সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
শুক্রবার, ২৬ আগস্ট ২০১৬
ইয়ামেন হক: সবাই যে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটুক্তি করা বেআইনি করা নিয়ে খুশি হচ্ছে, এই আইনের মুখ্য বিষয় কিন্তু সেই দুটোর একটাও না। বত্রিশ পাতার খসড়ায় মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে খরচ করা হয়েছে মাত্র এই কয়েকটি লাইনঃ “কোন ব্যক্তি যদি ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা আদালত কর্তৃক মীমাংসিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিষায়বলী এবং জাতির পিতার বিরুদ্ধে যে কোন প্রকার প্রোপ্যাগান্ডা, প্রচারনা বা তাহত মদদ প্রদান করে;” এ ছাড়া কোথাও এই বিষয়ে আর কিছু লেখা নেই।
যেভাবে আছে, সেটা অসম্ভব অস্পষ্ট, এবং (আমার সীমিত লিগ্যাল নলেজ মতে) ইজিলি ওপেন টু ইন্টার্প্রিটেশন। আর এত সহজে ওপেন টু ইন্টাপ্রিটেশন হলে সেই আইন তো ইজিলি এক্সপ্লয়েটেবলও বটে! আর এখানে খালি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ামের কথা বলা। তার মানে কেউ যদি বই, টিভি শো, আলোচনা সভায় বসে ইচ্ছামত ছাগুপনা করে, তাদের ঠেকানোর কোন উপায় নাই। তো ফরহাদ মাজহার এখন সাক্ষাৎকারে যত ইচ্ছা জিয়াকে প্রথম রাষ্ট্রপতি ডাকুক, কোন আইন লঙ্ঘন হবে না?
আরও দুঃখের বিষয় হলো, এখানে গণহত্যার বিষয়টা, বা ‘জেনোসাইড ডিনায়াল’, যেটা আমাদের অনেকের সবচেয়ে বড় দাবী ছিল, সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছুই বলা নেই। এর বাইরে ঘৃণ্য ৫৭ ধারায় যা যা ছিল তার সবই এই আইনের ভিতরেও আছে। অস্পষ্টভাবে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগা’, এই সব বিষয় এখনও এই আইনের ভিতরে আছে। আমরা যারা ৫৭ ধারা বাতিল হোক চাচ্ছিলাম, তাদের এই আইন হতাশ করবে।
আরেকটা ডিস্টার্বিং বিষয় যা এই আইনে উঠে এসেছে তা হলো অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগের বিষয়টা। এই আইনে এমন বিধান আছে যে, এই আইনের অধীনে নিষিদ্ধ, এমন কিছু যদি কেউ দেশের বাইরে থেকে করেন, তাহলে এই ‘আইন এইরুপে প্রযোজ্য হইবে, যেন অপরাধটি তিনি বাংলাদেশেই করেছেন।’
সরলীকরণ করে দেখলে এটা খুবই ইতিবাচক কিছু মনে হতে পারে, কারন এর মানে বিদেশ থেকে চালানো বাঁশের কেল্লা জাতীয় স্বাধীনতাবিরোধী পেইজগুলোর অ্যাডমিনদের এখন এই আইনের আওতায় আনা যাবে।
কিন্তু একটু গভীরে চিন্তা করলে, এই অতিরাষ্ট্রিক বিধানটা কিন্তু খালি মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে নয়, এই আইনের অধীনে যে কোন কিছুর জন্যই প্রযোজ্য। তার মানে আপনি, আমি, সবাই যা ফেসবুকেতে লিখছি, টুইট করছি, ইউটিউবে আপলোডাচ্ছি, সবই লিগ্যালি ওপেন টু ইন্টার্প্রিটেশন হয়ে যাবে। যাই লিখি, যদি বাংলাদেশে কারো ‘অফেন্সিভ’ লাগলো, ইজিলি মামলা ঠুকে দিবে, আর পরেরবার দেশে গেলে মামলা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি বা (ওয়ার্স্ট কেস সিনারিও) জেল হাজত…।
সবচেয়ে বাজে বিষয় হলো, যদি বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আবার কখনও সামরিক বা স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই আইন তাদের জন্য সোনায় সোহাগা।
পুরো আইনেই ইলেক্ট্রনিক বাকস্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে হরণের সব মালমশলাই আছে, শুধু বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লাইনটা বদলিয়ে নিবে, বা নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে ইন্টার্প্রেট করে নিবে। হয়ে গেলো, তখন আঘাতটা একাত্তরের চেতনা বুকে ধরা মানুষরাই খাবো।
এখানে যদি আশার কোন কথা থাকে, তাহলে এইটাইঃ আমি যেটা পড়েছি সেটা হলো খসড়া, এবং এই আইন এখনও প্রস্তাবনার ধাপে আছে। আশা করবো আওয়ামী লীগ সরকার একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখবে।
এই আইনের অনেক অনেক লুপহোল, অনেক কিছুর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন, এবং আশা করবো এই আইন বাস্তবনার মুখ দেখার আগে আরও অনেকগুলো ইতিবাচক সংশোধনের মধ্যে দিয়ে যাবে। যেভাবে আছে, সেভাবে এই আইন শুভঙ্করের ফাঁকি ব্যতীত আর কিছু না। এবং দুঃখিত, কিন্তু এই আইন যেভাবে আছে, এতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষদের খুব বেশি খুশি হবার মত কিছু নেই। বরং ভবিষ্যতে এই একই আইনের কি বাজেভাবে অপপ্রয়োগ হতে পারে, সেটা নিয়ে শঙ্কিত হবার যথেষ্ট কারন আছে।
*লেখক ইয়ামেন হক- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য সুপরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ডূ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে বর্তমানে পেনসিলভেনিয়াতে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। খোলা কলামে প্রকাশিত উপরে উল্লেখিত লেখাটি লেখক ইয়ামিন হকের নিজস্ব একান্ত মতামত। এর সাথে সিটিজিবার্তা২৪ডটকম এর সম্পাদকীয় নীতির সাথে কোন সম্পৃক্ততা নেই।



You must log in to post a comment.