বগুড়া’র শাজাহানপুরে মৃৎশিল্প পরিবারের মানবেতর ভাবে জীবন যাপন
আল আমিন মন্ডল (বগুড়া) থেকে ঃ বগুড়া শাজাহানপুরের আড়িয়া পালপাড়া’য় মৃৎশিল্প পরিবারের সদস্যদের উপর নির্মম নির্যাতন-হুমকি ও নানা সমস্যা’য় জর্জরিত হওয়ায় তারা এখন মানবেতর ভাবে জীবন যাপন করছে। মিথ্যা মামলা ও হামলায় অনেক পরিবার দেশত্যাগ’সহ নানা জায়গায় পালিয়ে গিয়েছেন। ফলে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ রক্ষা’য় এখনো নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত পরিবারগুলো নিরাপত্তা ও সু-শাসন’সহ আইনী সহযোগিতা পেতে মানবাধিকার সংগঠন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, গত ১শ বছর পূর্বে থেকে শাজাহানপুর উপজেলা’র আড়িয়া পালপাড়া’য় প্রায় দু’শতাধিক পরিবার এ মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। তবুও বাপ-দাদার এ শিল্পের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে তাদের প্রচেষ্টার অন্ত নেই। নানা সমস্যা ও প্রতিকূলতা কাঁটিয়ে তাঁরা দিন-রাঁত মৃৎশিল্পের কাজ করে তাদের ছেলে-মেয়েদের’কে সুশিক্ষিত করার জন্য সংগ্রামী জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এ পেশার সঙ্গে জড়িত।
বাঙালির ঐতিহ্যে নিপুন হাতের তৈরি মাটির বাটি, পাতিল, কড়ই, পুতুল, ব্যাংক, খেলনা, দইয়ের বাটি, ফুলের টব ও হরেক রকমের মাটির সামগ্রী তৈরি করছেন তাঁরা। তবে ছেলেদের চাইতে মেয়েদের এই শিল্পে বেশি কাজ করতে হয়। পুরুষ ও মহিলারা মাটি ছানা, শুকানো, পোড়াই, রং করার কাজ করে হাট-বাজারে সেসব জিনিস বিক্রি করে থাকেন। তবে বিক্রির চাইতে অর্ডার নেওয়ার কাজ তাঁরা বেশি করে থাকেন।
দলবদ্ধ সন্ত্রাসীরা গত বছরের ২৯ শে এপ্রিল ২০১৫ইং পালপাড়ায় হামলা ও মালামাল ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছিল। এঘটনায় শাজাহানপুর থানায় ৩টি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
পালপাড়া’র নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুষ্টভাবে জীবনযাপন এবং নিরাপত্তা চেয়ে ‘স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প’ স্থাপনের জন্য জাতীয় মানবাধীকার সংস্থা’য় একাধিক আবেদন করলে আবেদনের প্রেক্ষিতে বগুড়া পুলিশ সুপার বিষয়টি তদন্ত করেছেন। এরপরেও পালপাড়ার ঘটনা এখনো যেন তাদের মনে আতংক বিরাজ করছে।
অসহায় পালপাড়াবাসী চায় শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানে বসবাসের জন্য নিরাপত্তা, খাদ্য সংগ্রহের জন্য কাজ, বস্ত্র, চিকিৎসা সেবা’সহ নাগরিক অধিকার। এরপরেও তাদের জীবনের প্রতি মুহুর্তে হুমকি-ধামকি, হামলা ও মালামাল ভাংচুরের ঘটনা ঘটছে। ফলে অনেক নিরীহ পাল পরিবার প্রতিবাদ করার সাহস না পাওয়ায় তাঁরা দেশত্যাগ করে পালিয়ে গেছেন ভারত’সহ বিভিন্ন স্থানে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সময়মত সার্বিক সহযোগিতা না করা’য় ইতিমধ্যে পালপাড়া থেকে পালিয়ে গেছেন মনোতোষ, প্রদীপ, ডাবলু, শ্যামা পাল, অন্তীম, গোপাল, শ্যামা চন্দ্র’সহ অনেক পরিবার। নারীদের হুমকি, চাঁদা দাবী, মিথ্যা মামলা, হামলা থেকে বাঁচতে অনেক পরিবার জন্মভূমি ছেড়ে বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমিয়েছেন। অনেকেই জীবন সংগ্রামে জয়লাভ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
