সোহরাব হাসান । ৯ জুলাই ২০১৬
সাম্প্রতিককালে প্রায় সব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রধান খবর ছিল রমজান মাসে বিভিন্ন দেশে জঙ্গি সন্ত্রাসীদের হামলা ও হত্যার ঘটনা। সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া থেকে শুরু করে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশেও একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যুর সংখ্যা ধরলে বৃহত্তম সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে ইরাকে। কিন্তু নৃশংসতার দিক দিয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর ও নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশেই।
কী নির্মম সেই হত্যাকাণ্ড! কী বীভৎস সেই হামলার ধরন!
গত শুক্রবার ছিল জুমাতুল বিদা। পরদিন শবে কদর। কিন্তু জুমাতুল বিদা কিংবা শবে কদরের আহ্বানও জঙ্গি সন্ত্রাসীদের উন্মত্ত জিঘাংসা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। রমজানের সংযম কিংবা ঈদের আনন্দ-মিলনে তারা বিশ্বাসী নয়, তারা বিশ্বাসী নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষ হত্যায়। মানুষের জীবন নেওয়াই তাদের একমাত্র পেশা।
তাই আমরা দেখি, হিংসায় মত্ত একদল জঙ্গি রমাজানের পবিত্র দিনে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ঘটাতেও দ্বিধা করেনি। আর জায়গা হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে দেশের নিরাপদ ও অভিজাত এলাকা বলে পরিচিত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি নামের একটি রেস্তোরাঁকে, যেখানে বিদেশি অতিথিরা বেশি যান। বিদেশিদের হত্যা করলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও প্রচার পাবে, এ কারণেই এ রকম একটি রেস্তোরাঁকে বেছে নিয়েছে তারা। জঙ্গিদের উদ্দেশ্য কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠা নয়, প্রচার পাওয়া।
কিন্তু এ-ও সত্য, সেদিন সেই রেস্তোরাঁয় যেসব বাংলাদেশি নারী-পুরুষ ছিলেন তাঁদেরও রেহাই দেয়নি এই ঘাতক চক্র। দেশি-বিদেশি মিলে ২০ জন নিরপরাধ নারী-পুরুষকে মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যা করে তারা। আর তাদের রুখতে গিয়ে জীবন দেন পুলিশের দুই কর্মকর্তাও ।
পবিত্র রমজান মাসে এই নৃশংস হত্যার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, বাংলাদেশে শিগগির আর কোনো জঙ্গি হামলা হবে না। কিন্তু শান্তিকামী মানুষের সেই আশাকে নস্যাৎ করে দিয়ে ঈদের দিনে জঙ্গিরা ঈদের নামাজ না পড়ে ফের মানুষ হত্যায় মেতে উঠল।
প্রতিবছর দেশের বৃহত্তম ঈদের জামাত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়। দূর দূরান্ত থেকে বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমান এখানে আসেন ঈদের নামাজ আদায় করতে। তাঁদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। তারই অংশ হিসেবে পুলিশের একটি টহল গাড়ি ছিল আজিমউদ্দীন স্কুলের কাছে মুফতি মোহাম্মদ আলী মসজিদের সামনে। সকাল নয়টায় মুসল্লিরা যখন নামাজ আদায়ের জন্য শোলাকিয়া মাঠে যাচ্ছিলেন, তখন সেই টহল পুলিশের ওপর বোমা হামলা চালায় একদল জঙ্গি-সন্ত্রাসী। গুলি ও বোমার শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঈদের নামাজ নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়েছে।
ঈদের দিনে জঙ্গিরা নামাজ না পড়ে যারা নামাজ আদায়কারী মুসল্লিদের নিরাপত্তা দিচ্ছিলেন, তাঁদের ওপরই চড়াও হয়। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করা এবং আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করা ধর্মের বিধান। কিন্তু ওই হামলায় অংশগ্রহণকারী জঙ্গিরা সেই বিধান পালন করেনি। তাহলে কীভাবে তারা নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করে?
