শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫
সিটিজিবার্তা ২৪ ডটকম
বলা হয়ে থাকে প্রেমের মরা জলে ডুবে না । প্রেম স্বর্গীয়, ভালবাসা মানে না কোন জাত পাত । পৃথিবীতে যুগে যুগে এমন হাজার কাহিনী ঘটে চলেছে বা গিয়েছে । বিভিন্ন লেখক ও উপন্যাস রচনা করেছেন যেমন , রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট, ওথেলো, শিরিন – ফরহাদ। বাদশা শাহাজান প্রেমের নিদর্শন হিসেবে তার স্ত্রীর জন্য নির্মাণ করে গিয়েছেন তাজমহল যেটি একনো মানুষের মনে দাগ কেটে রয়েছে। বলা হয়ে থাকে শাহাজান তাজমহল নির্মাণ করার পর সকল শ্রমিকদের হাতের আঙুল কেটে দিয়েছিলেন যাতে এই দুনিয়াই আর কোন দ্বিতীয় তাজমহল নির্মাণ না হয় ।
বিখ্যাত নাট্যকার সেক্সপিয়ার রচনা করেছেন রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট। এটি একটি বিয়োগান্তক প্রেমের কাহিনী। পাঠক অবশ্যই জানেন ইউসুফ আর জুলেকার কাহিনী। আজ সত্যি একটি বেদনাদায়ক প্রেম কাহিনী পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম ঃ
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের ঘটনা । কলকাতার সুদর্শন পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্রাচাজ্জ তৎকালীন সময়ে অতি ভয়ংকর দুর্গম এলাকা টেকনাফ থানায় বদলি হয়ে আসেন। সবুজ পাহাডে ঘেরা টেকনাফ থানা অদূরে সমুদ্রের নীল জলরাশি । থানায় তেমন কাজ ছিলনা ফলে এদিক সেদিক ঘুরে সময় কাটাতেন । থাকতেন থানার আধাপাকা ঘরের একটি কক্ষে । একদিন সকালে একাদিক নারী কণ্ঠের শব্দে ধীরাজের ঘুম ভেঙ্গে যায়। থানার ছোট বারান্দায় এসে দেখেন রঙ – বেরঙের ফতুয়া ( থামি – ব্লাউস ) পরিহিতা ৬০ – ৭০ জন মগী রাখাইন তরুণী পাত কুয়ার চারিদিকে ঘিরে হাসি গল্পে মশগুল ।
তাদের কলকল শব্দে থানা প্রাজ্ঞন মুখরিত । আর এটিই ছিল সমগ্র টেকনাফে একমাত্র কুয়া। যেখান থেকে সকলে পানি নিতে আসত। প্রতিদিন তরুণীরা পাতকুয়ার পানি নিতে আসতেন । আর সুদর্শন ধীরাজ থানার বারান্দায় চেয়ারে বসে তরুণীদের জল তোলার দৃশ্য দেখতেন । একদিন তার নজরে আটকাল দেখতে খুব সুন্দর এক তরুণীর প্রতি। সে অন্য তরুণীদের চেয়ে আলাদা ও সাজে সজ্জিত। সুন্দরী এই তরুণীর চেহারা দেখতে অবিকল বাঙালি মেয়েদের মতই ।
মেয়েটির নাম ছিল মাথিন। টেকনাফের জমিদার ওয়ান্তিনের একমাত্র মেয়ে। প্রথম দেখাতে মাথিনকে ভাল লেগে যায় ধীরাজের । প্রতিধিন ভোঁর হওয়ার আগেই ধীরাজ থানার বারান্দায় চেয়ারে বসে মাথিনের জন্য অপেক্ষা করতেন । মাথিন যখন কলসি কাঁধে হেলে দুলে থানা প্রাঙ্গন দিয়ে হেঁটে আসতেন ধীরাজ তখন মুগ্ধ হয়ে সে দৃশ্য উপভোগ করতেন । অন্যান তরুণীরা আসার আগেই মাথিন পাতকুয়ায় আসতেন এবং পানি নিয়ে ফিরে যেতেন ।
সকালের মিষ্টি আলোয় নীরব শীতল পরিবেশে একে অপরের দিকে গভীর প্রেম ও মায়ায় আচছন্ন হয়ে থাকতেন । পরস্পরের দিকে সকল কল্পনার জাল বুনতেন দুজনেই কিন্তু কেউ কারও সাথে কথা বলতে পারতেন না । কারন কেউ কারও ভাষা বুঝে না , তাতে কি প্রেম করতে কি আর ভাষা বুজতে হই । চোখের ভাষা যে মনের কথা বলে । দেখা দেখি এরূপ করতে করতে দুজনের মধ্যে গভীর প্রেম স্থান নেয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মনের ভাব। অবশেষে সকলে তাঁদের প্রেমের কথা জেনে যায়। নানা বাঁধা শর্তেও দুজনের বিয়ের কথা পাকাপোক্ত হয়।
এরই মাঝে কলকাতা থেকে ধীরাজের কাছে তার বাবার চিঠি আসে। তাকে কলকাতায় যেতে হবে এক মাসের ছুটি নিয়ে । ছুটি না পেলে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে যেতে হবে বাবার কঠিন নির্দেশ । দু টানার সম্মুখীন ধীরাজ একদিকে বাবার নির্দেশ আর অন্যদিকে প্রেমিকার মায়া। চিন্তিত ধীরাজ সিধান্ত নিলেন তিনি কলকাতা যাবেন। তার এ সিধান্তের কথা মাথিনকে জানালেন কিন্তু মাথিন রাজী হলেন না। তাই অনেকটা জোর করে ধীরাজ এক সন্ধ্যায় টেকনাফ থেকে পালিয়ে গেলেন কলকাতায় ।
ধীরাজের এভাবে চলে যাওয়াকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেন নি মাথিন । মাথিন ধরে নিলো ধীরাজ বিয়ে করার ভয়ে পালিয়েছে। প্রেমিক ধীরাজের এভাবে চলে মাথিন কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি । এই ক্ষোভে ও কষ্টে মাথিন খাদ্য পানি ত্যাগ করে খুবই অসুস্থ হয়ে গেলেন। জমিদার বাবা ওয়াথিনসহ পরিবারের সদস্যরা শত চেষ্টা করেও এক ফোঁটা পানি পান করাতে পারেনি মাথিনকে ।
তার এক কথা ধীরাজকে চাই চাই । এই বিচছেদে এবং কষ্টে একদিন মাথিন মারা যায়। নিজেকে করে যায় ট্র্যাজিক নায়িকা। রেখে যায় ভালবাসার এক নিদর্শন ‘’মাথিনের কূপ’’।
টেকনাফের ‘মাথিনের কূপ’ আজ কালজয়ী এক ট্র্যাজিক ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে চলেছে।
মোঃ রাশেদুল করিম
সিইও, সিটিজিবার্তা ২৪ ডটকম












































