নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
বৃহস্পতিবার, ৯ জুন ২০১৬
চট্টগ্রাম: বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন শিক্ষার্থীকে আবাসিক হলে থাকতে হলে প্রশাসনের নিকট আবেদন করতে হয়। পরে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের থাকার অনুমতি দেয় আবাসিক হল কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী এটাই বলে। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মনে হয় এরকম যে কোনো শিক্ষার্থীর হলে থাকতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতির নিতে হয় না। কারণ এখানে ছাত্রলীগ করলেই মেলে আবাসিক হলের সিট! অর্থ্যাৎ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকলেই নির্দ্বিধায় থাকতে পারছে হলগুলোতে।
শুধু ছাত্রলীগ না বিগত ৫০ বছরের ইতহাসে এরকমই চলে এসেছে। ক্ষমতা পালা বদলে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে চলে যায় আবাসিক হলগুলো। তা কখনো ক্ষমতাসীন থাকা ছাত্রলীগ বা শিবির কিংবা ছাত্রদল। তারাই হলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে সিটি বরাদ্ধ দেয়। ফলে অবহেলায় থেকেই যায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাই তারা বাধ্য হয়ে পার্শ্ববর্তি কটেজগুলোতে থাকতে হয়। যেখানে থাকার কোনো পরিবেশ নেই। অথচ হল কর্তৃপক্ষের এসব কিছু জানার পরও কোনো ব্যবস্থা নেন না। এমনকি উল্টো অ্যালটমেন্ট থাকা ছাত্রদের অন্যত্রে সরিয়ে দেয়। সরিয়ে দিয়ে পছন্দের সিটগুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের থাকতে দেয় বলে হল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের দুর্দশার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল এসব আবাসিক হলগুলো। বর্তমানে সাধারণ ছাত্রদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে ৭টি। যেখানে মোট আবাসন সংখ্যা ২ হাজার ৭শ ১১টি। কিন্তু যে সাধারন শিক্ষার্থীদের জন্য এ হলগুলো, তারাই থাকতে পারছেন না এখানে। কারণ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দখলে রয়েছে হলগুলো। ফলে অ্যালটমেন্ট থাকার পরও সাধারন শিক্ষার্থীরা হলে উঠতে পারছেন না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় এ অবস্থা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই হলে থাকতে অ্যালটমেন্ট নিতে হয় ছাত্রলীগ করেই। এতে হল জুড়ে তৈরি হয়েছে চরম নৈরাজ্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আব্দুর রব হল। চারতলা বিশিষ্ট এ হলে আবাসন সংখ্যা ৫০৯টি। হলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উত্তর ব্লগ ও দক্ষিণ ব্লকে ভাগ করা হয়েছে এ হলকে। উত্তর ব্লকে থাকেন নগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন অনুসারী ছাত্রলীগ। আর দক্ষিণ ব্লকে থাকেন নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারী ছাত্রলীগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ হলে মাত্র প্রায় একশ জন শিক্ষার্থী ছাড়া বাকি কারও অ্যালটমেন্ট নেই। তারা সবাই কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে হলে থাকেন। একই অবস্থা অন্য ৬টি হলেও। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় শাহ আমানত হলের ৬৩২ আবাসনের মধ্যে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী থাকতে পারেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির অনুসারী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এ হলে ভাগ করে থাকেন। এমনকি এ হলে নিচতলার ২৩৩, ২৩৪ এবং ২৩৫ নম্বর রুমসহ আরো অনেক রুমে চারজনের সিটে মাত্র একজন থাকেন।
শাহ জালাল হল পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে আ জ ম নাছির অনুসারী ছাত্রলীগ। এ হলের ৪৭৫টি আবাসনের মধ্যে ৩শ জনেরই কারও অ্যালটমেন্ট নেই। এখানেও অনেক রুম খালি থাকলেও উঠতে পারছেন না সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
