সোমবার, ০১ আগষ্ট ২০১৬
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
‘ও কারিগর দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়
চান্নি পশর রাইতে যেনো আমার মরণ হয়।’
নিজের লেখা এই গান নাকি হুমায়ূন আহমদের মগজে এমনভাবে সিঁধে গিয়েছিল যে অসম্ভব জোৎস্নাপ্রেমী এই বহুমুখী প্রতিভা জীবনের অস্তালগ্নে চাঁদ দেখলেই ভয়ে কেমন দিশেহারা হয়ে দু’হাতে মুখ ঢাকতেন। আগস্টও আমাদের জীবনে দিশেহারা হবার মাস- দু’হাতে মুখ লুকোবার মাস।
বাঙালির জীবনে হাজার বছরের চেয়েও লম্বা মাস আগস্ট। লক্ষ লক্ষ টন ভারী আগস্টের ভার বাঙালি আর কতদিন বইবে! ৪১ বছর আগে ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে কালের মহানায়ক-মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তস্নাত বিদায়কে সকল বিদায়ের ঊর্ধ্বে রাখে বাঙালি-বাংলাদেশ। এখনো আগস্ট এলে শোকাতুর শ্রাবণের আকাশ অবিরাম কাঁদতে থাকে, তার চোখ ফেটে ঝরতে থাকে বেদনার নীল অশ্রু। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকায়, গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ শুনে চমকে উঠি। দুয়ারে কড়া নাড়ে আগস্ট! আগস্ট মানেই তো বুটের আওয়াজ, গ্রেনেডের শব্দ, অসহায় জাতির করুণ আর্তনাদ। ওহ! কি করে ভুলি আগস্টের কথা! আমি যে বাঙালি। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা ‘আমার পরিচয়’ মনে করিয়ে দেয়ঃ
এই ইতিহাস ভুলে যাব আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান,
আমাদের নিরক্ষর গৃহ পরিচারিকা তানিয়া শেখ মুজিবকে চেনে না। টেলিভিশনে শিল্পী শাহাবুদ্দীনের আঁকা ছবি দেখে জিজ্ঞেস করে দৈনিকই এই লোকটার ছবি দেহি, মাজে মইদ্দে লোগ(আঙ্গুল) উঁচো করে কি জ্যানি কয়, লোকটা কিডা? আমি লোকটির নাম বলে যোগ করলাম তাঁকে খুন করা হয়েছিল। আঁৎকে উঠে জিজ্ঞেস করে, আহারে! কিডা মারলো মামা? বললাম আমি। আমরাই খুন করেছি। মেয়েটি হাসে, হাসতে হাসতে চলে যায়। আমি আউরাইঃ
তুমি হাত উঁচু করে দাঁড়ালে, বুক প্রসারিত করে কী আশ্চর্য
আহ্বান জানালে আমাদের। আর আমরা তখন?
আমরা তখন রুটিনমাফিক ট্রিগার টিপলাম।
তোমার বক্ষ বিদীর্ণ করে হাজার পাখির ঝাঁক
পাখা মেলে উড়ে গেল বেহেশতের দিকে…।
. . . তারপর ডেডস্টপ।
[নির্মলেন্দু গুণ, সেই রাত্রির কল্পকাহিনী/ কাব্যগ্রন্থ ’তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’ প্রথম প্রকাশ:১৯৭৯ থেকে]
শুধু কি শেখ মুজিব! বাংলা ভাষা ও সাহিত্য রবি হারা (৭ মে, ১৮৬১-৭ আগস্ট,১৯৪১) হলো আগস্টে। প্রেম আর দ্রোহের নির্বাক কবি নজরুল (২৪ মে, ১৮৯৯-২৯ আগস্ট,১৯৭৬)চলে গেলেন আগস্টে। প্রথার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে হুমায়ুন আজাদ(২৮এপ্রিল ১৯৪৭-১১ আগস্ট, ২০০৪) কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু হয়ে ঝরে পড়লেন, সেও আগস্টে। স্বাধীনতার যমজ কবিতা প্রসব করে আসাদের শার্ট গায়ে চাপালেন নিঃসঙ্গ শেরপা, আরবান কবি শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর, ১৯২৯-১৭ আগস্ট, ২০০৬)। ভেবেছিলেন এ যাত্রা পার পাবেন, কিন্তু গ্রেনেডের কাছে স্যারেন্ডার করে আগস্টের জালেই বন্দী হলেন আইভি রহমান (৭ জুলাই, ১৯৩৬-২৪ আগস্ট, ২০০৪)। প্রিয়তম ক্যামেরাকে নিঃসঙ্গ করে মিশুক মুনীর (আশফাক মুনীর-২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৯- ২০১১), আর খাঁচা ভেঙে উড়াল দেয়া মাটির ময়না তারেক মাসুদ(৬ ডিসেম্বর, ১৯৫৬-২০১১) মুক্তির গান গাইলেন একই দিনে, আগস্টের আনলাকি থার্টিনে। ক্যাথরিন মাসুদ এই দুইজনকে বলেছেন চলচ্চিত্রের সৈনিক। কারণ সৈনিক যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যায়, মিশুক-মাসুদও চলচ্চিত্র করতে গিয়ে চিরদিনের জন্য কালের মহাসড়কে হারিয়ে গেলেন। এতো নামীদের তালিকা, বহু নাম পরিচয়হীন বাঙালি পিনাকের সাথেই পদ্মার বুকে হারিয়ে গেল, এই আগস্টেই। কাঁদো কাঁদো বাঙালি।
