বাংলাদেশে আজ কে নিরাপদ?

ctgbarta24.com

ফারুক ওয়াসিফ ।  ১২ জুলাই ২০১৬

Gulshan_restaurant_shooting_holey_artis-800x448-1024x573

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোঁরার ঘটনা কিংবা শোলাকিয়ার গোলাগুলিতে হতাহত ব্যক্তিদের মধ্যে সবাই-ই আছেন। দেশি ও বিদেশি আছেন। আছেন হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান। আছেন সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা। শক্তিমান রাষ্ট্রের নাগরিক থেকে শুরু করে দুর্বল বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক – কেউই বাদ যাচ্ছেন না। সমাজ, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, পরিচয় ও জীবন কিছুই নিরাপদ থাকছে না।

যখন নাস্তিক ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছিল, তখন বলা হচ্ছিল, এটা মুক্তচিন্তার ওপর মৌলবাদী আঘাত। তারপর যখন বেছে বেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের হত্যা করা হচ্ছিল, তখন বলা হলো, এটা সাম্প্রদায়িক জীঘাংসা। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিকিৎসক নিহত হলেন, যাঁদের কোনোভাবেই নাস্তিক বলা সম্ভব নয়; তখন আমরা আরও বিহ্বল হয়ে পড়লাম।

কিন্তু বোঝা কঠিন ছিল না, বাংলাদেশে ধর্ম-সম্প্রদায় এবং আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সবাই এসে পড়ছে ঘাতকের নিশানায়। নিশ্চয়ই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা আছে, আছে সংখ্যাগুরুর দাপট। তারপরও ওপরে বর্ণিত ঘটনাগুলোর সব কটিকে সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার তো মুসলমানদের হত্যা করার কথা নয়। আর আইএসই যদি এসবের হোতা হয়, তাদের হাতে নিহতের তালিকায় কিন্তু মুসলিম দেশের ইসলাম বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যাই বেশি।

এটা তো গেল জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসের কথা। চাপাতি, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুলি, তলোয়ারে জীবন গেছে যাঁদের, তাঁদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সংখ্যালঘু সবাই-ই আছেন। আসলে সমগ্র বাংলাদেশই যে আক্রান্ত, আমাদের যত কটি পরিচয় আছে, বাঙালি-অবাঙালি, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, মুসলমান, সমকামী-বিসমকামী, নারী, পুরুষসহ মোটামুটি সব কটি পরিচয় ও সত্তাই আক্রান্ত হয়েছে। সব কটি রাজনৈতিক শিবিরের লোকই হুমকিতে থাকছে। এখন আর বোধ হয় তাই বলা যায় না, বিশেষ ধরনের পরিচয়ের মানুষই বেশি বিপদে আছে। আর নিহত মানুষের পরিচয় একটাই-মানুষ। প্রতিটি মৃত্যুই মানবতার মৃত্যু। সুতরাং, সংকটটিকে জাতীয়ভাবেই সামগ্রিক চেহারাতেই বোঝতে হবে এবং দেখতে হবে, কীভাবে আমাদের এ রকম এক সমূহ বিপর্যয়ের খাদের কিনারে এনে ফেলা হলো।

অথচ দুঃখের বিষয়, যতই আক্রান্ত হয়েছি, ততই একতার বদলে আমরা আরও বিভক্ত হয়েছি।
তারা নিচুতলা থেকে আক্রমণ শুরু করেছে। নাস্তিক হত্যায় অনেকেই নির্বিকার থেকেছেন। ভেবেছেন, আমি তো আর নাস্তিক নই, অতএব আমি নিরাপদ। ঘাতকদের সাহায্য করল নাস্তিকতা-আস্তিকতা নিয়ে সম্পূর্ণ হঠকারী বিতর্ক। এমনকি ক্রমাগত হত্যাকাণ্ডের পরও আমাদের হুঁশ ফিরল না। আমরা বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসী দাগে আরও বিভক্ত হয়ে পড়লাম। একে অপরকে ঘৃণা করতে থাকলাম।
যখন হিন্দুদের হত্যা করা শুরু হলো, তখন অনেক হিন্দুই ভেবেছেন, এটা মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা। অনেক মুসলমানই ভেবেছেন, তাঁরা সাতেও থাকবেন না পাঁচেও থাকবেন না। যখন মুসলমানেরাও আক্রান্ত হলেন, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠের আত্মবিশ্বাসেও চিড় ধরল। পাশাপাশি বাড়ল পারস্পরিক অবিশ্বাস। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভাজনের কাঁটাতারের মধ্যে তৈরি হলো আরও আরও কাঁটাতার। আর এই বিভক্তি ও ভয় আরও সাহসী করে তুলল ঘাতকদের।