এদিকে সোহরাওয়ার্দী হল পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারী ছাত্রলীগ। এখানে ৩৭৫টি আবাসনের মধ্যে ২শ জনের কোনো অ্যালটমেন্ট নেই। এছাড়া আলাওল হল ও এ এফ রহমান হলের ৫১৬ আবাসনের মধ্যে ৪শ জনেরও অধিক ছাত্রের অ্যালটমেন্ট নেই। অ্যালটমেন্ট না থাকলেও ছাত্রলীগ করার সুবাধে হলে থাকতে পারছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, অ্যালটমেন্ট থাকার পরও অনেক শিক্ষার্থী হলে থাকতে না পেরে বাধ্য হয়ে কটেজে থাকছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ সেশনের আইন অনুষদের এক মেধাবী শিক্ষার্থী বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমার শাহ আমানত হলে অ্যালটমেন্ট আছে। তারপরও আমি হলে থাকতে পারছি না। কারণ হলে কোনো ধরনের পরিবেশ নেই। একদিকে ছাত্রলীগের মারামারি অন্যদিকে সিট দখল করে রেখেছেন তারা। সবমিলিয়ে হলে থাকতে না পেরে কটেজে থাকছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আবেদন, হলে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে এনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যেন হল বরাদ্ধ দেয়া হয়।’
এদিকে এ ব্যাপারে হল কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, কোনো আবাসিক হল ছাত্রলীগের দখলে নেই। এমনকি ছাত্রলীগ পরিচয় দিয়ে এ্যালটমেন্ট ছাড়া কেউ থাকে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরাই আবাসিক হলগুলোতে থাকেন।
বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক হলের প্রভোস্ট কমিটির আহ্বায়ক ও শাহ জালাল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড.সুলতান আহমেদ সংবাদ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ছাত্রলীগের পরিচয় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলে কেউ অ্যালটমেন্ট ছাড়া থাকে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরাই হলে থাকেন।’
কোন হলে কোন রুমে ছাত্রলীগের পরিচয়ে অ্যালটমেন্ট ছাড়া থাকেন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান তিনি।
প্রভোস্ট কমিটির এ অহ্বায়ক স্বীকার না করলেও স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতারা হলে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ২০১৪ সালে আবাসিক হলগুলোতে শিবির বিতাড়িত হওয়ার পর থেকে ওইসব রুমে ছাত্রলীগ থাকেন বলে তারা জানিয়েছেন। তবে হলে সিট বরাদ্ধ দিলে, যেসব শিক্ষার্থীরা অ্যালটমেন্ট পাবে সেসব শিক্ষার্থীদের রুম ছেড়ে দিবেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতারা জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপু বলেন, ‘শিবির বিতাড়িত হওয়ার পর শিবিরের রুমগুলোতে ছাত্রলীগের কর্মীরা থাকছেন। কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীর রুমে ছাত্রলীগ থাকছে না। তবে আবাসিক হলে অ্যালটমেন্ট দেয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অ্যালটমেন্ট দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলে দিবে। এখানে ছাত্রলীগের কিছু করার নেই। অ্যালটমেন্ট হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা উঠলে ছাত্রলীগ ওইসব রুম ছেড়ে দিবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অ্যালটমেন্ট দেয়ার পর কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীদের রুমে উঠতে না দিলে ছাত্রলীগ তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিবে।’
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি সুজন বলেন, ‘এখনও যেহেতু আবাসিক হলে অ্যালটমেন্ট হয়নি তাই আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে মিলেমিশে আছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বারবার আবেদন জানিয়েছি, অ্যালটমেন্ট দেয়ার মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্ধ দেয়া হউক।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. কামরুল হুদা এ ধরনের কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই বলে সংবাদমাধ্যমকে জানান। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পরেই হলের সিট বরাদ্ধ দিবে। বরাদ্ধ দেয়ার পর শিক্ষার্থীরা স্ব-স্ব আবাসিক হলে ফিরে যেতে হবে। কোনো হলেই জট বেঁধে অন্য হলের শিক্ষার্থী থাকতে পারবে না। এমনকি স্ব-স্ব হলে না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন।
তথ্যসূত্র – বাংলামেইল২৪ডটকম



You must log in to post a comment.