শিরোনাম

বন্দরের টাকায় ‘অভিজ্ঞতা’ অর্জনের নামে ‘আনন্দ ভ্রমণ’

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৫

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

Chittagong-port

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম বন্দরের টাকায় ‘অভিজ্ঞতা’ অর্জন করতে যাওয়ার জন্য উল্লেখ করে অতীতের ন্যায় এবারও তিন দেশের পাঁচটি সমুদ্র বন্দর পরিদর্শনে যাচ্ছেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। বন্দরের সরকারি টাকায় যাওয়া এসব সফর নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও সেদিকে দৃষ্টিগোছর না করে সরকার সমর্থিত কিছু নতুন মুখ যুক্ত করা হয়েছে ‘অভিজ্ঞতা’ অর্জনের এই সফরে। অথচ এ সফর নিয়ে বন্দর সংশ্লিষ্টরা অভিহিত করছেন মূলত সরকারি টাকায় ‘আনন্দ ভ্রমণ’ হিসেবে ।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্বের সমুদ্র বন্দর পরিদর্শনের উপর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটি প্রতিনিধিদল আজ মঙ্গলবার রাত ৯ টা ৫ মিনিটে মরিশাসের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্র বন্দরের অবকাঠামো ও অপারেশনাল কার্যক্রম এবং বন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা, বন্দরের নাব্য রক্ষার কৌশল ও সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান লাভ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। এ সময় তারা মরিশাস, মিশর, যুক্তরাষ্ট্রের লস্ এঞ্জেল্স ও নিউইয়র্ক সমুদ্র বন্দর সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন।

প্রতিনিধিদলে রয়েছেন, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম, সদস্য মো. আব্দুল হাই, এম আব্দুল লতিফ, মো. আনোয়ারুল আজীম (আনার), মো. নুরুল ইসলাম সুজন, চট্টগ্রাম বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ.জ.ম. নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর জুলফিকার আজিজ, মন্ত্রীর একান্ত সচিব এমএম তারিকুল ইসলাম এবং সভাপতির একান্ত সচিব ড. দয়াল চাঁন মণ্ডল।

 

তবে এই সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বন্দরের কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তা না হলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন ও পটিয়ার সাংসদ শামসুল হক চৌধুরী বিদেশ সফরে গিয়ে যে ‘অভিজ্ঞতা’ অর্জন করবে সেটি বন্দরের উন্নয়নে কতটুকু কাজ দেবে। বন্দরের টাকায় এই ধরণের বেশ কয়েকটি সফর করে আসা বন্দরের সাবেক এক কর্মকর্তার মতে, এই ধরণের বিদেশ সফর করে বন্দর পরিদর্শন করে আসা কর্মকর্তাদের কোনো অভিজ্ঞতায়ই চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো কাজে আসে না। এটি শুধুমাত্র সংসদীয় কমিটি ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরকারি টাকায় ‘আনন্দ ভ্রমণ’ মাত্র।

তবে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের দাবি, এসব সফর নিয়ে সমালোচনা থাকলেও ভ্রমণ শেষে অর্জিত ‘অভিজ্ঞতা বন্দরের উন্নয়নে’ ভবিষ্যতে অনেক উন্নয়নের কাজে লাগানো যায়। আবার অতীতের ধারাবাহিকতায় নতুন মুখকে সুযোগ করে দেয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন মন্ত্রী।

Ctg-port

এ ব্যাপারে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, এ সফর বন্দরসমূহের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত কাজের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এছাড়া প্রতিনিধিদল বিভিন্ন সমুদ্র বন্দরের বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করবে। এসব তথ্য দেশের সমুদ্র বন্দরসমূহের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

এছাড়া ‘সফলভাবে পরিচালিত’ বন্দরের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ এবং তা বাংলাদেশের বন্দর সমূহের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য প্রতিনিধিদলে মন্ত্রণালয়ের বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) দেশ ত্যাগ করে প্রতিনিধি দলটি ১১ নভেম্বর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তবে এরমধ্যে নৌমন্ত্রী সহ প্রতিনিধি দলের কয়েকজন ওই দিন ফিরে আসলেও অনেকে আরো কয়েকদিন নিউইর্য়ক থাকার কথা রয়েছে।

মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্মকর্তারা বন্দর পরির্দশন করে অভিজ্ঞতার নামে মূলত আনন্দ ভ্রমণেই যাচ্ছেন বলে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অভিযোগ করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা। এর আগেও সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, কেনিয়া ও সিঙ্গাপুর, চীন সফর করেছে বন্দরের একাধিক প্রতিনিধি দল। এ সফরের যাবতীয় ব্যয় বন্দরের প্রশিক্ষণ খাত থেকে যোগানো হচ্ছে। যাতায়ত সময় বাদে ৮ দিনের এই সফরে বন্দরের প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানা গেছে। এবারের প্রতিনিধি দলের সদস্যদের অনেকেই ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের বন্দর পরিদর্শনে করছেন। এরপরও তাদের ‘অভিজ্ঞতা’ অর্জনে বিদেশ সফরে পাঠানো হচ্ছে।

ctg-port-_ctgbarta24

তাই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বন্দরের অর্থে এই সফরকে আরেকটি আনন্দভ্রমণ বলে মন্তব্য করেছেন। এছাড়া বন্দরের টাকায় ২০০৫ সালের জুনে বন্দরের একটি প্রতিনিধিদল সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, মিশর এবং সৌদি আরব, ২০১১ সালে আবার আরব আমিরাত ও সৌদি আরব আর ২০১৪ সালের নভেম্বরে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চীন সফরে গিয়েছিল। এসব ভ্রমণে বন্দরের লাখ লাখ টাকা খরচ হলেও উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

