মা আসিয়া বেগমের আকুতি ছেলের লাশ ফিরে পেতে
বগুড়া প্রতিবেদক । ৯ জুলাই ২০১৬
রাজধানী ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত নিহত সন্দেহভাজন জঙ্গি শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলের মা আসিয়া বেগম ছেলের লাশ ফিরে পেতে আকুতি জানিয়েছেন। তিনি তরুণ সমাজের প্রতি আকুতি জানিয়ে এই বৃদ্ধা বলেন, ‘আমার ছেলের মতো কেউ জঙ্গি হইয়ো না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে উজ্জ্বলের মা আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘রাক্ষুসী যমুনার পেটে সব জমি হারানোর পরও অনেক কষ্টে ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছি। তাবলীগ জামায়াতের চিল্লায় যাওয়ার নামে ছেলে জঙ্গি হবে, তা কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি। জানতে পারলে তাকে কখনও যেতে দিতাম না। ছেলের এ ঘটনায় সবার কাছে ক্ষমা চাই। পারলে তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আর ছেলের লাশটিও ফেরত দেবেন।’
তিনি আরো বলেন, আমার স্বামী ও বড় ছেলে নিরাপরাধ। তাদের যেন কোনও ক্ষতি না হয়। উজ্জ্বল কীভাবে ও কখন জঙ্গি হয়েছে, তা আমরা কেউই জানি না।
এ সময় আসিয়া বেগম তরুণদের সঠিকভাবে লেখাপড়া ও বাবা-মায়ের কথামতো চলারও পরামর্শ দেন।
বৃদ্ধা আসিয়া বেগম আরও বলেন, প্রায় ছয়মাস আগে উজ্জ্বল ঢাকায় চিল্লায় যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়। সেই থেকে তার সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সে কীভাবে ও কখন জঙ্গি হয়েছে, তা পরিবারের সবার কাছেই অজানা।
তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ৪ জুলাই সকালে টিভিতে ছেলের লাশ প্রথম দেখি। কিন্তু এখনও তার লাশ পাইনি। আমি ছেলের লাশ ফেরত পেতে আকুতি জানাচ্ছি।
উজ্জ্বলের চাচাতো বোন কেয়া আকতার জানান, পরিবারে উজ্জ্বল ছিল সবার ছোট। ২০০৫ সালে গোসাইবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৭ সালে গোঁসাইবাড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ২০১১ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন উজ্জ্বল। এরপর বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে মাস্টার্সে ভর্তি হন। তবে সে মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
গোঁসাইবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের উজ্জ্বলের সহপাঠী পার্শ্ববর্তী খোকসাবাড়ি গ্রামের শামীম আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, উজ্জ্বল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। পুরো পরিবার হানাফি সম্প্রদায়ের হলেও সে আহলে হাদিস মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে যায়।
উজ্জ্বল এত বড় জঙ্গি ও এত মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে, তা এখনও কেউ যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না।
এর আগে ধুনট থানা পুলিশ ৪ জুলাই বিকেলে ধুনটের ভাণ্ডারবাড়ি ইউনিয়নের বানিয়াজান চল্লিশপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে সন্দেহভাজন জঙ্গি শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলের বাবা বদিউজ্জামান ও ভাই আসাদুল ইসলামকে আটক করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৫ জুলাই সকালে ঢাকায় পাঠানো হয়।
গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল গত ৩ জুলাই বিকেলে শাজাহানপুর উপজেলার চুপিনগর ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে জঙ্গি খায়রুল ইসলাম পায়েলের বাবা আবুল হোসেন ও পিয়ারা বেগমকে আটক করে। পরে তাদের অফিসে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, লাশ শনাক্তের জন্য উজ্জ্বলের বাবা ও ভাইকে ঢাকায় এনে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। ঈদের আগে তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন।
এই নিয়ে সন্দেহভাজন নিহত পাঁচ জঙ্গির মধ্যে চারজনের পরিবারের পক্ষ থেকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া হলো। এর আগে গুলশান হামলায় নিজের ছেলের জড়িত থাকার খবর পেয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চান রোহান ইবনে ইমতিয়াজের বাবা এস এম ইমতিয়াজ খান (বাবুল)। সন্দেহভাজন জঙ্গি মীর সামেহ মুবাশ্বেরের বাবা মীর হায়াতুল কবিরও ছেলের কৃতকর্মের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান।
এছাড়া অন্য সন্দেহভাজন নিহত জঙ্গি নিবরাস ইসলামের মা লায়লা বিলকিস ও বাবা নজরুল ইসলামও এক বিবৃতিতে তাদের সন্তানের কৃতকর্মের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান।
এ সময় তারা তাদের সন্তানদের যারা বিপথগামী করেছেন, তাদের কঠোর শাস্তিও দাবি করেন।
উল্লেখ্য, ১ জুলাই (শুক্রবার) রাতে রাজধানীর গুলশান ২ নম্বর সেকশনের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে দুই পুলিশ সদস্য, ১৭ বিদেশি নাগরিক ও তিন বাংলাদেশি নিহত হন। পরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ছয় জঙ্গি নিহত হয় বলে শনিবার সেনাসদরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। অভিযানে জীবিত উদ্ধার করা হয় তিন বিদেশি নাগরিকসহ ১৩ জিম্মিকে।



You must log in to post a comment.