একের পর এক সন্ত্রাসী হামলায় এখন সারা দেশেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু ঘরেও তাঁরা নিরাপদ নন। শোলাকিয়ার ঘটনায় পুলিশ-জঙ্গি সংঘাতে পড়ে ঝর্ণা রানী ভৌমিক নামের একজন গৃহবধূ নিহত হন। ঘরের খোলা জানালা দিয়ে একটি গুলি এসে তাঁর মাথায় লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
আর কত মৃত্যু দেখবে বাংলাদেশ? কে কোথায় কখন সন্ত্রাসী হামলার শিকার হবে, কেউ বলতে পারেন না। ঈদের দিনে প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করার জন্য ভিন্ন ধর্মের মানুষ হয়েও ঝর্ণা রানী ঘরে সেমাই তৈরি করার পর রুটি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখনই ঘটে এই অঘটন। তিনি কি কখনো ভেবেছিলেন একটি গুলি এভাবে তাঁর জীবন কেড়ে নেবে? কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ইমোরি ইউনিভার্সিটির ছাত্র ফারাজ আইয়াজ হোসেন ঈদের ছুটি কাটাতে দেশে এসে কি ভাবছিলেন, তাঁকেও জঙ্গিদের হাতে জীবন দিতে হবে? আরও বেদনা ও বিস্ময়ের হলো, ফারাজের পরিচয় জেনে জঙ্গিরা তাঁকে ছেড়ে দিতে চাইলেও তিনি একা যেতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে আসা দুই বন্ধু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অবিন্তা কবীর ও ঢাকার সহপাঠী তারুসি জৈনকেও ছেড়ে দিতে হবে।
কিন্তু জঙ্গিদের এক কথা, ওদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ফারাজ বললেন, তাহলে তিনিও যাবেন না। একজন তরুণ কত সাহসী ও মহৎ হলে এভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জঙ্গিদের সাফ কথা জানিয়ে দিতে পারেন! কথাশিল্পী আনিসুল হক গত রোববার প্রথম আলোয় লিখেছেন, ‘আমাদের কাঁদতে দিন।’
কিন্তু আর কত দিন কাঁদবে বাংলাদেশ? এখনই চূড়ান্ত আঘাত হানার সময়। আমরা শুধু কাঁদব না। এখন কান্নাকে শক্তিকে পরিণত করব। বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিবাদের শেষ চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে।
ঈদের দিনে গণভবনের সংবর্ধনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘রমজান মাসে ইবাদতের সময় যারা হত্যার মিশনে যায়, তাদের চেয়ে জঘন্য অপরাধী আর কেউ হতে পারে না।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘নামাজ না পড়ে মানুষ খুন করা কোন ধরনের ইসলাম? ঈদের জামাত শুরুর আগে যারা হামলা চালায়, তারা কি আদৌ মুসলমান?’ শেখ হাসিনা বলেন, বিপথগামী তরুণ-যুবকেরা যা করছে, তা ধর্মের পথ না, মানবতার পথ না, ঘৃণ্য অপরাধের পথ। তাদের এই পথ পরিহার করতেই হবে। আমরাও মনে করি, এই পথ পরিহার করতেই হবে। কিন্তু তার পথ কী হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া না শিখিয়ে জঙ্গিবাদের পথে টেনে নিচ্ছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার যে আহ্বানও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, আমরা তার সঙ্গে একমত পোষণ করি। দেরিতে হলেও তিনি স্বীকার করেছেন, এটি কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত বা দলীয় সমস্যা নয়। এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক সমস্যা।
এই সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে ‘জঙ্গিবাদের পথে যাঁরা টেনে নিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবেই লড়াই করতে হবে। আর এই জঙ্গিবাদে যে কেবল বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরাই বিপথগামী হচ্ছেন, তা–ও নয়। গুলশানের সন্ত্রাসী ঘটনায় অনেক সত্য বেরিয়ে আসছে। রোহান ইবনে ইমতিয়াজের বাবা বিএনপি-জামায়াতের কেউ নন। তাঁর বাবা ইমতিয়াজ খান বাবুল আওয়ামী লীগেরই নেতা।
তাই জঙ্গি সমস্যাকে মন্ত্রীদের ভাষায় ‘বিএনপি-জামায়াতের কাজ’ কিংবা বিএনপির নেতাদের ভাষায় ‘গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির কারণ’ বলে আত্মতুষ্টির সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। আপনারা যদি বাংলাদেশের কান্না বন্ধ করতে চান, তাহলে এখনই সজাগ হোন।



You must log in to post a comment.