এই হত্যাকারীরা সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখেছে : দেখেছে ব্লেমগেম, বিনা তদন্তেই বিরোধী দলকে দোষারোপ। দেখেছে মিথ্যার বাহাদুরি। এসব দেখে হত্যার কারবারিরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে।
তারা বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া দেখেছে : তারাও দোষারোপ করেই খালাস। তারাও আছে সুযোগের সন্ধানে। সত্যিকার বিপদ মোকাবিলায় তাদেরও হাত খাটো।

তারা প্রতিক্রিয়া দেখেছে : দেখেছে অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং সত্যের ধামাচাপা। জঙ্গি ধরার নামে তারা ধরছে বিরোধীদের। ঘাতকদের মাধ্যমে জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্ক উন্মোচনের বদলে, বিচারের মাধ্যমে সমাজের সামনে তাদের গণবিরোধী চেহারা উন্মোচনের বদলে তাদের তারা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিয়ে গেছে। যে সমাজে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার থাকে না, সেই সমাজ জঙ্গিবাদী হিংসার ভাইরাস ঠেকানোর ক্ষমতা রাখে না।

তারা জনগণের প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছে : অপার আনন্দে দেখেছে, জনগণ বলে কিছু নেই। আছে এক ভয়ের জঙ্গল, সেই জঙ্গলে সবাই যার যার সম্প্রদায় আর স্বার্থের খেজুরগাছে কলসির মতো ঝুলছে : ঠুনকো, পায়ের তলায় মাটিবিহীন, নিশ্চল।

তারা আরও দেখেছে, সরকার তাদের ঠেকানোর বদলে নিজেদের তৈরি করা গল্পে নিজেরাই বুঁদ হয়ে থাকতে ভালোবাসছে।

এভাবে ঘটনা ঘটেছে, প্রতিটি ঘটনা থেকে তারা শক্তিশালী হয়েছে, সংখ্যায় বেড়েছে, আরও মদদ ও ছাড় পেয়েছে। তারপর সামগ্রিক পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে পাওয়ার পরই তারা গুলশানের মতো বড় টার্গেট নিতে সাহস করেছে এবং এই প্রথম তারা দলবল নিয়ে প্রকাশ্যে এল। রাজধানীর সুরক্ষিত এলাকায়, হাজারো মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে বসে, লাইভ টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তারা যা করতে চাইল, তাই-ই করে দেখাল।

তারা অনেক হত্যা করেছে, অনেক মূল্যবান প্রাণ কেড়ে নিয়ে গেছে। তাহলেও হত্যার অধিক তারা যা করেছে, তারা আমাদের ভীত, বিহ্বল ও ছত্রভঙ্গ করেছে। বিভক্ত ও ভীত দেশ সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে পারে না।

মিথ্যাবাদী রাখালের গল্পটা এত দিন আমরা গরুর দিক থেকে পাঠ করেছি। এবার বাঘের দিক থেকে পড়ুন তো!

বাঘ দেখল, দায়িত্বপ্রাপ্ত রাখাল একে তো শুধু মিথ্যা বলে, তার ওপর পাহারার কাজেও ফাঁকি মারে।
বাঘ জানল, প্রহরীকে যখন কেউ বিশ্বাস করে না, তখন তাকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
এই মওকায় বাঘ নিশ্চিন্তে চড়াও হলো জনপদে এবং রাখাল, রাখালের গরু সাবাড় করে হানা দিল মানুষের ওপর।

এই গল্পের শিক্ষা হলো : মিথ্যাবাদী রাখালেরা আসলে জেনে বা না জেনে বাঘকেই সাহায্য করে।

