সিনিয়র প্রতিবেদক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
আপডেট: ৫ এপ্রিল ২০১৬ মঙ্গলবার ২০:৫৩ ঘন্টা

বাঁশখালী গন্ডামারায় গুলিবিদ্ধ এবং এ গঠনায় নিজের চোখের সামনে পুলিশের গুলিতে নিজের বাবাকে নিহত হতে দেখা শিশু আরাফাত।
বাঁশখালী গন্ডামারা থেকে ফিরে : গতোকাল সোমবার (৪ এপ্রিল) বিকেল ৪টা বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়ন। তখন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে হাজার হাজার এলাকাবাসীর বিক্ষোভ মিছিল চলছিল। কিন্তু কিছু বুঝার আগেই সামনে এবং পিছন থেকে গুলি বর্ষন হচ্ছিলো। গুলি থেকে নিজের জীবন বাঁচাতে তখন সমবেত জনতা চারিদিকে ছুটাছুটি করছেন। কেউ গাছের পিছনে, কেউ কচুগাছের ঝোঁপঝাড়ে, আবার কেউ পাশের স্কুলের ছাদে কিংবা ভিতরে লুকিয়ে। সবরাই কোনও রকম একটি চেষ্টা কোনোরকমে গুলিতে বেঁচে যেন নিজের প্রাণটা রক্ষা পায়।
কিন্তু এর মধ্যে রাস্তার মাঝখানে পড়ে যান গণ্ডামারা ইউনিয়নের চরপাড়ার মৃত বশীর আহমেদের তৃতীয় পুত্র আনোয়ারুল ইসলাম (৬০)। তখনও সামনে-পিছনে মুহু মুহু গুলির শব্দ আর মানুষের দিকবিদিক ছোটাছুটি। ওই সময়ে পাশেই ছিলেন আনোয়ারুল ইসলামের মাদরাসা পড়ুয়া ৮ বছরের ছোট ছেলে মো.আরাফাত। এসময় ছররা গুলি বুকে, পিটে লাগল আনোয়ারুল ইসলামের। রক্ত ঝরতে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরে বাবাকে বাচাঁতে চেয়েছিল ছোট্ট শিশু আরাফাত।
কিন্তু ততক্ষনণ এদিক-সেদিক ছুটে আসা অসংখ্য গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে তার বাবার পুরো শরীর। এসময় ছুটে আসা ছররা গুলি বিদ্ধ হয় শিশু আরাফাতের হাত ও বুকে। আর তাতেই অজ্ঞান হয়ে যায় সে। ঘাতকের বুলেটের আঘাতে ঘটনাস্থলে নিহন হন আনোয়ারুল ইসলাম। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আরাফাত। তবে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নিহত আনোয়ারুল ইসলাম নিকট আত্মীয়ের হাতে তুলে দেন নিজ পুত্র আরাফাতকে। আর সেই আত্মীয় অজ্ঞান অবস্থায় ছোট আরাফাতকে কোলে তুলে নিয়ে কোনও রকমে বাড়িতে নিয়ে আসেন। বাবার বুকে লুটোনো আরাফাত জ্ঞান ফিরে পেলেও, বাবাকে আর জীবিত পায়নি সে।
নিহত হওয়ার একদিন আগেও মৃত আনোয়ারুল ইসলাম তাঁর ছোট ছেলে আরাফাতকে পাশের হেফজখানায় ভর্তি করে দিবেন বলে বলেছিলেন। আরাফাত পাজামা, টুপি পড়ে মাদ্রাসায় গিয়ে হাফেজ হবেন, মৌলাভী হয়ে মসজিদে নামায পড়াবেন সেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন তিনি। কিন্তু হায়! আনোয়ার বেঁচে থেকে তাঁর ছোট ছেলেকে আর হেফজখানায় ভর্তি করিয়ে মৌলাভী বানানোর স্বপ্ন পূরণ করে যেতে পারলেন না। কারণ এর আগেই পরপারের বাসিন্দা হয়ে গেছেন তিনি। তবে এরআগে থেকে বাড়ির পাশের একটি মাজারের এতিমখানায় পড়ালেখা করতো শিশু আরাফাত।
সোমবার রাত ১০টার কাছাকাছি। গণ্ডামারা ইউনিয়নের আশরাফ আলির কাঁচা বাড়ি। বাড়ির সামনে বড় উঠোন, মাঝখানে জ্বলছিল তখন সৌরবিদ্যুতের বাতি। বাতি জ্বললেও বাড়ির কান্না আর আহজারিতে ভরা আলোতে নেমে এল যেন বিদঘুটে অন্ধকার। কারণ ওই বাড়ির তিনজনই প্রাণ দিয়েছেন বাপ-দাদার বসতভিটা রক্ষা করতে গিয়ে। ওই বাড়ির একজন হলেন মৃত আনোয়ার ইসলাম।
এসময় সাংবাদিকে এসেছে জেনে নিজেদের ক্ষোভ ও বঞ্চনার কথা জানাতে ছুটে এসেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সামনে এসেই মৃত আনোয়ারুল ইসলামের স্ত্রী কোহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ে রিপা, রিনা ও মুন্নী কান্নায় ভেঙে পড়েন। এসময় ছোটো ছেলে আরাফাতও অমলিন মুখে ভয়ের চাপ নিয়ে কি যেন আমতা আমতা করে বলতে চাইলো।
আরাফাতের ভাষায়, তার বাবা আনোয়ারুল ইসলামের বুকে ছররা গুলি লাগায় রক্ত ঝরছিল। তা দেখে আরাফাত বুকে নিয়ে বাঁচাতে চাইলেন বাবাকে। এসময় আরাফাত নিজেও ডান দিকের বুকে ও হাতের উপর ছররা গুলি লেগে আহত হন।
এসময় বিলাপ করতে করতে মৃত আনোয়ারুল ইসলামে স্ত্রী কোহিনুর বেগম জানান, নিহত আনোয়ারুল ইসলামের রিপা, রিনা ও মুন্নী নামে তিন মেয়ে ও আরাফাতসহ মোট চারজন সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে মুন্নী একটি মাদরাসায় পড়ালেখা করলেও অন্য দুই মেয়ে রিপা ও রিনা বিবাহ সম্পন্ন হলেও টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারছেন না। আর ছোট ছেলে ৮ বছরের আরাফাত স্থানীয় একটি মাদরাসায় পড়ছেন। এসময় তার তিন মেয়ের চোখে মুখেও হতাশার ছাপ দেখা গেছে।
নিহতের স্ত্রী কোহিনুর বেগম জানান, নিহত হওয়ার একদিন আগে আরাফাতকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাবেন বলছিলেন। তার বাবা চেয়েছিলেন আরাফাত পাজাম আর টুপি পড়ে মাদ্রাসায় যাবেন। মৌলবি হয়ে মসজিদে নামায পড়াবেন। কিন্তু তার বাবার স্বপ্ন আর পূরণ হল না।