পালপাড়া গ্রামের দিনমজুর নাল মাধব পাল এ শিল্পে কাজ করে ছেলে মানবেন্দ্র কুমার পাল ও কন্যা নবনিতা পালকে এমবিবিএস ডাক্তার করেছেন। সিঙ্গাপুরে গেছেন সঞ্চয়, সবুজ ও মনোতোষ। কমলমতি ৩০থেকে ৪০জন শিশু শিক্ষার্থী থাকলেও পালপাড়া গ্রামে কোন স্কুল ও পাঁকা রাস্তা না থাকায় পাল পরিবারের সন্তানদের’কে লেখাপড়া শিখাতে নানা দূভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্বপ্ন দেখছেন এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় জীবনটাকে আরও সুন্দর করার।
কারিগর তিনকড়ি পাল, সতেন, রতন, বাচ্চু, পাবর্তী, অঞ্জলী সিটিজিবার্তা কে বলেন, আমাদের ২ থেকে ৪ শতক বাড়ির জায়গা ছাড়া অন্য কোন জমি নেই। পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। সংখ্যালঘু হওয়ায় আমাদের ভয় বেশী। কখনো সন্ত্রাসীদের হামলা আবার কখনো মালামাল ভাংচুর করে আমাদের ক্ষতিগ্রস্থ করা হচ্ছে।
সমিতি বাড়ি বাড়োয়ারি মন্দির ও পালপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ চন্দ্র মহন্ত সিটিজিবার্তা কে বলেন, আমাদের পাল পাড়ায় গতবছরের ২৯শে এপ্রিল ২০১৫ইং তারিখে সন্ত্রাসী কর্তৃক হামলা ও প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনায় আমরা প্রতিবাদ করেছি। মাঝে মধ্যেই আমাদের উপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ফলে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। দোষি ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান তিনি। একই সঙ্গে সে মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিক’দের সহযোগিতাও কামনা করেন।
কারিগর সুকুমার চন্দ্র পাল সিটিজিবার্তা কে জানান, এ শিল্পে যে যত পরিশ্রম করবে সে তত আয় করবে। আয়ের বিষয়টা হাতের কাজের উপর নির্ভরশীল। তবে প্রতি মাসে যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। মাটি, রং, ফার্নিস, কাঠের গুড়া ও শ্রম বাজার বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা বহুকষ্ঠ করে জীবন যাপন করছি।
শ্যামলী পাল সিটিজিবার্তা কে জানান, হাত চললে পেট চলে, হাত না চললে পেট চলে না।
সুকান্ত পাল সিটিজিবার্তা কে জানান, বগুড়া দই বাজার এলাকা হওয়ায় দই মাটি বাটি’র চাহিদা বেশি। তবে বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মেলায় মাটির তৈরির জিনিসের বেশ কদর রয়েছে। এ শিল্পে ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় আমরা প্রসার ঘটাতে পারছি না। তবে প্রতিমা তৈরি করে যে টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চলে না।
এছাড়াও বিপুল চন্দ্র পাল জানান, হুমকি ও নির্যাতনের ফলে অনেকেই দেশত্যাগ করেছেন। আবার কেউ কেউ বিদেশ ও অন্য পেশায় রয়েছে। ফলে এ শিল্প দিনদিন বিলুপ্তির পথে। তবে আমরা পালপাড়াবাসী এখনো নাগরিক অধিকার’সহ সরকারী-বেসরকারী অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে আমরা আমাদের ন্যার্য মৌলিক অধিকার পেতে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
আড়িয়া ইউপি’র চেয়ারম্যান তছলিম উদ্দিন সিটিজিবার্তা কে জানান, পালপাড়ার প্রতি আমাদের নজর রয়েছে। তবে দেশত্যাগের বিষয়টি শুনেছি।
মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই খোকন কুমার সিটিজিবার্তা কে জানান, ‘স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প’ স্থাপন বিষয়ে আবেদনে প্রেক্ষিতে তদন্ত হয়েছে। পালপাড়ায় পুলিশ প্রতিরাঁতে ডিউটি করছে। আতংকিত হওয়ার কিছু নাই।
শাজাহানপুর থানা ওসি মোঃ আব্দুল্লাহ আল মাসউদ সিটিজিবার্তা কে জানান, পালপাড়ায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।



You must log in to post a comment.