চট্টগ্রাম বন্দরের উপদেষ্টা কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘২০১২ সালে বন্দর উপদেষ্টা কমিটি গঠন হলেও এ পর্যন্ত ১০টির মত সভা হয়েছে। তবে এসব বৈঠকের সিদ্ধান্ত তেমন কোনো কার্যকর হয়েছে বলে আমার মনে হয়না। এখন দেখছি অতীতের ধারাবাহিকতায় বন্দরের টাকায় সংসদীয় কমিটির সদস্যদের সাথে দু’জন উপদেষ্টা কমিটির সদস্যকেও বিদেশ সফরে নেয়া হচ্ছে। মূলত নৌমন্ত্রীর সাথে গভীর সখ্যতার কারণেই তাদের এই সফরে রাখা হয়েছে। এসব সফর দিয়ে কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতায় বন্দরের লাভ হলেও উপদেষ্টা কমিটির সদস্যদের দিয়ে বন্দরের কী লাভ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’

chittagong-port-news-ctgbarta24

তিনি আরো বলেন, ‘এখন বন্দরের সব কিছুই ওদের (আ জ ম নাছির উদ্দিন ও শামসুল হক চৌধুরী) হাতে। চেয়ারম্যান থেকে মন্ত্রী সব কিছুই তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। সেজন্য তাদের খুশি করতে এই ভ্রমণে এই দুজনকেও রাখা হয়েছে। তবে ভাই আমার নাম প্রকাশ করবেন না।’

প্রতিনিধি দলের হয়ে একাধিকবার বিদেশি সমুদ্র বন্দর সফরকারী চট্টগ্রাম বন্দরের অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ এক কর্মকর্তা নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের নামে আমিও বন্দরের টাকায় একাধিকবার বিদেশি সমুদ্র বন্দর পরিদর্শন করেছি। কিন্তু সেই সফর থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞা বন্দরের উন্নয়নে তেমন কোনো কাজে আসেনি। তবে সেটি বলছি বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কথা, আর যদি সরকার দলীয় এমপি বা তার সম পর্যায়ের কেউ অভিজ্ঞতার জন্য বিদেশ সফর করে সেটি একেবারেই ভূয়া কথা। তারা কোন কাজে কীভাবে বন্দরে অর্জিত এসব অভিজ্ঞতা শেয়ার করবে ? সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।’

ctg-port-handeling-ctgbarta24

বন্দরের সাবেক এ কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘বন্দরের প্রশিক্ষণ ব্যয়ের তহবিল থেকে ব্যয়কৃত এসব টাকা বিদেশ সফরে গিয়ে খরচ না করে বরং বন্দর ব্যবহারকারী, শিপিং এজেন্ট, ব্যবসায়ী, শ্রমিক নেতা, অপোরেটর, বন্দর বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে মুক্ত আলোচনা ও সেমিনার করা উচিত। প্রয়োজনে এমপি মন্ত্রীদের বিদেশ সফরে না পাঠিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বন্দর বিষয়ে অভিজ্ঞ লোক এনে এখানে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত ওই টাকায়।’

এই ধরণের সফরের সুফল সম্পর্কে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেন, ‘বিদেশি বন্দর সফর করে আসার পর সেখান অর্জিত অভিজ্ঞতা বন্দরের উন্নয়নে কাজ দেবে। তবে হ্যাঁ কাজ করতে গেলে সমালোচনা হবে। সমালোচনাকে পাস কাটিয়েই আজকে চট্টগ্রাম বন্দরকে এই অবস্থানে নিয়ে আসতে পেরেছি।’

চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বাইরে স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানসহ বেশ কয়েকজন সদস্য ও উপদেষ্টা কমিটির দুই সদস্য এই সফরে গিয়ে বন্দরের কী লাভ হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে নৌমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন, আমি ছাড়া এবারের প্রতিনিধি দলে বেশিরভাগই নতুন। স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানসহ সদস্যরা মন্ত্রণালয়ের যে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক সময় দ্বিমত পোষণ করেন। কিন্তু বন্দরের কার্যক্রম নিয়ে যদি তারা আরো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে তাহলে এই সমস্যটার কিছুটা সমাধান পাওয়া যাবে। তখন মাননীয় সংসদ সদস্যরা তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন। এছাড়া গতবারের কমিটির সকলে বিদেশ সফর গেলেও এবারের কমিটির কেউ বিদেশ সফরে যাননি। তাই এবার তাদের নেয়া হচ্ছে।’

উপদেষ্টা কমিটির সদস্য আ জ ম নাছির উদ্দিন ও শামসুল হক চৌধুরীর সফর প্রসঙ্গে শাহাজাহান খান বলেন, ‘আসলে উপদেষ্টা কমিটির দুই সদস্য সেখান থেকে এসে কী অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন এখন সেটা তাদের বিষয়। আগেও উপদেষ্টা কমিটির কয়েকজন সদস্যকে বিদেশ সফরে নেয়া হয়েছে বিধায় তার ধারাবাহিকতায় এ দুজনকেও নেয়া হচ্ছে।’

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম/এমকে  প্রকাশিত সময় ০৭ঃ৩২ ঘণ্টা   আপডেট সময় ১০ঃ১৭ ঘণ্টা

সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

জন মন্তব্যকারী




Leave a Reply

Inline