মৃত্যুতো মৃত্যুই। প্রতিটি পরিবার প্রিয়জনকে হারিয়ে সমানভাবেই বিলাপ করে। কিন্তু কিছু মৃত্যু দেশ-মহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো পৃিথবীকে নির্বাক করে দেয়। প্রচণ্ড ক্ষুধাতুর দুধের শিশুর চোখের পানি চোখেই শুকায়।পথহারা পাখিরাও খাবি খায়।মাজারের গা থেকে খসে পড়ে লালসালু। মাতৃজঠোরে আর পদাঘাত করেনা অনাগত সোনামনি।
হ্যাঁ, আমার গন্তব্য ৩২ নং বাড়ী, ৩২ নং সড়ক, বাংলার হৃদপিণ্ড। শেখ মুজিব তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন: ‘ছেলেমেয়েদের জন্য যেন একটু বেশি মায়া হয়ে উঠেছিল। ওদের ছেড়ে যেতে মন চায় না, তবুও তো যেতে হবে। দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে।’ (ঢাকাঃ দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২, পৃষ্ঠা ১৬৪) । দেশের মানুষকে ভালোবেসে চরম ত্যাগই করলেন তিনি। তবে কালের গর্ভে তিনি সমর্পিত হননি, হলেন অকালের বলি।রেহাই পেলনা আট বছরের শাদা পায়রা রাসেলসহ ১৭ জন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৩০২)।
সবার মৃত্যু জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সমানভাবে নাড়া দেয় না। আগস্ট তিন যুগস্রষ্টা মহানায়কের মহাপ্রয়াণ ঘটিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-মুজিবুর। মহামানবের মহাপ্রয়াণ শুধু শোকের উদ্রেক করে না, শক্তিও জাগায়। উন্নত দেশে নাকি মহানদের মৃত্যুদিন শোক দিবস না, স্মরণ দিবস হিসাবে পালন করে। বাংলাদেশেও রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-মুজিবের প্রয়াণ দিবসে জাতি গভীর শ্রদ্ধাভরে তাঁদের স্মরণ করে। আলোচনা সভা করে তাঁদের শিক্ষাকে সবার ভেতরে ছড়িয়ে দেবার দৃপ্ত শপথ নেয়। ইংরেজী অগাস্ট শব্দের আরেকটি অর্থ শ্রদ্ধা উদ্রেককারী। তাই আগস্ট তো আমাদের শক্তি ও সম্ভ্রম জাগানিয়া মাসও।
‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’-রবীন্দ্রনাথের গানই নাকি বালক শেখ মুজিবের মনে অসাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপণ করেছিল।স্বদেশ প্রেম আর সোনার বাংলা অভিধাটিও তাঁর রবি ঠাকুরের কাছ থেকেই পাওয়া। জেলে তাঁর সদা সঙ্গী ছিল সঞ্চয়িতা। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের সঞ্চয়িতা কপিটি জেলে যাবার কালে হাতে নিয়ে যেতেন। ‘কপিটি নাকি জেলের সেন্সরের বহু সিল আর অধিক ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।’(ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ৬/৫/১৪)। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে মুজিবের সহচর আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী শেখ সাহেবের ভেতর রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার প্রতি অসীম অনুরাগ দেখেছেন।রবি-নজরুলই শেখ মুজিবকে নানা সংকট থেকে উত্তোরণের প্রেরণা যুগিয়েছে বারবার। মুজিবের রবীন্দ্র- প্রেম কবিতায়ও জায়গা পেয়েছেঃ
লুঙ্গির উপর সাদা ফিনফিনে ৭ই মার্চের পাঞ্জাবি,
মুখে কালো পাইপ, তারপর হেঁটে গেছে বিভিন্ন কোঠায়।
সারি সারি মৃতদেহগুলি তোমার কি তখন খুব অচেনা ঠেকেছিল?
তোমার রাসেল? তোমার প্রিয়তমা পত্নীর সেই গুলিবিদ্ধ গ্রীবা?