দুই.
মোদ্দা কথা এই, আইএসই বলি আর যা-ই বলি, তারা একা নয়। তাদের পেছনে বড় শক্তির মদদ থাকতে পারে। পৃথিবীতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীই কোনো না কোনো রাষ্ট্রের মদদ ছাড়া দীর্ঘকালজুড়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারেনি। হয়তো ভবিষ্যতে তাদের প্রতিপালকদের কথা আমরা জানতে পারব। কিন্তু কীভাবে তারা কোনো দেশের সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগায়, তা বোঝা আজকের জন্য জরুরি।

ইরাক থেকে সিরিয়া, পাকিস্তান-ভারত থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত আমরা দেখছি নতুন ধরনের পরিচয়ের সংঘাত। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসবাদী যুদ্ধ বিভিন্ন সমাজের বিভিন্ন ধরনের পরিচয়ের মধ্যকার ফাটলগুলোকে সহিংস করে তুলে নিজেদের কাজে লাগাচ্ছে। ইরাক ও সিরিয়ায় তারা শিয়া ও সুন্নি পরিচয়কে তেজস্ক্রিয় করে তুলে প্রথমে সামাজিক ঘৃণার বীজ বপন করেছে। সেই বীজ থেকেই সম্ভব হয়েছে আইএসের ঘরে ফসল তোলার কাজ।

বাংলাদেশের কথাই যদি ধরি, তাহলে সেই রামুর বৌদ্ধবিহারের আগুন থেকে চাপাতি হয়ে গুলশানের গুলি-গ্রেনেড পর্যন্ত সন্ত্রাসী হামলার পেছনেও সামাজিক সংঘাতের বীজ পাওয়া সম্ভব।

এখানেও সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু, আস্তিক-নাস্তিক, শিয়া-সুন্নির মধ্যে হিংসা ও অবিশ্বাস তৈরির চেষ্টা হয়েছে। আমাদের পাশেই আসাম ও মিয়ানমারে রয়েছে রোহিঙ্গা ও বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে বাকিদের দূরত্ব। উপমহাদেশে বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যকার দূরত্ব ও অবিশ্বাস আইএসসহ যেকোনো গণবিরোধী শক্তির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারে।

তাই আজকের জ্বলন্ত প্রশ্ন এটাই : সামাজিক সংঘাত জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসে পরিণত হওয়া ঠেকানোয় আমরা কতটা প্রস্তুত? সে ধরনের সক্ষম রাষ্ট্র, সুষম সমাজ এবং ন্যায্য ও মানবিক সরকার আমরা তৈরি করতে পেরেছি কি?

সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ

ভোলা হবে ইকোনমিক জোন: বাণিজ্যমন্ত্রী বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ ভোলার ভেদুরিয়া এলাকায় স্পেশাল ইকোনিমিক জোনের জন্য নেয়া জমি পরির্দশন করছেন। ছবি- সাইফুদ্দিন ছোটন ভোলা প্রতিনিধি সাইফুদ্দি...
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্প বাস্তবায়নের পথ দেখাচ্ছেন সজীব ওয়াজেদ জয়... সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, নিউজ সেস্ক শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০১৬ সজীব ওয়াজেদ জয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার প্...
জনগণের জীবন-মান উন্নয়নে কাজ করে আওয়ামী লীগ : প্রধানমন্ত্রী... শুক্রবার, ০৫ আগস্ট ২০১৬ সিটিজিবার্তা২৪ডটকম ডেস্ক সংবাদ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণের জীবন-মান উন্নয়নে কাজ করে আওয়ামী লীগ। দীর্ঘমেয়াদী পর...
নতুন জেএমবি জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা ‘বড় হুজুর’... নিউজ ডেস্ক,  সিটিজিবার্তা২৪ডটকম বৃহস্পতিবার,  ৪ আগস্ট, ২০১৬   রাশেদুল করিম: নতুন জেএমবি জঙ্গি সংগঠনটি পুরনো জেএমবির ভগ্নাংশ। বলা হচ্ছে, সাম্প্...
ব্যাক্তিগত কাজ এবং সন্তানদের জন্য কেনাকাটা করলেন বাবুল... বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৬ দুই সন্তান আক্তার মাহমুদ মাহির (৮) ও তাবাসসুম তাজমিন টাপুরকে (৫) কোলে নিয়ে শোকার্ত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। সিটিজিবার্ত...



Translate »