সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম
এ কে এম জাকারিয়া । ০৩ জুলাই ২০১৬
গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির ভবিষ্যৎ কী কে জানে। এর লনে বসে লোকজন কি আবার চা-কফি খাবেন? এর ‘ও কিচেন’ রেস্টুরেন্টটি কি আবার জমজমাট হবে? নিয়মিত বা কোনো না কোনো সময়ে সেখানে গিয়েছেন এমন লোকজনের কাছে গত শুক্রবার রাতে জঙ্গি হামলার খবরটি ভিন্নভাবে হাজির হয়েছিল। চেনা জায়গায় এমন ঘটনা! তাঁদের অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে হয়েছে, আমিও তো এর শিকার হতে পারতাম!
শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া বর্বরতার যে খবরগুলো এখন আমরা জানি, তার সবটুকুই ঘটেছে ‘ও কিচেন’ রেস্টুরেন্টের ভেতর। আমি একবারই সেখানে গিয়েছি। হয়তো সামনে আবার কোনো দিন যেতাম বা কখনোই যাওয়া হতো না, আবার সেদিনও সেখানে থাকতে পারতাম!
শুক্রবার রাতে টিভির সামনে বসে ঘটনার লাইভ দেখতে দেখতে এসবই মনে হচ্ছিল। যার সঙ্গে আমরা কোনো না কোনোভাবে নিজেদের যোগসূত্র পাই, তা আমাদের বেশি স্পর্শ করবে, এটাই তো স্বাভাবিক।
তখনো আসলে জানি না যে একেবারে নিজের বন্ধু-স্বজনেরাই সেখানে আটকা পড়েছেন। হামলাকারীরা যে মূলত বিদেশিদেরই মারতে চেয়েছিল, সেটা আমরা এখন ধরে নিতে পারি।
যে তিনজন বাংলাদেশি মারা গেছে, শনিবার সকালে নিশ্চিত হলাম, তাদের দুজনই আমার ব্যক্তিগত পরিচিত। ফারাজ হোসেনের আটকে পড়ার খবর রাত থেকেই জানি। তার অক্ষত মুক্তি মিলবে, সে আশায় সারা রাত কেটেছে। অসম্ভব বিনয়ী ও মেধাবী এই তরুণের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল রোজার ঠিক আগে আগে, এক অনুষ্ঠানে। কে জানত সেটাই ছিল শেষ দেখা।
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ইমোরি ইউনিভার্সিটিতে যে ছাত্র পড়ে, তাকে মেধাবী না মেনে উপায় নেই। কিন্তু কারও ভদ্রতা আর বিনয়ের বিষয়টি আপনি টের পাবেন যখন তাকে ব্যক্তিগতভাবে জানবেন। এখন তার মৃত্যুর পর আমরা টের পেলাম কতটা সাহসী আর মানবিক ছিল এই তরুণ। সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল সে, কিন্তু রাজি হয়নি বন্ধুদের ফেলে আসতে। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আর স্বার্থের এই যুগে এই তরুণের প্রতি তো শুধু মায়া বা ভালোবাসা নয়, শ্রদ্ধাও জাগে!
ইশরাত আখন্দও যে শুক্রবারের সেই ভয়াবহ রাতে সেখানে ছিলেন, তা জানা ছিল না। শনিবার সকালে তা জানলাম তাঁর মারা যাওয়ার খবর পেয়ে। ইশরাতের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও পরিচয় ছিল। চিত্রকলা বিষয়ে ও সংগ্রহে তাঁর আগ্রহ ছিল। একটি গ্যালারিও দিয়েছিলেন। মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানে। একজন পেশাজীবী নারী।
আমার মনে পড়ে, বেশ আগে ওয়েস্টিন হোটেলের পেছনে তাঁর ঢাকা আর্ট গ্যালারিতে আমি গিয়েছিলাম, আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। চিত্রকলা নিয়ে তাঁর আগ্রহের কথা জেনেছি। এরপর নানা প্রদর্শনী ও গ্যালারিতে দেখা হতো। সব সময়েই হাসিমাখা এক মুখ। আর ফেসবুকের এই যুগে তো আমরা সবাই সবার নানা কিছু খোঁজখবর পাই।
কয়েক দিন ধরে আকাশের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করছিলেন। ইশরাত আমাদের অনেকের বন্ধু, অনেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁদের কাছে ইশরাতের কথা অনেক শুনেছি। তাঁর নানা গুণের কথা জেনেছি।
এখন আরও জানছি। এক বন্ধুর কথায় ‘ফুল অব লাইফ’ ‘হাসিখুশি’ ‘আর্ট পাগল’, ‘ফুড পাগল’ একটা মেয়ে হচ্ছেন ইশরাত।
এক বন্ধু জানালেন, অসাধারণ রান্না করতেন ইশরাত, বিশেষ করে দেশি খাবার। এমন ইশরাতের মৃত্যু তাঁর বন্ধুরা মেনে নেন কীভাবে!
যে জায়গায় একবার গিয়েছি, সেখানে সন্ত্রাসী হামলা দেখে প্রথমে বিপর্যস্ত হয়েছি। বন্ধুর স্বজন আটকা পড়েছেন দেখে দম আটকে এসেছে। সারা রাত নির্ঘুম কেটেছে। শেষ পর্যন্ত তাঁদের হারাতেই হয়েছে।
ফারাজের পরিবারকে জানি, ইশরাতের বন্ধুদের। আমাদের যা কষ্ট, যা খারাপ লাগা, তা দিয়ে কি আমরা ফারাজের পরিবারের কষ্টটা টের পাব, অথবা ইশরাতের বন্ধুদের হাহাকার!
লেখক : এ কে এম জাকারিয়া
সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক প্রথম আলে



You must log in to post a comment.