তোমার মেহেদীমাখা পুত্রবধূদের মুজিবাশ্রিত করতল?
রবীন্দ্রনাথের ভূলুণ্ঠিত ছবি?
তোমার সোনার বাংলা?
(নির্মলেন্দু গুণ, সেই রাত্রির কল্পকাহিনী)
রবি-নজরুল-মুজিব-‘বাঙালি পরিচয় বা একই মাসে মৃত্যু তাদের বড় যোগসূত্র নয়; তাদের মধ্যে বড় যোগসূত্র সৃষ্টি করেছিল বিশ্বমানবতা, স্বদেশ প্রেম ও স্বাধিকার চেতনা।’ (আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ইত্তেফাক, ১৫/৮/১৪)
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু লেখার সুযোগ ছিলনা রবীন্দ্রনাথের। তবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের (নভেম্বর ৫, ১৮৭০ – জুন ১৬, ১৯২৫) অকালমৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ’এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’। শুধু দেশবন্ধু কেন, বঙ্গবন্ধুও মৃত্যুহীন। না ফেরার দেশে যাত্রার জন্য বেছে নেয়া প্রিয় মাস শ্রাবণের কোলে নিজেকে ঢেলে দিয়ে রবীন্দ্রনাথও মৃত্যুহীন হয়ে আছেন। মৃত্যুহীন নজরুলও আমাদের দেশপ্রেম ও বিপ্লবের আধার। মনে কয় এই তিনজন মিলেই লিখেছিলেন –
‘মোর লাগি করিওনা শোক
আমার রয়েছে কর্ম
আমার রয়েছে বিশ্বলোক।’
এই তিন মহানই বিশ্ব মানবতা আর শান্তিতে আত্মনিবেদন করেছিলেন। শেখ মুজিব জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার পেয়ে বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু হয়েছিলেন। রবীন্দ্র-নজরুলও মানব মুক্তির গান গেয়ে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখে গেছেন। এদিক থেকেও আগস্ট আমাদের শান্তির দূত শ্বেত পায়রার ডানা ঝাপ্টানোর শব্দ শোনায়।
মহানরাও ভ্রান্তিজনিত সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। মানুষ তো। অনেকেই কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেন না।শুনেছি সলিল চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত গান ‘কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শুনাই শোন’ আমাদের কলিম শরাফীকে দিয়ে গাওয়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গাইলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সত্যজিৎ রায় আহমদ ছফার ওঙ্কার-এর চিত্রনাট্য তৈরির কথা দিয়েছিলেন।তা আর হলো কোথায়। শেখ মুজিবের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সর্বাধিক উচ্চারণ, ‘শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না’(পৃষ্ঠা, ১২৬)। কিংবা ‘বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে।’ (ঐ, পৃষ্ঠা ১২০) । তিনি কথা রাখতে পারেন নি। আরো লম্বা হতে পারে এই পণ ভাঙার ইতিহাস। তাই বলে আমরা কি দিগন্তে মেলানো মহান-অমহানদের সমালোচনাই চালিয়ে যাব? একটি হাদীসের বুকে ঠাঁই নিতে পারিঃ ‘উযকুরু মাহাসিনা মাওতাকুম ওয়া কাফ্ফু ’আন মাসাবিহীম’- তোমরা তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের ভাল দিকগুলো আলোচনা কর, আর মন্দ দিকগুলোর ব্যাপারে নিবৃত থাকো। আবু দাউদ/ তিরমিযী শরীফ।
আগস্ট আমাদের শপথের মাস। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘যে কোনো মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোনো ভালো কাজ করতে পারে নাই’ (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পৃষ্ঠা, ১২৮)। আসুন দেশের লাগি ত্যাগের এই মহান শপথ নিই। শক্ত বিরোধীদল ছাড়া দেশে একনায়কত্ব চলার যে ইঙ্গিত শেখ মুজিব ১৯৬০ এর দশকে করে গেছেন দেশকে সেই সমূহ বিপদ থেকে ফেরানো জরুরী। সিদ্ধান্ত নিতে হবে, শোকে-ক্ষোভে-আবেগে আগস্টকে বছরের ক্যালেন্ডার থেকে কাঁচা দাঁতের মতো উপড়ে ফেলবো! নাকি আগস্টই হয়ে উঠবে আমাদের সম্মুখে চলার অবিনাশী গান। চলুন ভাঙ্গি গোঁড়ামীর লৌহ কপাট, করি মুক্তির সংগ্রাম, প্রাণে ছোঁয়াই আগুনের পরশমণি। বাদল ঝরা শাওনে, বিদ্যুতের চমকে কেটে যাক আগস্টের সবটুকু আঁধার।
লেখকঃ জাহিদুর রহমান
শিক্ষক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
taruncu@yahoo.com


You must log in to post a comment.