ দিন আগেই (১৪ অক্টোবর) আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিভিউ আবেদন দায়ের করেন। আর রিভিউ দায়েরের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু পরোয়ানার কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যায়।

এখন রিভিউ খারিজের পর আসামিরা শুধু প্রাণভিক্ষার সুযোগ পাবেন। যদিও যে আইনের অধীনে আসামিদের বিচার হয়েছে সেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রিভিউ ও প্রাণভিক্ষার বিষয়ে কিছুই বলা নেই। এ অবস্থায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আবদুল কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের সুযোগ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এ অবস্থার অবসান ঘটে কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

ওই রায়ে পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মৃত্যু পরোয়ানা কার্যকরের জন্য জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দণ্ডিত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন দাখিলের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সাজা কার্যকরের আগে একবার হলেও তাকে তার স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দিতে হবে। যদি কোনো রিভিউ অথবা মার্সি পিটিশন (ক্ষমার আবেদন) দাখিল করা হয় অথবা অনিষ্পন্ন (পেন্ডিং) থাকে তাহলে আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাজা কার্যকর করা যাবে না। এই পরিবর্তিত শর্তানুসারে জেল কোডের বিধান অনুযায়ী সাত দিন অথবা ২১ দিনের যে বিধান উল্লেখ রয়েছে তার কোনো কার্যকারিতা থাকবে না।

আপিল বিভাগের এই পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এখন তারা রাষ্ট্রপতির কাছে তারা প্রাণভিক্ষার আবেদনের সুযোগ পাবেন। তবে এই আবেদন কত সময়ের মধ্যে করতে হবে তা নির্ভর করবে কারা কর্তৃপক্ষের ওপর। আর যদি তারা প্রাণভিক্ষার আবেদন না করেন তাহলে সরকারের নির্দেশে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের ফাঁসি কার্যকর করবে।

সূত্র যুগান্তর

সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

জন মন্তব্যকারী




Leave a Reply

Inline